ইরান কি মাথা নোয়াবে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে তেহরানের এক চত্বরে শোক প্রকাশে জড়ো হয়েছেন মানুষ।ছবি: এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার যখন ঘোষণা করলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বড়সড় হামলা চালিয়েছে, ঠিক সেই সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের ‘ডজনখানেক সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ আঘাতের মুখে পড়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানে এই অভিযানের উদ্দেশ্য হলো ইরানের সামরিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করা, তাদের পরমাণু কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সরকার বদলে দেওয়া।

ইতিমধ্যেই তেহরানে একের পর এক বিস্ফোরণের খবর মিলেছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের বাস বলে মনে করা হয়, সেখান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে।

বিশ্ব যখন ঘুম ভেঙে এই খবরে চোখ রাখছে, তখন নানা প্রচারমাধ্যম নিজ নিজ মতো করে ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে। (এই লেখাটি যখন প্রকাশিত হয়, তখনো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার সংবাদ ইরান সরকারের দিক থেকে নিশ্চিত করা হয়নি)

তবে ৯ কোটির বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে রেখে চারটি কঠোর বাস্তবতা এখন সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

নির্মম আগ্রাসন

প্রথম বাস্তবতা হলো—মার্কিন সামরিক শক্তির উন্মুক্ত প্রদর্শন। আর এই শক্তি প্রদর্শনের নেতৃত্বে আছেন এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি দেশীয় (এপস্টিন ফাইল কেলেঙ্কারি), আঞ্চলিক (ভেনেজুয়েলা, কিউবা ও গ্রিনল্যান্ডে সামরিক হানা দেওয়া অথবা অভিযাত্রিক কূটনীতি পরিচালনা করা) এবং বৈশ্বিক (চীন ও রাশিয়া-সংক্রান্ত টানাপোড়েন) ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

এখন সবাই বলছেন, ইরানের সঙ্গে ভুয়া আলোচনার নাটক সাজিয়ে ট্রাম্প আসলে সময় ক্ষেপণ করছিলেন। তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করে কার্যকর আঘাত হানার সুযোগ তৈরি করা।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এই যুদ্ধকে মোটেও পছন্দ করছে না। অথচ করপোরেট গণমাধ্যম, বিশেষ করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এখন এই যুদ্ধকে ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’ হিসেবে তুলে ধরতে ব্যস্ত। কিন্তু এই ব্যাখ্যায় সবাইকে বিশ্বাস করানো সহজ হবে না।

আরও পড়ুন

ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট

দ্বিতীয় বাস্তবতা হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নিজেই। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির শুরুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল। দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক সংকটই ছিল সেই বিক্ষোভের মূল কারণ।

এই সংকটের পেছনে দুটি সমান্তরাল কারণ কাজ করেছে। এক—রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও অদক্ষতা, এবং দুই—যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞা।

কিন্তু এই রাজনৈতিক কৌশল আর ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে আটকে রয়েছে ৯ কোটির বেশি সাধারণ মানুষ। তারা যেন নিজেদের দেশেই বন্দী। তাদের জীবনই এখন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে।

গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে গৃহযুদ্ধের ভয় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জাতিগত বিভাজন আরও প্রকট হয়ে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতাই এখন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য—সবটাই এখন এক ভয়াবহ ও অযৌক্তিক আগ্রাসনের মঞ্চে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় কাঁপছে।

এই যুদ্ধ যদি সত্যিই ইরানের ‘সরকার বদলের’ লক্ষ্যে হয়, তবে তার অভিঘাত কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার ভার বহন করবে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। আর সেটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

আরও পড়ুন

ইসরায়েল: এক নির্মম হত্যাযন্ত্র

তৃতীয় বাস্তবতার নাম খোদ ইসরায়েল। অঞ্চলের সবচেয়ে মারাত্মক সামরিক শক্তিতে সমৃদ্ধ এই রাষ্ট্র।

এটি সদ্যই ফিলিস্তিনে লাখো মানুষের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানের ওপরও সামরিক হামলা চালিয়েছে তারা।

এই নতুন যুদ্ধপর্বে ইসরায়েলের একাধিক লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, ফিলিস্তিনে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যে বিশ্বব্যাপী নিন্দা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে তারা নজর ঘোরাতে চায়।

দ্বিতীয়ত, তারা নিজেদের ‘গ্যারিসন রাষ্ট্র’ আরও বিস্তৃত করতে চায়। পুরো ফিলিস্তিন, লেবাননের কিছু অংশ, সিরিয়ার কিছু অঞ্চল, এমনকি তারও বাইরে পর্যন্ত গ্রাস করার পরিকল্পনা আছে তাদের।

ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ইসরায়েলের এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই সবুজ সংকেত দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি মধ্যপ্রাচ্য দখলের মৌখিক অনুমোদন দিয়েই দিয়েছেন।

ইসরায়েলের হামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো—ইরানকে জাতিগত ভিত্তিতে ভাগ করে ফেলা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক ছোট ছোট অঞ্চল বা এনক্লেভে দেশটিকে ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায়।

তবে ইসরায়েল কেবল ইরানকে ভেঙেই থামবে না। তুরস্ক ও পাকিস্তানও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে।

আরও পড়ুন

পাহলভিদের স্বপ্ন ও বিভ্রম

চতুর্থ বাস্তবতা হলো পাহলভি রাজবংশের অবশিষ্ট অংশের একধরনের বিভ্রান্ত ফ্যাসিবাদ। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ইরানিরা যাদের দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনকে উৎখাত করেছিল, সেই পাহলভি বংশের নেতা রেজা পাহলভি ক্ষমতা ফের দখলের স্বপ্ন দেখছেন।

পাহলভিদের ইরানের ভেতরে তেমন কোনো জনপ্রিয় ভিত্তি নেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদী গুন্ডামি আর ইসরায়েলের রক্তাক্ত যুদ্ধনীতির সঙ্গে তাদের সখ্য—এটিই এই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পরিচয়চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই শক্তিগুলোই এখন সংবাদমাধ্যম দখল করবে এবং বিশ্বকে বোঝাতে চাইবে—তাদের লড়াই ন্যায়ের পক্ষে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ ইরানিদের শাসকদের হাত থেকে ‘মুক্ত’ করার জন্য নয়—বরং তা তাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ করার কৌশল। এই প্রক্রিয়ায় পাহলভিরা দালালের ভূমিকায় নেমেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে টানা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মানুষ নন। কিন্তু ইসরায়েলের লক্ষ্য অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি। তারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর স্বপ্ন পূরণে ধাপে ধাপে এগোতে প্রস্তুত।

ইরানিদের দাসত্বে বাঁধার পরিকল্পনা?

এখন সংবাদমাধ্যমগুলো নির্লজ্জভাবে মিথ্যা প্রচার করতে থাকবে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও বিবিসি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের মুখপাত্র হয়ে উঠবে। ইন্টারনেটের উন্মুক্ত জগৎ ভরে যাবে পাহলভি-সমর্থক বট ও ট্রলের প্রচারে।

এখন বিশ্বের নজর থাকা উচিত সেই ৯ কোটির বেশি মানুষের দিকে, যারা এক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতার উত্তরাধিকারী এবং যারা আজ এক নির্মম নিয়তির হাতে জিম্মি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ ইরানিদের শাসকদের হাত থেকে ‘মুক্ত’ করার জন্য নয়—বরং তা তাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ করার কৌশল। এই প্রক্রিয়ায় পাহলভিরা দালালের ভূমিকায় নেমেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে টানা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মানুষ নন। কিন্তু ইসরায়েলের লক্ষ্য অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি। তারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর স্বপ্ন পূরণে ধাপে ধাপে এগোতে প্রস্তুত।

  • হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক।

মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত