ঈদ-উল-ফিতর বাঙালির অন্যতম বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। এক মাস সিয়াম সাধনার পর এই দিনটি আসে আনন্দ, মিলন ও প্রাচুর্যের বার্তা নিয়ে। ঘরে ঘরে রান্না হয় সেমাই, পোলাও, কাবাব, মাংস ও নানা রকম মিষ্টান্ন। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের আপ্যায়নে যেন কোনো কমতি থাকে না। তবে এই আনন্দঘন সময়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়—খাদ্যের নিরাপত্তা।
আমরা অনেক সময় খাবারের স্বাদ, বৈচিত্র্য ও আয়োজন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময়ই পাই না। অথচ বাস্তবতা হলো, এই উৎসবের সময়েই অনিরাপদ ও ভেজাল খাবারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয় এবং প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই তথ্য শুধু একটি সংখ্যা নয়—এটি আমাদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ঝুঁকি আরও বেশি, যেখানে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে ত্রুটি থেকে যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাজারে পাওয়া খাদ্যের একটি বড় অংশ ভেজাল বা দূষিত। কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, ফরমালিন, কৃত্রিম রং এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সংরক্ষণ—সব মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
ঈদের সময় এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ, এই সময়ে খাবারের চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে মানের সঙ্গে আপস করা হয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে বা রাসায়নিক মিশিয়ে খাবারকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের কিছু বিষয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
প্রথমত, খাবারের রং। প্রাকৃতিক খাবারে সাধারণত কিছুটা অসমতা থাকে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা অস্বাভাবিক রং অনেক সময় কৃত্রিম রং ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। ঈদের মিষ্টি বা ফল কেনার সময় এই বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, খাবারের গন্ধ। মাছ, মাংস বা দুগ্ধজাত খাবারে অস্বাভাবিক বা তীব্র গন্ধ থাকলে তা দূষণের লক্ষণ হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে খাবারের স্বাভাবিক গন্ধ পরিবর্তিত হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
তৃতীয়ত, স্পর্শের মাধ্যমে খাবারের অবস্থা বোঝা যায়। পিচ্ছিল বা অস্বাভাবিক নরম মাংস ও মাছ সাধারণত নষ্ট হওয়ার লক্ষণ। আবার অনেক সময় ফল দ্রুত পাকানোর জন্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা ফলের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে দেয়।
ঈদের বাজার করার সময় পরিচিত ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে পণ্য কেনা উচিত। খুব কম দামে কোনো পণ্য পেলে সেটি নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষেত্রে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং অনুমোদনের সিল পরীক্ষা করা অপরিহার্য।
খাদ্যদূষণ সাধারণত তিনভাবে ঘটে—জীবাণুজনিত, রাসায়নিক এবং ভৌত। জীবাণুজনিত দূষণ দ্রুত অসুস্থতা সৃষ্টি করে, যেমন ডায়রিয়া বা খাদ্য বিষক্রিয়া। রাসায়নিক দূষণ দীর্ঘমেয়াদে শরীরে জমে থেকে লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ভৌত দূষণের মধ্যে ধুলো বা ময়লা অন্তর্ভুক্ত।
খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। ভালোভাবে ধোয়া, পর্যাপ্ত তাপে রান্না করা এবং পরিষ্কার পরিবেশ বজায় রাখা—এই সহজ অভ্যাসগুলো অনেক বড় ঝুঁকি কমাতে পারে। কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা উচিত এবং খাবার দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে।
উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে জাপানের কথা বলা যায়। এই বাস্তবতার সঙ্গে জাপানের অভিজ্ঞতার একটি স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে। জাপানে কাজ করার সময় দেখেছি, সেখানে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি খাদ্যের উৎস শনাক্তযোগ্য এবং নিয়ম ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে সেখানে খাদ্যজনিত অসুস্থতার হার তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন ও নীতিমালা থাকলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় ভোক্তাদের সচেতনতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি মানুষ যদি নিজের ও পরিবারের খাবারের বিষয়ে সচেতন হন, তাহলে এই সমস্যার সমাধান অনেকাংশে সম্ভব।
ঈদ নিঃসন্দেহে আনন্দের উৎসব। কিন্তু সেই আনন্দ যেন অসুস্থতার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। নিরাপদ খাবার শুধু একটি ব্যক্তিগত পছন্দ নয়—এটি একটি সামাজিক প্রয়োজন।
খাবার আমাদের জীবনের ভিত্তি। তাই প্রতিবার খাবার গ্রহণের আগে আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা উচিত— 'এটি কি নিরাপদ?'
এই ঈদে আনন্দের পাশাপাশি সচেতনতার বার্তাও ছড়িয়ে পড়ুক। নিরাপদ খাবার হোক আমাদের উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির অধ্যাপক ও গবেষক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
*মতামত লেখকের নিজস্ব