রামেকে ১১ দিনে ৩৩ শিশুর মৃত্যু ও আইসিইউ নিয়ে ভুল ধারণা

প্রথম আলোর প্রতিবেদন

দিনটি শুরু হলো চায়ের কাপ আর প্রথম আলো নিয়ে। ঈদের দীর্ঘ ছুটির পর ২৬ মার্চ প্রথম আলোর হেডলাইনগুলো দেখতে দেখতে একটি খবরে চোখ আটকে গেল। শেষ পাতায় প্রকাশিত খবরটি হলো ‘রাজশাহী মেডিকেল: আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা ৩৩ শিশুর মৃত্যু ১১ দিনে’। মহান স্বাধীনতা দিবসের সকালটা একাধিক শোকাতুর খবর নিয়ে শুরু হলো। এর একটি পদ্মায় বাস পড়ে অনেক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু।

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লিখতে বসেছি। আমার লেখার টাইটেল, ‘আইসিইউ নিয়ে ভুল ধারণা’। চিকিৎসাব্যবস্থার একটি অতি প্রয়োজনীয় বিভাগ আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট, বাংলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র। এটি হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদ।

উন্নত বিশ্বে এই আইসিইউর প্রচলন অনেক আগে হলেও বাংলাদেশে এর যাত্রা শুরু আশির দশকে। তখন শুধু সরকারি বড় হাসপাতালগুলো এবং পিজি হাসপাতাল ও বারডেমে আইসিইউর প্রচলন শুরু হলেও গর্বের বিষয়, এখন ঢাকাসহ সারা দেশে অগণিত আইসিইউ চালু হয়েছে, যদিও সব আইসিইউ পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত নয়।

আরও পড়ুন

আইসিইউ বিষয়ে বলতে গিয়ে এ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পর্কে সংক্ষেপে দু-একটা তথ্য উপস্থাপন করতে চাই। ১৮ কোটি মানুষের এ দেশে সরকারের একার পক্ষে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের জন্ম।

শুনলে অবাক হবেন, বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে থাকে। বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগ—উভয় ক্ষেত্রেই বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের অংশীদারত্ব বেশি, অর্থাৎ হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা, আইসিইউ ও রোগনির্ণয় কেন্দ্র—সব ক্ষেত্রেই। তবে এ ক্ষেত্রে তারকা মানের হাসপাতাল যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা মানহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। এসব নিম্নমানের সেন্টারের নেতিবাচক খবর প্রচারিত হলে ঢালাওভাবে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব পড়ে। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হন। তাই রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ, আর একটিও মানহীন, মেশিন ও জনবলহীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেন অনুমোদন না দেওয়া হয়।

এবার আসা যাক মূল আলোচনায়। একটা সময় ছিল ছোট ছোট অপারেশনেও রোগীর মৃত্যুর খবর শোনা যেত। চিকিৎসকদের কিছুই করার থাকত না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষে সেই দিন বদলেছে। আইসিইউর অপরিহার্য মেশিনটির নাম হচ্ছে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্র। এটিকে ঘিরেই মিথ্যা, বানোয়াট, ভুল, বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্যের ছড়াছড়ি।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে কোনো রোগীকে যখন জীবন বাঁচাতে ভেন্টিলেটর মেশিনে দেওয়া হয়, তখনই স্বজনেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেতিবাচক মন্তব্য করা শুরু করেন। সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চশিক্ষিত যেকোনো শ্রেণি-পেশার বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, ভেন্টিলেটরে দেওয়া মানে রোগী মারা গেছে।

গুরুতর অসুস্থ রোগী (শিশু থেকে বৃদ্ধ) যখন প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের চাহিদা নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে পূরণ করতে পারে না, তখনই এই যন্ত্র সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ হিসেবে জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেকাংশেই মৃত্যুপথযাত্রী রোগীরা এই ভেন্টিলেটরের কল্যাণে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে কোনো রোগীকে যখন জীবন বাঁচাতে ভেন্টিলেটর মেশিনে দেওয়া হয়, তখনই স্বজনেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেতিবাচক মন্তব্য করা শুরু করেন। সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চশিক্ষিত যেকোনো শ্রেণি-পেশার বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, ভেন্টিলেটরে দেওয়া মানে রোগী মারা গেছে।

শুধু তা–ই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ভুঁইফোড় অনিবন্ধিত ভুয়া অনলাইনে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে রোগী মারা গেছে, কিন্তু বিল বাড়াতে তিন দিন ধরে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে চিকিৎসাসেবা নিয়ে এমন কুৎসা রটানোর কোনো সুযোগ নেই।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে, মারা যাওয়ার দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে শরীর শক্ত হতে থাকে, যাকে মেডিকেল পরিভাষায় রিগর মর্টিস বলা হয়। তখন বুকের পাঁজরের পেশি শক্ত হতে থাকে, ফলে ভেন্টিলেটর মেশিন চাইলেও কাজ করতে পারবে না এবং মেশিনের তীব্র বিরামহীন অ্যালার্মে চারদিক প্রকম্পিত হতে থাকবে। মৃত্যু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস, নাড়ি ও রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে দুই ঘণ্টা পর থেকে শুরু হয় পচন (পিউট্রিফ্যাকশন)। পচনের প্রথম লক্ষণ, পেটের ডানে নিচের দিকে সবুজাভ দাগ, পরে দুর্গন্ধ, ফোলা এবং স্কিন পিলিং হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন নেতিবাচক ধারণা? কারণ, প্রথমত পকেটের টাকা দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়, চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো বাজেট থাকে না, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও বাংলাদেশে একেবারেই নেই। দ্বিতীয়ত, কোনো কোনো রোগীর স্বজনেরা হাসপাতালে এসে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চিকিৎসাকাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করেন এবং কুৎসা রটাতে থাকেন। তৃতীয়ত, রোগীর চিকিৎসাপদ্ধতির যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের অভাব। এ ছাড়া পাড়া-মহল্লায় ভাড়া করা বাড়িতে ঘুপচির মতো জায়গায় নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও অপেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে ক্লিনিক পরিচালনা। এসব কারণেও এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে।

অথচ বাংলাদেশে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনে সর্বোচ্চ ডিগ্রি ডক্টর অব মেডিসিন (এমডি) প্রদান করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে অনেক পারদর্শী চিকিৎসক আইসিইউতে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করে জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের বাঁচিয়ে তুলছেন।

তবু সাধারণ থেকে উচ্চশিক্ষিত মানুষের আইসিইউ সম্পর্কে ভুল ও নেতিবাচক মন্তব্য কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতের অগ্রযাত্রাকে দারুণভাবে ব্যাহত করছে। তাই প্রয়োজন ইতিবাচক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন। তাহলে দেশ ছেড়ে চিকিৎসার জন্য মানুষ অহরহ বাইরে যাবে না। দেশেই মিলবে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা।

  • ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা; ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

    মতামত লেখকের নিজস্ব