জাতীয় শিক্ষাক্রমে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্য একটাই—আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন ভাষাটি শিখতে পারে এবং তা ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারে। শোনা, বলা, পড়া ও লেখা—ভাষার এই চারটি দক্ষতায় পারদর্শী হলেই তো আমাদের লক্ষ্য পূরণ হয়ে যায়। গতানুগতিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিকেটিভ ইংলিশের চর্চা করছি এবং আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রমও এখন দক্ষতাভিত্তিক (Competency-Based)। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি—এই দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ইংরেজি শেখার পরও খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই কার্যকরভাবে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো—তাহলে বাকি শিক্ষার্থীরা কেন পারছে না?
এই ব্যর্থতার পেছনে একক কোনো কারণ নয়; বরং নীতি, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রস্তুতি এবং আর্থসামাজিক পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বিত ঘাটতি কাজ করছে। তাই কেবল শিক্ষাক্রম সংশোধন করে, শিক্ষক প্রশিক্ষণে কিছু পরিবর্তন এনে অথবা নতুন কিছু করতে একটি-দুটি প্রকল্প হাতে নিয়ে বিশেষ লাভ হবে বলে মনে হয় না। বরং এই সমস্যার সমাধান করতে হলে দরকার একটি সমন্বিত শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ এবং সেই সামগ্রিক সংস্কারপ্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার বিষয়টি।
সামগ্রিকভাবে আমাদের নীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের মধ্যে বড় একটি ফাঁক রয়েছে। কাগজে-কলমে শিক্ষাক্রমকে দক্ষতাভিত্তিক বলা হলেও সেই অনুযায়ী অবকাঠামো, শিক্ষক প্রস্তুতি, শ্রেণিকক্ষ উপকরণ, পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং মূল্যায়ন–কাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে ওঠেনি।
ফলে শিক্ষাক্রমে যে আদর্শিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। অনেক শিক্ষকই বাস্তবে সেই নতুন পদ্ধতিতে পাঠদান করার মতো পর্যাপ্ত সহায়তা বা নির্দেশনা পান না। অনেক শিক্ষক নিজেই ইংরেজি বলায় বা উচ্চারণে আত্মবিশ্বাসী নন। ফলে শ্রেণিকক্ষে বলার বা শোনার অনুশীলন করাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
আমাদের পাঠদান পদ্ধতি এখনো মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক। অনেক ক্ষেত্রে পাঠদান সীমাবদ্ধ থাকে ব্যাকরণের নিয়ম বোঝানো, বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে দেওয়া এবং মুখস্থ করতে বাধ্য করার মধ্যে। অথচ ভাষা শেখা মূলত দক্ষতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া, যা নিয়মিত অনুশীলন ও ব্যবহার ছাড়া সম্ভব নয়।
আমাদের পাঠদান পদ্ধতি এখনো মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক। অনেক ক্ষেত্রে পাঠদান সীমাবদ্ধ থাকে ব্যাকরণের নিয়ম বোঝানো, বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে দেওয়া এবং মুখস্থ করতে বাধ্য করার মধ্যে। অথচ ভাষা শেখা মূলত দক্ষতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া, যা নিয়মিত অনুশীলন ও ব্যবহার ছাড়া সম্ভব নয়।
অথচ আমাদের শিক্ষার্থীদের কাছে ইংরেজি শেখার প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে বছর শেষে ও পাবলিক পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া। এই পরীক্ষাগুলোতেও আবার ভাষার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা—শোনা ও বলা—পুরোপুরি অনুপস্থিত। এদিকে পেপার-পেনসিলনির্ভর পরীক্ষাপদ্ধতি দিয়ে সত্যিকারের পড়া ও লেখার দক্ষতাও যাচাই করা সম্ভব হয় না। কারণ, মুখস্থনির্ভর অনুশীলন, সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর আয়ত্ত করে নেওয়া কিংবা ব্যাকরণের নিয়ম মনে রাখা—এসবই হয়ে ওঠে পরীক্ষায় ভালো করার প্রধান কৌশল।
এই মূল্যায়নব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো কার্যকর গাঠনিক মূল্যায়ন (ফরম্যাটিভ অ্যাসেসমেন্ট) ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি যাচাই করা, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী পাঠদানপদ্ধতি পরিবর্তন করার যে ধারাবাহিক মূল্যায়নব্যবস্থা থাকা উচিত, তা খুবই সীমিত। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কেউই বুঝতে পারে না প্রকৃতপক্ষে কোথায় উন্নতির প্রয়োজন। ফলে ভাষা শেখার প্রকৃত উদ্দেশ্যটিই হারিয়ে যায় এবং ইংরেজিকে তখন একটি ভাষা নয়, বরং শেখানো হয় আর পাঁচটি বিষয়ের মতোই একটি বিষয় হিসেবে।
প্রসঙ্গক্রমেই চলে আসে শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে উপযুক্ত শিক্ষক প্রস্তুতির কথা। এ ক্ষেত্রে আমাদের চূড়ান্ত ঘাটতিই সম্ভবত এই ব্যর্থতার অন্যতম বড় কারণ। সমস্যার শুরু হয় শিক্ষক নিয়োগের নীতিগত অবস্থান থেকে, আর তা একটি গতানুগতিক শিক্ষক প্রশিক্ষণব্যবস্থার ভেতর দিয়ে বড় হতে থাকে। আর তা শেষ হয় শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষাগত দক্ষতা অর্জন না করতে পারার মধ্য দিয়ে।
আমরা তো শিক্ষক হওয়ার মতো যোগ্যতা যাচাই করে শিক্ষক নিয়োগ দিই না। এই নিয়োগে যেমন নেই শিখন-শেখানোর বিষয়ে ডিগ্রিধারী হওয়ার বাধ্যবাধকতা, তেমনি নেই চাকরিপ্রার্থীদের পাঠদানের যোগ্যতা যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা। এমনকি ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাই করার ব্যবস্থাও সেখানে নেই, বরং নেওয়া হয় সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা, যা শিক্ষকতার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো কাজেই আসে না। তাই নিয়োগের পরে শুরু হয় তাদের সাধারণ জ্ঞানকে শিক্ষকতার জ্ঞানে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াও আবার অত্যন্ত সেকেলে, অত্যধিক তত্ত্বনির্ভর এবং তার অনেক কিছুই বিদ্যালয়ে ফিরে এসে প্রয়োগ উপযোগী নয়। আবার ধারাবাহিক শিক্ষক প্রশিক্ষণও মূলত এককালীন ও প্রকল্পনির্ভর হওয়ায় তার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না।
উন্নত বিশ্ব যেখানে গতানুগতিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ থেকে সরে এসে ধারাবাহিক শিক্ষক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে, আমরা এখনো পড়ে আছি কেবল শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়ে, যার স্থায়িত্ব কয়েকটা দিন বা সপ্তাহ মাত্র। বৈশ্বিক গবেষণা যখন স্পষ্ট পরামর্শ দিচ্ছে ধারাবাহিক বিদ্যালয়ভিত্তিক পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের দিকে জোর দিতে, আমরা এখনো শিক্ষকদের বিদ্যালয় থেকে বের করে এনে একধরনের প্রশিক্ষণ উৎসব করছি। এত রকম ভুল করার পরও কী করে আমরা আশা করতে পারি আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জন করবে এবং সেই ধারাবাহিতকায় ইংরেজি ভাষা দক্ষতা অর্জন করবে?
এবার আসি শিক্ষাপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার প্রসঙ্গে। আমরা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেছি বহু আগেই এবং বিদ্যালয় পর্যন্ত ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরও পৌঁছে দিয়েছি। প্রশ্ন হলো—আমরা তা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছি? মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের নামে কোনো পাঠ কেবল প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখিয়ে দিলেই কি হয়ে যায়? ডিজিটাল কনটেন্ট বলতে আমরা যা দেখি তার প্রায় সবই তো ওই ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার উপায় বই অন্য কিছু নয়।
আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে ভাষা ল্যাব নেই, বড় শ্রেণিকক্ষে সবাইকে শোনানোর মতো অডিও ডিভাইস ও রিসোর্স নেই; এবং সেসব কার্যকরভাবে ব্যবহার করার মতো পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষকও নেই। শহরে যাও আছে, গ্রামের বিদ্যালয়ে আরও নেই এবং সে কারণেও দিনকে দিন শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য বেড়েই চলেছে। এসব থাকলে অন্তত শ্রেণিকক্ষে অডিও উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন একসেন্ট শোনার সুযোগ দেওয়া যেত। শিক্ষার্থীরা তখন সঠিক উচ্চারণে এবং বেশি বেশি কথোপকথনের অনুশীলন করে ইংরেজি ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারত।
তাহলে এত সব সমস্যার সমাধান হবে কী করে?
শিক্ষক নিয়োগ, মূল্যায়নপদ্ধতি, শিক্ষক উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষ অনুশীলন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নীতিগত সমন্বয়—সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার প্রয়োজন। আর সেটি করার জন্য সবার আগে দরকার উপযুক্ত শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন।
এই কমিশনে যুক্ত হবেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, যাঁদের শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষা গবেষণা নিয়ে কাজ করার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। তাঁদের প্রথম কাজ হবে একটি বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা করে সমস্যার গোড়ার কারণ খুঁজে বের করা। আরেকটি কাজ হবে বিশ্বের নানা প্রান্তে যেসব দেশ শিক্ষায় বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়েছে, তারা কী করছে তা দেখে আসা এবং তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের কাছ থেকে শিখে নেওয়া। এরপর এই কমিশনের কাজ হবে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাব পেশ করা। তারপর শুরু করতে হবে প্রতিটি সমস্যা ধরে ধরে সমাধানের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা দক্ষতা অর্জনের কথা বলতে গিয়ে রীতিমতো শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাব করে বসলাম। করলাম কারণ শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা দক্ষতা অর্জন না করতে পারার সমস্যা অনেক গভীরে এবং সামগ্রিক শিক্ষা সংস্কার ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে তার সমাধান করা অসম্ভব। আমরা থেমে থাকলে পিছিয়ে পড়ব, ধীরে এগোলেও পিছিয়ে পড়ব আর পেছনের দিকে হাঁটলে তো অস্তিত্বসংকটেই পড়ে যাব। তাই আসুন, সমস্যার আবর্তে আর ঘুরপাক না খেয়ে শিক্ষার উন্নয়ন নিশ্চিত করি দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য।
সুদেব কুমার বিশ্বাস শিক্ষাবিশেষজ্ঞ
ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব