সম্প্রতি প্রায় ৪০ বছর পর টেক্সাসে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে প্রথম মার্কিন সিনেট সিটে জয়লাভের পর নবনির্বাচিত সিনেটর জেমস ট্যালারিকো বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা নিশ্চিত যে আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে লাগাতার বিষোদ্গার সহ্য করতে করতে ক্লান্ত। আমরা একে অপরকে ঘৃণা করার নির্দেশনা পেতে পেতে ক্লান্ত।
প্রায় ১০ বছর ধরে এই ধারার রাজনীতি চলছে। রক্তক্ষয়ী খেলাধুলার রাজনীতি, ট্রলিং এবং অপরকে অপমান করার রাজনীতি, কিংবা পেশাদার রেসলিংয়ের মতো রাজনীতি। এটি পরিবারগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে, বন্ধুত্ব ধ্বংস করছে এবং সব সময় আমাদের সবাইকে এক বিশ্রী অনুভূতিতে ডুবিয়ে রাখছে।’
আমি ট্যালারিকো বা তাঁর নীতিগুলোকে পছন্দ করি না। তবে একটি বিষয়ে তাঁর সঙ্গে একমত: আমেরিকান জনগণ একে অপরের বিরুদ্ধে এই উসকানি সহ্য করতে করতে সত্যি ক্লান্ত। আমাদের এখন রিপাবলিকান পার্টি এবং সামগ্রিকভাবে মার্কিন রাজনীতিতে বিভাজন সৃষ্টিকারীদের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে পারা নেতাদের বেশি প্রয়োজন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ডানপন্থীদের রাজনীতিতে এক দশক ধরে প্রভাব বিস্তার করার পর অনেক মার্কিন ভোটার ঠিক এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন বলে মনে হয়।
এক দশক আগে, তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পদ্ধতি এবং উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের একের পর এক ধারালো ও অপমানজনক ডাকনাম দিয়ে আক্রমণ করে তিনি তাঁর প্রথম মেয়াদের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। যেমন ‘ক্রুকেড হিলারি’, ‘লো-এনার্জি জেব’, ‘পোকাহন্টাস’, ‘লিটল মার্কো’, ‘ক্রেজি বার্নি’, ‘লাইং টেড’।
এগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল প্রতিপক্ষকে হেয় করা। তাঁর অনুগত মাগা সমর্থকেরাই উপভোগ করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই আক্রমণগুলো দারুণ সাড়া ফেলেছিল এবং এটি এমন এক মার্কিন সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছিল, যা তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মোটেও শ্রদ্ধাশীল ছিল না; বরং তাঁরা অনেক বেশি অশালীন ভাষা এবং বিনোদনে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের মতোই, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছেন। কোনো তিক্ততা ছাড়াই মতবিরোধ প্রকাশের সেই পুরোনো ভালো দিনগুলোতে হয়তোবা আমরা পুরোপুরি ফিরে যেতে পারব না; কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয় উপহার দিয়ে ভোটাররা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁরা ট্রাম্পের এই কটু ও বিভাজনমুখী রাজনীতিতে চরম বিরক্ত।
ট্রাম্পের এই আক্রমণগুলোর মধ্যে পেশাদার কুস্তির মাঠের মতো পরিবেশ তৈরি হতো। এ যেন একেবারে নিম্নস্তরের এক সংঘাতের খেলা। ট্রাম্পের সমর্থকেরা দারুণভাবে তা উপভোগ করেছিলেন। কারণ, যে অভিজাত শ্রেণি তাঁদের ঘৃণা করত, তিনি তাদের বিরুদ্ধে ছিলেন।
ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে হোয়াইট হাউসের দৌড়ে যোগ দেওয়ার সাত বছর আগে সান ফ্রান্সিসকোতে এক ভাষণে বারাক ওবামা বলেছিলেন যে এ ধরনের মানুষেরা ‘হতাশ হয়ে পড়েন, তাই তাঁরা তাঁদের হতাশা দূর করতে বন্দুক, ধর্ম, অন্যদের প্রতি বিদ্বেষ, কিংবা অভিবাসী ও বাণিজ্যবিরোধী মনোভাব আঁকড়ে ধরেন।’
যুক্তরাষ্ট্রে টি পার্টি আন্দোলনের সময় বিক্ষোভরত ক্রুদ্ধ ভোটারদের ট্রাম্প একছাতার নিচে আনেন এবং ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) গড়ে তোলেন। ট্রাম্পের যোগাযোগের অনাবিল ও সরাসরি পদ্ধতি তাঁরা পছন্দ করতেন। তাঁরা ভালোবাসতেন, যখন তিনি অবৈধ অভিবাসন বন্ধ এবং চাকরি ধ্বংসকারী মুক্তবাণিজ্য নীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতেন।
ট্রাম্পের কটু কথাবার্তাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সৎ, খাঁটি, স্ক্রিপ্টহীন এবং বাস্তব বলে মনে হতো। এগুলো যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি নয় কিংবা দামি বক্তৃতা লেখকদের লেখা নয়। ট্রাম্প তাঁদের প্রতি কোনো ওপরের তলার নেতা হিসেবে নন, তাঁদের একজন হয়ে কথা বলতেন। তিনি তাঁদের ভয়ের কথা শুনেছিলেন এবং প্রতিশোধের সঙ্গে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প যখন দাবি করলেন যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁর পুনর্নির্বাচন চুরি করেছে, তখন তিনি কিন্তু চুপচাপ বসে থেকে ফল মেনে নেননি। তিনি আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়েছিলেন, একটি বিতর্কিত আইনি কৌশল তৈরি করেছিলেন এবং তারপর ক্যাপিটল হিলে তাঁর সমর্থকদের লেলিয়ে দিয়েছিলেন। এটি কাজ করেনি, কিন্তু এর ফলে রাজনীতি থেকে তাঁর বিদায়ও ঘটেনি।
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চার বছরের মেয়াদে ট্রাম্প আইনি আক্রমণ, কারাদণ্ডের হুমকি এবং হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়ে ২০২৪ সালে আবার ক্ষমতায় বসার মতো এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হন। তাঁর পুনরুত্থানকে নিয়তি বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু রাজনীতির হাওয়া প্রায়ই যেভাবে বদলায়, ভোটারদের মেজাজও পাল্টে গেল। রাজনীতির প্রচলিত নিয়ম ভেঙে ফেলার যেই অসংলগ্ন স্টাইল তাঁরা একসময় পছন্দ করতেন, সেখান থেকে সরে এসে ভোটাররা এখন মূল্যস্ফীতি ও গ্যাসের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণের হিসাব চাইতে শুরু করলেন।
ট্রাম্প একসময় আমাদের বিদেশের যুদ্ধে না জড়ানোর কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিও ভেঙে যায়। ইরান আক্রমণ করার হয়তো তাঁর কোনো ভালো কারণ থাকতে পারে, কিন্তু তিনি মার্কিন জনগণের কাছে তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন এবং ভোটাররা আরেকটি প্রতিশ্রুতি ভাঙা দেখে দ্রুতই মোহগ্রস্ততা হারান।
এমনকি খোদ ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন যে এই যুদ্ধই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ। তবে এটি কেবল যুদ্ধের কারণে নয়—ভোটাররা আসলে এই পুরো নাটকীয়তাতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
ট্রাম্প যখন তাঁর ভোটারদের ভেবে নিতে বলেছিলেন যে ব্যালটে তিনি নিজেই আছেন, তখন কেবল তাঁর সমর্থকেরাই যে এই নির্বাচনকে ট্রাম্পের ওপর গণভোট বানিয়েছেন তা নয়; ক্ষুব্ধ ডেমোক্র্যাট, অসন্তুষ্ট নির্দলীয় ভোটার এবং বেশ কয়েকজন সাবেক ‘মাগা’ সমর্থকও এটি নিশ্চিত করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন এই নির্বাচন জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একজন শৃঙ্খলহীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে রায়।
ট্রাম্প নারী, হিস্পানিক, এশিয়ান, আরব, আফ্রিকান–আমেরিকানদের নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন এবং মধ্য পশ্চিমের সুশিক্ষিত নাগরিকদের ব্যথিত করেছিলেন। তাঁরা ট্রাম্পের ভাষা ও অসদাচরণ আর সহ্য করতে পারছিলেন না।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য তিনি যে বিশাল মাগা জোট গড়ে তুলেছিলেন, তা একরাতের নির্বাচনেই ভেঙে খানখান হয়ে যায়। কারণ, জনগণ এই বাজে বকানি থেকে মুক্তি পেয়ে পরিবর্তনের ছোঁয়া চেয়েছিলেন।
রিপাবলিকানদের অবস্থা এতটাই খারাপ যে তাঁরা প্রতিনিধি পরিষদের নেতা রিচার্ড হাডসন থেকে শুরু করে অত্যন্ত বিতর্কিত মাগা যোদ্ধা কেন প্যাক্সটন কিংবা অভিজ্ঞ ও কার্যকর বাজেটনির্ধারক সুসান কলিন্সের মতো সব ধরনের সদস্যদের হারিয়েছেন। রক্ষণশীল রিপাবলিকানরা হেরেছেন। ঐতিহ্যবাহী রিপাবলিকানরা হেরেছেন। মধ্যপন্থী রিপাবলিকানরা হেরেছেন। সব ধরনের রিপাবলিকান হেরেছেন। এটি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সমগ্র জিওপির একটি সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান। এক চরম বিপর্যয়।
এখন দুটি প্রশ্ন রয়ে যায়। মাগা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী? আর ট্রাম্প রাজনীতিকে পেশাদারি কুস্তির চেয়ে বেশি সংঘাতপূর্ণ যুদ্ধে রূপ দেওয়ার আগে মার্কিন রাজনীতির যে ‘সোনালি দিনগুলো’ ছিল, সেখানে কি কখনো ফিরে যাওয়া সম্ভব? উত্তরটি হলো, রিপাবলিকানরা যদি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম এবং তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো মৌলিকভাবে পরিবর্তন না করেন, তবে তাঁরা আর কোনো নির্বাচনে জিততে পারবেন না। মাগা আন্দোলন চিরতরে হারিয়ে যাবে।
অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের মতোই, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছেন। কোনো তিক্ততা ছাড়াই মতবিরোধ প্রকাশের সেই পুরোনো ভালো দিনগুলোতে হয়তোবা আমরা পুরোপুরি ফিরে যেতে পারব না; কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয় উপহার দিয়ে ভোটাররা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁরা ট্রাম্পের এই কটু ও বিভাজনমুখী রাজনীতিতে চরম বিরক্ত।
এই নির্বাচন ডেমোক্রেটিক নীতির কোনো সমর্থন ছিল না। এটি ছিল ট্রাম্পবাদ এবং তাঁর বিষাক্ত রাজনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে একটি গণভোট। এখন দেখার বিষয়, তিনি এই বার্তা বুঝতে পেরেছেন কি না।
জন ফিহেরি ক্যাপিটল হিল ও ওয়াশিংটন ডিসির সাবেক শীর্ষ লবিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আল–জাজিরা থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত