বিজ্ঞান যখন বাজারের পণ্যে পরিণত হয়

বিজ্ঞান কোনো প্রতিযোগিতা নয়; এটি সম্মিলিত মানবিক প্রয়াস।অলঙ্করণ: এআই

বিজ্ঞান কখনোই বাজারের পণ্য হওয়ার কথা ছিল না। গবেষণাপত্র কোনো বিলাসসামগ্রী নয়, যার মূল্য বাজারের চাহিদা-জোগান নির্ধারণ করবে।

এটি মানবজাতির সম্মিলিত জ্ঞানভান্ডারের অংশ। কিন্তু আজ আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে অনেক সময় নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার চেয়েও সেই জ্ঞান প্রকাশ করাই বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি আমার গবেষণা গ্রুপ থেকে দুটি শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থার জার্নালে দুটি গবেষণাপ্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, একটি ওয়াইলি-ভিসিএইচের স্মল-এ, অন্যটি সেল প্রেসের আইসায়েন্স-এ।

প্রথমটি সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক মডেলে প্রকাশিত হয়েছে। ওপেন অ্যাকসেসে প্রকাশ করতে চাইলে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ১১ লাখ টাকার বেশি দিতে হতো।

সাবস্ক্রিপশন মডেল বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় সেই অর্থ দিতে হয়নি। দ্বিতীয়টি সম্পূর্ণ ওপেন অ্যাকসেস; নির্ধারিত প্রকাশনা ফি ছিল ৩ হাজার ২৮০ ডলার।

বাংলাদেশের গবেষক হওয়ায় তা কমে ৬৮০ ডলারে নেমে আসে। কিন্তু সেই অর্থও আমার পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না।

বহু ই-মেইল, ব্যাখ্যা এবং আর্থিক অক্ষমতার প্রমাণ উপস্থাপনের পর অবশেষে সেই অর্থও মওকুফ করা হয়।

আরও পড়ুন

একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তাঁর চিন্তা, আবিষ্কার ও অবদান। কিন্তু কখনো কখনো নিজের গবেষণার চেয়ে নিজের আর্থিক অসচ্ছলতার প্রমাণ দেওয়াটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।

এই অভিজ্ঞতা শুধু আমার নয়; এটি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর হাজার হাজার গবেষকের বাস্তবতা।

উচ্চ আয়ের দেশগুলোর যেসব গবেষক প্রকাশনা ফি দেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত গবেষণা অনুদান পান না, তাঁরাও একই সংকটে পড়েন।

তাঁদের ক্ষেত্রে আর্থিক অক্ষমতার ভিত্তিতে ছাড় চাওয়াও অনেক সময় কঠিন; অর্থাৎ গবেষণার মান বা গবেষকের যোগ্যতার বাইরেও ভৌগোলিক অবস্থান ও গবেষণা অর্থায়নের সুযোগ কখনো কখনো জ্ঞান প্রকাশের সক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয়।

ওপেন অ্যাকসেস আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল গবেষণার ফলাফল সবার জন্য উন্মুক্ত হবে, এই মহৎ স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেই স্বপ্নের অর্থনৈতিক ভার ক্রমশ গবেষকদের কাঁধে চাপানো হয়েছে। ফলাফল হলো, জ্ঞান মুক্ত হয়েছে, কিন্তু গবেষক মুক্ত হননি।

আরও পড়ুন

অধিকাংশ ক্ষেত্রে গবেষণার অর্থায়ন আসে রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জনগণের করের অর্থ থেকে। গবেষণা করেন গবেষকেরা; গবেষণাপত্র মূল্যায়নও করেন গবেষকেরাই, তা–ও বিনা পারিশ্রমিকে।

সম্পাদকীয় কাজের বড় অংশও তাঁদের কাঁধে ন্যস্ত; অর্থাৎ জ্ঞান সৃষ্টির প্রতিটি ধাপে মূল শ্রম দেন গবেষকেরাই; আর বাণিজ্যিক প্রকাশক মূলত সেই জ্ঞান প্রচার ও বিতরণের অবকাঠামো সরবরাহ করে।

অথচ এই জ্ঞানচক্রের শেষে সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধাভোগী হয়ে দাঁড়ায় বাণিজ্যিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো।

গবেষকের শ্রম, সমাজের অর্থায়ন এবং সহকর্মী গবেষকদের স্বেচ্ছাসেবী মূল্যায়নের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই জ্ঞানব্যবস্থার সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধাভোগী যদি শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক প্রকাশকই হয়, তবে সেই ব্যবস্থা কতটা ন্যায়সংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আজকের বৈজ্ঞানিক প্রকাশনাশিল্প পৃথিবীর অন্যতম লাভজনক জ্ঞান-ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই লেখক-অর্থায়িত প্রকাশনা মডেলের সুযোগে হাজার হাজার ভুঁইফোঁড় বা প্রিডেটরি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

মানুষের জীবন ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে? প্রশ্ন করা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সেই উত্তর প্রায়ই মেট্রিকের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। সংখ্যা কখনোই মানের বিকল্প নয়; মেট্রিক কখনোই চিন্তার বিকল্প হতে পারে না।

তারা গবেষকদের দুর্বলতা, চাকরি ও পদোন্নতির চাপ এবং সংখ্যাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে।

উদ্বেগের বিষয়, প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থার কিছু জার্নালে, বিশেষত কিছু মেগা-জার্নালের ক্ষেত্রে, প্রকাশনার পরিমাণ ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে ঘিরে এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা প্রকাশনা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

একই সঙ্গে কিছু পেশাজীবী বৈজ্ঞানিক সমিতির জার্নালও এমন অর্থনৈতিক মডেলের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে প্রকাশনার ব্যয়ের বড় অংশ লেখকদের ওপর স্থানান্তরিত হচ্ছে।

ওপেন অ্যাকসেসের আদর্শ ছিল জ্ঞানকে সবার জন্য উন্মুক্ত করা; কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা উচ্চমূল্যের প্রকাশনা ফি-নির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

ফলে প্রশ্ন ওঠে, গবেষণার ফলাফল উন্মুক্ত করার নামে আমরা কি জ্ঞান প্রকাশের নতুন আর্থিক বাধা তৈরি করছি না?

তবে দায় শুধু প্রকাশকদের নয়; দায় আমাদেরও। আমরা এমন এক একাডেমিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি, যেখানে গবেষণার গভীরতার চেয়ে প্রকাশনার সংখ্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ; মৌলিক বৈজ্ঞানিক অবদানের চেয়ে অনেক সময় জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বেশি গুরুত্ব পায়; আর গবেষণার সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক প্রভাবের চেয়ে এইচ-ইনডেক্স অধিক মর্যাদা লাভ করে। আমরা গবেষককে নয়, মেট্রিককে মূল্যায়ন করছি।

এই উপলব্ধি নতুন নয়। সান ফ্রান্সিসকো ডিক্লারেশন অন রিসার্চ অ্যাসেসমেন্ট গবেষকের অবদান মূল্যায়নে জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরকে বিকল্প সূচক হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করে।

একইভাবে লাইডেন ম্যানিফেস্টো গবেষণা মূল্যায়নে ১০টি নীতিমালা প্রস্তাব করে, যার মূল বার্তা, পরিমাণগত সূচক বিশেষজ্ঞদের গুণগত মূল্যায়নের বিকল্প নয়; বরং তার সহায়ক হওয়া উচিত।

অথচ বাস্তবে গবেষকের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক অবদানের পরিবর্তে তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছেন, সেই জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কত, তাঁর সাইটেশন বা এইচ-ইনডেক্স কত, এসবই প্রায়ই মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

আজ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগ বোর্ড, পদোন্নতি কমিটি এবং বৈজ্ঞানিক সংগঠনের পুরস্কার ও ফেলো নির্বাচনেও প্রশ্ন করা হয়, গবেষকের কতটি প্রকাশনা? তিনি কোন জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করেছেন?

সেসব জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কত? কতটি সাইটেশন? তাঁর এইচ-ইনডেক্স কত? দুঃখজনকভাবে, এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর সঙ্গে গবেষণার প্রকৃত বৈজ্ঞানিক মানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই; তবু অনেক ক্ষেত্রে এগুলোই মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

খুব কম ক্ষেত্রেই প্রশ্ন করা হয়, এই গবেষণা কি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেছে? গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে অবদান রেখেছে?

মানুষের জীবন ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে? প্রশ্ন করা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সেই উত্তর প্রায়ই মেট্রিকের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। সংখ্যা কখনোই মানের বিকল্প নয়; মেট্রিক কখনোই চিন্তার বিকল্প হতে পারে না।

আমাদের আরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা কি সত্যিই দেশীয় জার্নালগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার চেষ্টা করেছি?

কঠোর পিয়ার-রিভিউ, সম্পাদকীয় স্বচ্ছতা ও গবেষণার মান নিশ্চিত করে শক্তিশালী দেশীয় জার্নাল গড়ে তোলা গেলে জ্ঞান উৎপাদন ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণের একটি বড় অংশ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বিজ্ঞান কোনো প্রতিযোগিতা নয়; এটি সম্মিলিত মানবিক প্রয়াস। প্রকাশনা কোনো ট্রফি নয়; এটি জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যম। মেট্রিক কোনো গবেষকের পরিচয় নয়; তাঁর প্রকৃত পরিচয় তাঁর চিন্তা, সততা ও বৈজ্ঞানিক অবদান। তাহলে করণীয় কী?

প্রথমত, গবেষণা মূল্যায়নে প্রকাশনার সংখ্যা বা জার্নালের মেট্রিকের পরিবর্তে গবেষণার মৌলিকতা, বৈজ্ঞানিক গুণগত মান এবং সামাজিক প্রভাবকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাজীবী বৈজ্ঞানিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে কঠোর পিয়ার-রিভিউভিত্তিক, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অলাভজনক দেশীয় জার্নাল গড়ে তুলতে হবে।

পাশাপাশি, লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে শক্তিশালী ডায়মন্ড ওপেন অ্যাকসেস পাবলিশিং ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে লেখকের জন্য প্রকাশনা ফি থাকবে না এবং পাঠকের জন্য গবেষণাপত্র বিনা মূল্যে উন্মুক্ত থাকবে।

এতে গবেষকদের আর্থিক বোঝা কমার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব স্কলারলি প্রকাশনা অবকাঠামো শক্তিশালী হবে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্প্রদায়, বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থায়নকারী সংস্থা ও বৈজ্ঞানিক সমিতিগুলোকে ওপেন অ্যাকসেস প্রকাশনা ব্যয়ের স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

বিজ্ঞানকে মুক্ত করতে হলে শুধু প্রবন্ধ ওপেন অ্যাকসেস করলেই হবে না; মুক্ত করতে হবে গবেষণাকে বাণিজ্যিক আধিপত্য, সংখ্যার মোহ এবং মেট্রিক-নির্ভর মূল্যায়নের শৃঙ্খল থেকেও।

কারণ, গবেষণার প্রকৃত মূল্য প্রকাশনার সংখ্যা, জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কিংবা গবেষকের মেট্রিকে নয়; তার প্রকৃত মূল্য নিহিত থাকে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং মানবকল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতিতে সেই জ্ঞানের অবদানে।

  • ড. মোহাম্মদ আব্দুল বাছিত, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ফেলো, ইনস্টিটিউট অব ফিজিকস (আইওপি), যুক্তরাজ্য এবং রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি (আরএসসি), যুক্তরাজ্য