জার্মানির রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গাজায় চলমান গণহত্যার ক্ষেত্রে সীমাহীন নিষ্ঠুরতার সঙ্গে জার্মানির সম্পৃক্ততা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে চলমান অবরোধের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের কারণে।
একইসাথে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান দেশটির রাজনৈতিক সততাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতিও জার্মানির সরকারের দায়বদ্ধতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ইসরায়েলি শাসনের সহযোগী হয়ে ওঠার পর থেকে জার্মানির শীর্ষ নেতৃত্ব ধীরে ধীরে একই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল গ্রহণ করেছে। তাঁদের নীতিতে শিষ্টাচারের অভাব স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকেও তারা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক ও সাবেক চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যোদ্ধাদের হাতে ইসরায়েলি নারীদের ধর্ষণের একটি ভিডিও তাঁরা দেখেছেন; কিন্তু এমন কোনো ভিডিও কখনো প্রকাশিত হয়নি। এই বক্তব্য জার্মানির জনগণকে বিভ্রান্ত করার শামিল। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এর চেয়ে গুরুতর ঘটনা আর কী হতে পারে! কিন্তু সময় দেখাল, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয় কতটা গভীর হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, জার্মানি কি তার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা পালনের নামে অন্যায়ের প্রতি নীরব সমর্থন দিচ্ছে? সমালোচকদের মতে, দেশটি যেন নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির বদলে অন্যের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে। এতে জার্মান গণতন্ত্র ও নৈতিক অবস্থানের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে।
গত সপ্তাহে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল এমন একটি পদক্ষেপ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যে কুৎসা রটনার কৌশল চালু আছে, তিনি সেটিকেই অনুসরণ করেন।
তাঁর ফরাসি সহকর্মীর সঙ্গে মিলে তিনি জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেস্কা আলবানেজের পদত্যাগ দাবি করেন। অভিযোগ আছে, আল–জাজিরা ফোরামে আলবানেজ নাকি ইসরায়েলকে মানবতার শত্রু বলেছেন। ফরাসি রাজনীতিক ক্যারোলিন ইয়াদান এ বক্তব্যকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে আখ্যা দেন।
কিন্তু আলবানেজ আসলে যা বলেছিলেন, তা ভিন্ন। তিনি বলেছিলেন, যাঁদের হাতে বিপুল অর্থ, অ্যালগরিদম বা অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণে নেই, মানবজাতি হিসেবে তাঁদের জন্য একটি অভিন্ন শত্রু রয়েছে। বক্তব্যটি সাধারণ মানবিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছিল। এটিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়।
ওয়াডেফুল ও তাঁর মন্ত্রণালয় সূত্র যাচাইয়ের প্রয়োজনও মনে করেননি। আরেকজন ইউরোপীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন শুনেই তিনি সেই সুরে সুর মিলিয়েছেন। এ ঘটনাকে সাম্প্রতিক জার্মান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম উদ্বেগজনক অধ্যায় বলা যায়।
এরপর আরও একটি ঘটনা ঘটে। জার্মানির পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট জুলিয়া ক্লোকনার ফেব্রুয়ারি মাসে ইসরায়েল সফর করেন। সফর শেষে তিনি জার্মানির সরকারি টেলিভিশন এআরডিতে বক্তব্য দেন। তিনি গাজার সীমান্তবর্তী ইয়েলো লাইনে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রচারণার পুনরাবৃত্তি করেন। তাঁর বক্তব্যে গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞের কোনো সমালোচনা ছিল না।
জুলিয়া ক্লোকনার বলেন, কিছু বসতি ও তাঁবু ধ্বংস হয়েছে, এ ছাড়া কিছু না। যে অংশটি তিনি দেখেছেন, তা অন্য অংশের মতো এতটা বিধ্বস্ত নয়। কারণ, অনেক জিম্মিকে সেখানে রাখা হয়েছিল। এই বক্তব্য প্রশ্নের জন্ম দেয়।
যদি ইসরায়েল জানত জিম্মিরা কোথায় আছে, তবে তাদের উদ্ধারের বদলে চারপাশে ব্যাপক বোমাবর্ষণ কেন হলো?
ক্লোকনার আরও বলেন, সেখানে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেন আরেকটি গাজা; কিন্তু তিনি সীমান্তে দাঁড়িয়ে কীভাবে এই সুড়ঙ্গ দেখলেন? তিনি কি কোনো সুড়ঙ্গে গিয়েছিলেন? কোনো ছবি বা ভিডিও কি তিনি দেখাতে পেরেছেন? এমন কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক রেডক্রসের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন।
তাঁর দাবি, ইয়েলো লাইন বা হলুদ রেখা স্থাপনের পর গুলি ও লড়াই বন্ধ হয়েছে। খাদ্য ও ওষুধসহ সহায়তা বেড়েছে। তবে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের নিয়মের কারণে চিকিৎসা সরঞ্জাম ধীরে পৌঁছাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হামাস তাদের লোকজনকে সামনে পাঠিয়ে কষ্ট দিচ্ছে।
এই বক্তব্যও বিতর্কের জন্ম দেয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, গাজায় সহায়তা প্রবেশে নানা বাধা রয়েছে। খাদ্য, পানি, তাঁবু ও ওষুধ সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্লোকনারের বক্তব্যে এসব উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যায়নি। সমালোচকেরা বলছেন, জার্মান নেতৃত্ব ইসরায়েলের বক্তব্যকে যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করছে। গাজার হাসপাতাল ধ্বংসের পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, তাতেও অনেকে অসংগতি খুঁজে পেয়েছিলেন। তবু জার্মানির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে খুব কমই প্রশ্ন তুলেছেন।
এই ধারাবাহিক অবস্থান জার্মান নীতিকে বিতর্কিত করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তাদের ভূমিকা এখন সমালোচনার মুখে। দেশে ও দেশের বাইরে অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক সততা ও স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখার বদলে জার্মান নেতৃত্ব একতরফা অবস্থান নিচ্ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, জার্মানি কি তার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা পালনের নামে অন্যায়ের প্রতি নীরব সমর্থন দিচ্ছে? সমালোচকদের মতে, দেশটি যেন নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির বদলে অন্যের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে। এতে জার্মান গণতন্ত্র ও নৈতিক অবস্থানের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি জার্মান রাজনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব এবং নাগরিকদের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও গভীর হবে। জার্মান নেতৃত্বের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, তারা কি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেবে, নাকি বিতর্কিত নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
জুর্গেন ম্যাকার্ট জার্মানির পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক
মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত