ট্রাম্প নন, ইরানের বড় হুমকি দেশের ভেতরেই

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে ইরানে চলমান গণবিক্ষোভের সমর্থনে বহু প্রবাসী ইরানি যোগ দেনছবি: এএফপি

পশ্চিমা নীতিনির্ধারকেরা ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম, নিষেধাজ্ঞা আর মধ্যপ্রাচ্যে তার গোপন সংঘাত নিয়েই বেশি ভাবছেন। কিন্তু তাঁরা ধরতে পারছেন না, এসব ইস্যুতে পশ্চিমারা যে চাপ দিচ্ছে, সেগুলো ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি নয়। ইরানের আসল হুমকি তৈরি হচ্ছে দেশের ভেতর থেকেই—তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে। 

ইরান আর বিপ্লবী রাষ্ট্র নয়। এটি এখন এক ভীত, কোণঠাসা ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, যা আতঙ্ক নিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে আছে। তারা শুধু মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বা ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের ভয়ে আছে, এমনটা নয়। তারা আরও বেশি ভয় পাচ্ছে স্মার্টফোন হাতে নেওয়া সেই কিশোর-কিশোরীদের, যাদের চোখে দেশ বদলের স্বপ্ন, আর যাদের মন তাদের বাবা-মায়ের শৃঙ্খলবদ্ধ উত্তরাধিকার হিসেবে নিতে রাজি নয়। 

ইরানের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ ৩০ বছরের নিচে। তারা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে অংশ নেয়নি। তারা প্যারিস থেকে খোমেনির দেশে ফেরার সময় ‘ইমাম জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেয়নি। তারা পাগড়ির মধ্যে পবিত্রতা খুঁজে পায় না, শহীদদের কবরেও মুক্তির নিশ্চয়তা দেখে না। রক্তাক্ত চোখে তারা দেখে শুধু এক দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাস। তারা বড় হয়েছে ভাঙা প্রতিশ্রুতি, মিলিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, ধসে পড়া মুদ্রা, কর্তৃত্ববাদী ভণ্ডামি আর এক ধর্মীয় এলিট শাসকের, যারা দেশ চালানোর চেয়ে চুলের দৈর্ঘ্য নিয়ন্ত্রণ আর জীবনের আনন্দ দমনে বেশি সময় ব্যয় করে। 

 ২০২২ সালে নীতি পুলিশের হেফাজতে মাসা আমিনির মৃত্যুর পর বিশ্ব সেটিকে হিজাববিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু সেটি ছিল আরও গভীর কিছু। সেটি ছিল এক প্রজন্মের বিদ্রোহ। তরুণীরা মাথা থেকে ওড়না খুলেছিল পোশাকবিধির বিরুদ্ধে নয়, পুরো ধর্মীয় কর্তৃত্বব্যবস্থার প্রত্যাখ্যান হিসেবে। ইরানের রাজপথে যে স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, তা কাপড় নিয়ে নয়—তা ছিল স্বাধীনতা নিয়ে। ‘আমরা তোমাদের ইসলামি প্রজাতন্ত্র চাই না’—এই সত্যই ছিল উচ্চারিত কিংবা অঘোষিত চিৎকার। 

ইরানে জন্মহার দ্রুত কমছে। তরুণদের বেকারত্ব প্রায় ২৫ শতাংশ। প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী তরুণ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এ এক ভয়াবহ ‘মেধা পাচার’। শাসকগোষ্ঠীর গড় বয়স বাড়ছে আর তরুণদের ধৈর্য রূপ নিচ্ছে হিংস্র ক্ষোভে। 

ধর্মীয় নেতারা তাদের শাসন দাঁড় করিয়েছে দুটি স্তম্ভের ওপর—একটি হলো ভয়, আরেকটি হলো মিথ। তারা ভয় দেখায় বসিজ (ইরানের একটি স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক বাহিনী) আর বিপ্লবী গার্ডের লৌহমুষ্টির মাধ্যমে। আর মিথ হলো এক ‘সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিপ্লব’-এর গল্প যার মাধ্যমে তারা আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পবিত্র যুদ্ধ চালানোর দাবি করে থাকে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবন যখন দুঃখে বিষিয়ে ওঠে, তখন মিথ মরে যায়। দমন যখন রুটিনে পরিণত হয়, তখন ভয় ক্ষয় হতে থাকে। যে প্রজন্ম ইতিমধ্যে সব হারিয়েছে, তাকে আর ভয় দেখিয়ে বশ মানানো যায় না। 

ইরানের ভেতরের বিশ্লেষক ও সাহসী সমালোচকেরা বলছেন—এই সমাজ ‘ভেতর থেকে পচে যাচ্ছে’। দুর্নীতি এখানে দুর্ঘটনা নয়, এটি কাঠামোগত। যে নেতারা পবিত্রতার বয়ান দেন, অথচ তাঁদের সন্তানেরা টরন্টো ও ইস্তাম্বুলে ভিলা কেনে। কর্মকর্তারা ‘প্রতিরোধ’-এর কথা বলেন আর একই সঙ্গে সম্পদ পাচার করেন বিদেশি হিসাবে।

বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উধাও হয়। আর সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে রুটির জন্য। এটি ন্যায়বিচার নয়। এটি ধর্মীয় ভাষায় মোড়ানো সংগঠিত লুটপাট। এই কারণেই এই শাসন অনুপ্রেরণা জাগাতে পারে না। সে কেবল ভয় দেখাতে পারে। 

কিন্তু ভয় দেখানোর ক্ষমতাও ভেঙে পড়ছে। নিরাপত্তা নিয়ে তটস্থ থাকতে থাকতে রাষ্ট্র এখন ক্লান্ত। সৈন্যরা বুড়ো। ক্ষুধার্ত। তারা সামান্য বেতনে দিন কাটায়। নীতি পুলিশ পুরো একটি প্রজন্মকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করতে পারে, কিন্তু স্মৃতি মুছে ফেলতে পারে না। ক্ষোভ নেভাতে পারে না। তারা কাউকে এমন কিছুর প্রতি বিশ্বাসী হতে বাধ্য করতে পারে না, যা সেই প্রজন্ম আগেই কবর দিয়েছে। 

তাহলে এই অবস্থা বিশ্বের জন্য কী বার্তা দেয়? যুক্তরাষ্ট্রের নীতির জন্য কী বার্তা দেয়? আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যই–বা এর অর্থ কী? 

ইরান এখন আর কোনো শক্তিশালী, সামনে এগিয়ে চলা বিপ্লবী রাষ্ট্র নয়। এটি আসলে দুর্বল হয়ে পড়া একটি ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, যে শাসন নিজের তৈরি সমস্যার ভারেই টালমাটাল। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী ও বাস্তব পরিস্থিতি এখন শাসকদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। 

জাসিম আল-আজ্জাবি এমবিসি, আবুধাবি টিভি, আল–জাজিরা ইংলিশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত