আমি অনেক দিন থেকেই ভাবছি, সংগীত নামটার পাশাপাশি এ ধরনের পারফরম্যান্সের জন্য আমরা ‘রঙ্গীত’ (রঙ্গ+গীত) নামটা কেন ব্যবহার শুরু করছি না। যেহেতু এ ধরনের পারফরম্যান্স আয়োজনে আয়োজক এবং বুঝে বা না বুঝে শ্রোতাকুলের একটা আগ্রহ আছে, অতএব তাঁদের জন্য এখন থেকে হোক ‘রঙ্গীতানুষ্ঠান’

এখন যেসব ধারা নিয়ে নিরীক্ষা বা রীতিমতো প্রোডাকশনস চলছে, সেগুলোও তাদের শ্রোতাকুল তৈরি করেছে এবং করে চলেছে। এটাই নিয়ম। এগুলো সবই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। আমি দু–একটা ক্ষেত্রে কিছু বলার সুযোগ নিতে চাই।

প্রথমত, আমরা যে ধারাগুলো নিয়ে কাজ করি, সেগুলোর গভীরতা, অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিকতা, কাব্যমান ও গুণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চ মানের এবং প্রমাণিত। এটা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অবয়ব গঠন করেছে। এটাই আমাদের আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। এখানে বিদেশি সংস্কৃতির আত্তীকরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা সংগত, সেটাই প্রাকৃতিক নিয়ম, কিন্তু নিজস্বতার সিংহভাগ যেন বিসর্জিত না হয়, সেটা বোঝা খুবই জরুরি। এ দেশে সংগীতকে পেশা হিসেবে নিয়ে জীবনধারণ খুব অল্পসংখ্যক মানুষের পক্ষে সম্ভব হলেও বেশির ভাগের জন্যই এটা এক অনতিক্রম্য চ্যালেঞ্জবিশেষ। কেন চ্যালেঞ্জ, সে বিষয়ে আমি লম্বা আলোচনা করতে পারি। আপাতত সেদিকে না গিয়ে একটি বিশেষ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করি। মূলধারার সংগীতের সৌন্দর্যের মূল বিষয়টি এর ভাব, কবিতা, রস, নান্দনিকতা ছাড়াও শিল্পীর তৈরি, কণ্ঠসৌকর্য, পরিবেশনাগুণ ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন সময় এই সংগীত শ্রোতার কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে পৌঁছেছে। এলপি রেকর্ড, এক্সটেনডেড প্লে, রেডিও, স্পুল টেপ, টেলিভিশন, ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডি, এমপি-থ্রি-ফোর প্লেয়ার ইত্যাদি। এখন বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব, ফেসবুক ও কিছু অনলাইন পোর্টালনির্ভর। রেকর্ড কোম্পানি বা রেডিও, টিভি চ্যানেলগুলো নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলে ফেলেছে। যাদের কনটেন্ট, গ্রাহক ও ভিউ বেশি, তারা বেশি উপার্জন করছে। একজন ব্যক্তির পক্ষে নিজস্ব কনটেন্ট বানিয়ে, ভিডিও বানিয়ে আপলোড করা, চ্যানেল ম্যানেজ করা ব্যয় ও সময়সাপেক্ষ। খরচের তুলনায় দু-চারজন কিছু উপার্জন করলেও মূল শিল্পীকুলের অবস্থা অসহায়। বাণিজ্যিক চাহিদাসম্পন্ন কিছু শিল্পীকে প্রডিউসার ও বিপণন কোম্পানিগুলো কিছু অর্থ দেয়, কিন্তু একটি দেশের সংগীতকে বাঁচিয়ে রাখা এভাবে সম্ভব নয়। রেডিও-টিভির অনুষ্ঠান ফ্রিকোয়েন্সি এবং সম্মানী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রীতিমতো হাস্যকর এবং অসম্মানজনক।

নামী, কম নামী এবং ক্ষেত্রবিশেষে নবীন অনেক শিল্পীর বেঁচে থাকার জন্য ও অর্থ উপার্জনের জন্য দুটি জায়গা শুধু বাকি রইল। একটি হলো সংগীত শিক্ষকতা, অপরটি স্টেজ পারফরম্যান্স। শিক্ষকতার জন্য যে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, তালিম, পরিচিতি; সেটা খুব বেশি প্রশিক্ষকের মধ্যে নেই। আর গান প্রথাগতভাবে শেখার আগ্রহ এখন এতটাই কম যে এর ওপরও নির্ভর করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বাকি রইল স্টেজ পারফরম্যান্স। সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি নানা পর্যায়ে এখনো নানান উপলক্ষে সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন হয়। তবে সিংহভাগ ক্ষেত্রে এই অনুষ্ঠানগুলো আয়োজনে অদ্ভুত কিছু প্রক্রিয়া চলমান। আয়োজকেরা প্রধানত সুন্দরী, তরুণী নামী-অনামী শিল্পীদের প্রতি আগ্রহী বেশি। অনুষ্ঠানে গান স্থিত হয়ে শোনা বা বোঝা যায় না। কারণ, সাউন্ড সিস্টেমের তূর্য নাদ, লেজার আলোর ঝলকানি, পারফরমারদের লাফালাফি, অনেক ক্ষেত্রে নাচানাচি, অনেক সময়ই আয়োজকদের অনেকেই স্টেজের সামনে বা মঞ্চে উঠে নেচেগেয়ে তাঁদের ক্যারিশমা প্রকাশ করেন। এখানে গভীর অভিনিবেশে সংগীতের অপরিসীম মাধুর্য আস্বাদনের কোনো উপায়ই থাকে না।

আমি অনেক দিন থেকেই ভাবছি, সংগীত নামটার পাশাপাশি এ ধরনের পারফরম্যান্সের জন্য আমরা ‘রঙ্গীত’ (রঙ্গ+গীত) নামটা কেন ব্যবহার শুরু করছি না। যেহেতু এ ধরনের পারফরম্যান্স আয়োজনে আয়োজক এবং বুঝে বা না বুঝে শ্রোতাকুলের একটা আগ্রহ আছে, অতএব তাঁদের জন্য এখন থেকে হোক ‘রঙ্গীতানুষ্ঠান’। আর আমার মতো গভীর সংগীতপিয়াসী অসংখ্য মানুষ আছেন, তাঁদের জন্য সুনিয়ন্ত্রিত, পরিমিত পরিবেশে আয়োজিত হোক সংগীতানুষ্ঠান। এটুকু করতে পারলেই মানসম্পন্ন সংগীত এবং শিল্পীদের বাঁচানোর একটা পদ্ধতি অন্তত চালু হবে। দেশ, সমাজ, সংস্কৃতির জন্য এই ভাবনা কার্যকর করা উচিত বলেই অনুমান করছি।

সুজিত মোস্তফা নজরুলসংগীতশিল্পী ও সংগীতশিক্ষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন