২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য শিক্ষা আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিল। গত এক যুগে শিক্ষা আইনের একাধিক খসড়া করা হলেও কোনোটাই চূড়ান্ত করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। কোচিং, প্রাইভেট টিউশনি ও নোট-গাইড বইয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় এর মূল কারণ।

গত এক যুগে দুই দফা খসড়া চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আইনের একটি খসড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু তাতে ‘ছায়া শিক্ষার’ নামে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনির বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া তাতে সহায়ক বা অনুশীলন বই প্রকাশেরও সুযোগ রাখা হয়েছিল। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলে খসড়াটি পর্যালোচনার জন্য ফেরত আনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে খসড়াটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়। সেখানে আবার কোচিং, প্রাইভেট ও নোট-গাইড, অনুশীলন বা সহায়ক বই নিষিদ্ধের বিধান রাখা হয়েছিল। (প্রথম আলো, ১৭ অক্টোবর ২০২১)

প্রস্তাবিত আইনে নিবন্ধন নিয়ে কোচিং চালানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউশনির মাধ্যমে পাঠদানের জন্য কোচিং সেন্টার পরিচালনা করা বা কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করা নিষিদ্ধ গণ্য হবে না। তবে কোচিং সেন্টারে কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাতে পারবেন না, প্রাইভেটও পড়াতে পারবেন না। এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইনে নোট-গাইড বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত নিষিদ্ধ রাখা হলেও সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সেসবের সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো সহায়ক বই কারা তৈরি করবে? নোট–গাইড বই যাঁরা লেখেন, যাঁরা এ থেকে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করেন, তাঁরাই কি এসব সহায়ক বই লিখবেন? কয়েক দশকে শিক্ষাকে পুঁজি করে একটা বড় সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। শিক্ষা আইনে শিক্ষা, শিক্ষার্থী, শিক্ষককে বাঁচানোর বদলে সেই গোষ্ঠীরই স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে, তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ছিলেন অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান। সম্প্রতি রাজধানীতে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের বিষয়ে নাগরিক সমাজের অবস্থানপত্র তুলে ধরতে গিয়ে ১২ বছরেও শিক্ষা আইন পাস না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, শিক্ষা আইন না হওয়ায় শিক্ষানীতির মৌলিক অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। কোচিং, প্রাইভেট, নোট-গাইড বই সম্পর্কে তাঁদের পরিষ্কার অবস্থান হচ্ছে, ‘এটি ক্ষতি করছে। বলেছি, মোটেও কোচিং চলবে না। আমরা চাই শিক্ষার মানে বুঝতে হবে, চিন্তাভাবনা করতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে। কোচিং যদি থাকে, সেটি করার সুযোগ নেই। যদি নোটবুক থাকে, তাহলে সেটি করার সুযোগ নেই।’ (প্রথম আলো, ১ আগস্ট ২০২২)

কোচিং, প্রাইভেট, নোট–গাইড বইকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ফলে ঘরের মধ্যে ঘর তৈরির মতো শ্রেণিকক্ষের বিকল্প একটা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। মূলধারার শিক্ষায় ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে যাওয়ার বড় কারণও এটি। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাজারীকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের একটা অংশ এখন আর শ্রেণিকক্ষে পড়ান না কিংবা নামমাত্র পড়ান। শিক্ষক উপাধিটা ব্যবহার করেন কোচিং কিংবা প্রাইভেটে শিক্ষার্থী ধরার মাধ্যম হিসেবে। বিশেষ করে নবম-দশম এবং একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ওপর রীতিমতো নম্বর কম দেওয়ার মতো চাপ সৃষ্টি করে অনেক শিক্ষক তাঁদের কাছে পড়তে বাধ্য করেন। বিজ্ঞান বিভাগের একেকজন শিক্ষার্থীকে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষকের কাছে পড়তে হয়। কিংবা দু-তিনটি কোচিংয়ে পড়তে হয়। যে শিক্ষক তাঁর শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো পড়াচ্ছেন না, তিনিই আবার কোচিং-প্রাইভেটে পড়াচ্ছেন—এর থেকে বড় অনৈতিক বিষয় আর কী হতে পারে। অথচ আইন করেই সেটার বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

গত জুন মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছিলেন, ‘কোচিং বন্ধ হবে না। তবে কোচিংকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। কোচিংয়ের অনৈতিক দিকগুলো বন্ধ করা দরকার।’ কোচিংকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য কী করতে হবে? নিবন্ধন নিতে হবে আর নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন না কোনো শিক্ষক! প্রশ্ন হলো কোন শিক্ষক কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাচ্ছেন, পড়াচ্ছেন, তা দেখভাল করবে কে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় কি এ জন্য পুলিশ নিয়োগ করবে? নাকি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে অভিযান পরিচালনা করবেন?

প্রস্তাবিত আইনে নোট-গাইড বই প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাতে জেল–জরিমানারও বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু সরকারের অনুমতি নিয়ে সহায়ক বই প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো সহায়ক বই কারা তৈরি করবে? নোট–গাইড বই যাঁরা লেখেন, যাঁরা এ থেকে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করেন, তাঁরাই কি এসব সহায়ক বই লিখবেন? কয়েক দশকে শিক্ষাকে পুঁজি করে একটা বড় সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। শিক্ষা আইনে শিক্ষা, শিক্ষার্থী, শিক্ষককে বাঁচানোর বদলে সেই গোষ্ঠীরই স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে, তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন