ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক নিকোলো মেকিয়াভেলির প্রখ্যাত দ্য প্রিন্স বইটি যারা পড়েছেন, তাঁরা ক্ষমতার প্রকাশ্য ও ভয়াবহ চর্চার নির্মম সত্যের বিষয়টি জানেন । ৫০০ বছর আগে লেখা এই বইতে মেকিয়াভেলি দেখিয়েছিলেন, কোনো শাসনব্যবস্থায় যখন আইন ও নৈতিকতাকে ছাপিয়ে স্রেফ ভয় ও বলপ্রয়োগের নীতি কার্যকর হয়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত এক চরম অরাজকতার দিকে যাত্রা করে।
আজ ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ধূলিসাৎ হওয়া ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালে মেকিয়াভেলির সেই আশঙ্কাই যেন চোখে ধরা পড়ে।
যে দেশে হামে প্রতিদিন একাধিক বাচ্চা মারা যাচ্ছে, এ বছর সাত মাসের হিসাবে ইতিমধ্যে সহস্রাধিক বাচ্চা মারাও গেছে, সেই দেশের খোদ রাজধানীতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ৫০ বছরের পুরোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে মূলত প্রসূতি নারী ও শিশুদের সেবা দেওয়া হয়, টিকা দেওয়া হয়, তা এক রাতে ভারী এক্সকাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো!
শুধু তাই নয় জীবনের সঞ্চার করা শিশুটিকা আর কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতিও লুট করে নিয়ে যাওয়া হলো। মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটলেও কয়েক শ মানুষের এ তাণ্ডব কোনোভাবেই নীরব কর্মকাণ্ড ছিল না। এলাকাবাসী জানলেও কোনো বাধা দেওয়ার বা প্রতিবাদ করার উপায় ছিল না।
মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্রটি কেবল একটি চার দেয়ালের পাকা ভবন ছিল না; এটি ছিল ১৯৭৪ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের হাজার হাজার নারী ও শিশুর আশার আশ্রয়স্থল।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের উদ্যোগে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যেটির সঙ্গে যুক্ত আছেন এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি নারী ও সমাজকর্মী তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ। জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিও এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এক সময়।
নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট প্রতিনিধি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, নামকরা চিকিৎসক ও সমাজসেবীদের স্মৃতি ও ঘাম জড়িয়ে ছিল এ প্রতিষ্ঠান, তা রাতারাতি পরিণত হলো পলেস্তারা, বাঁশ আর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক ধ্বংসস্তূপে।
আর এই ধ্বংসযজ্ঞের ঠিক পরের দিন সকালে কী দেখা গেল? খোলা আকাশে, ধুলোবালির মধ্যে, বাঁশের খুঁটিতে ত্রিপল টাঙিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিলে বসে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের হামের টিকা দিচ্ছেন। শিশুরা প্রচণ্ড গরমে ও অস্বস্তিতে ছটফট করে কাঁদছে। চরম এই অমানবিক দৃশ্য আমাদের কোনোভাবেই স্বস্তিতে থাকতে দেয় না।
বলতেই হচ্ছে যে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই চেনা, পুরোনো ও দুর্বৃত্তায়িত ক্ষমতাচর্চার বহিঃপ্রকাশ ঘটল। সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার পরিবর্তন হয় কিন্তু জবরদখল ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনৈতিক চরিত্র বিন্দুমাত্র বদলায় না। আরও হতাশার বিষয় যে, একটা রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থানের পরেও আমাদের এসব দেখতে হচ্ছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই ১০ কাঠা জমির ওপর নজর ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’ নামক এক ভুঁইফোড় সংগঠনের ব্যানারে সাবেক এক কাউন্সিলরের স্ত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) মদদে এই দখলদারির অভিযোগ উঠেছে।
এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের দায় এড়িয়ে যেমন মেকি বক্তব্য দিয়ে থাকেন, সেই নারী সংসদ সদস্যের মুখেও তা শোনা গেল, ‘আমি ভাঙচুরের কথা শুনেছি, তবে আমি জড়িত নই’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০০-২৫০ জন সশস্ত্র লোক রাতারাতি এসে এক্সকাভেটর বা বুলডোজার দিয়ে একটি বিশাল স্থাপনা ভেঙে ফেলবে, অথচ স্থানীয় রাজনৈতিক অভিভাবক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই জানবে না—এমন গল্প বিশ্বাস করার মতো অবোধ কি এ দেশের মানুষ? ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারী সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ ওঠেছে। মানুষ তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছে।
আজ সরকার যদি এই দখলদারির বিচার করতে ব্যর্থ হয় তবে এ ধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতার জন্য যে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তখন নাগরিক হিসেবে আমরা কি কেবল নীরব দর্শক হয়ে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাব?
আরও বেশি অবাক হতে হয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খানের বক্তব্যে। তাঁর জানামতে, জায়গাটি কাঁচাবাজার ও সেমিপাকা ধরনের ছিল। সেখানে কোনো ভবন বা স্থাপনা ছিল না। তার মানে এখানে যে কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের স্থাপনা ছিল তা তিনি জানতেন না! নাকি জেনেও অস্বীকার করলেন?
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় হামলা চালিয়ে একটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র যখন এভাবে গুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় এবং হামলাকারীদের কেউ বাধা দিতে পারে না, পুলিশ অসহায় হয়ে থাকে, প্রশাসকও পরোক্ষভাবে এ নিয়ে সাফাই গায়—তখন এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ‘আইনের শাসন’ বা ‘জননিরাপত্তা’ শব্দগুলো এ ক্ষেত্রে স্রেফ অর্থহীন।
এই ঘটনার সবচেয়ে আতঙ্কজনক দিক হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা। কেন্দ্রটির কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, তাণ্ডব চলার সময়েই তাঁরা পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন। পুলিশ নাকি ঘটনাস্থলেও গিয়েছিল, অথচ চোখের সামনে এত বড় একটি হাসপাতাল স্থাপনা ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া তারা ঠেকাতে পারল না! ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর শাহ আলী থানার পুলিশ কর্মকর্তার মুখে সেই গতানুগতিক বক্তব্যই শোনা গেল, ‘মামলা হয়েছে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব’।
থানার খুব কাছে, রাজধানীর বুকে এত বড় একটি তাণ্ডব ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলল, আর পুলিশ তা ‘ঠেকানোর সাধ্য রাখল না’—এটি কি স্রেফ অক্ষমতা, নাকি অপরাধীদের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সম্মতি?
এ ঘটনা কেবল ১০ কাঠা জমি দখলের একটি সাধারণ অপরাধ নয়; এটি যেন একটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক অধপতনের বড় দৃষ্টান্ত। যে শিশুটি আজ রাস্তার ওপর ধুলোবালিতে বসে ত্রিপলের নিচে দাঁড়িয়ে টিকা নিচ্ছে, বড় হয়ে সে এই রাষ্ট্রকে কীভাবে মনে রাখবে? সে কি জানবে না যে, এই দেশে মানুষের জীবনের চেয়ে জমির দাম বেশি? এই দেশে আইনের চেয়ে রাজনৈতিক মাস্তানদের হাতুড়ি আর এক্সকাভেটর বা বুলডোজারের শক্তি বেশি?
আজ সরকার যদি এই দখলদারির বিচার করতে ব্যর্থ হয় তবে এ ধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতার জন্য যে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তখন নাগরিক হিসেবে আমরা কি কেবল নীরব দর্শক হয়ে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাব?
রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই-মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব