২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত অনেক শিক্ষার্থী রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। এ খবর শুনে আমি এবং আমার তিন সহকর্মী সেখানে ছুটে যাই। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢুকতেই জরুরি বিভাগের সামনে দেখি আবু সাঈদের মরদেহ একটি স্ট্রেচারে। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের অনার্স ফাইনাল বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায়।
মরদেহের পাশে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহাজারি করছিলেন, সবাই অশ্রুসিক্ত। আমাদের জড়িয়ে ধরেও অনেকে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। আমাদেরও চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। শিক্ষার্থীরা স্ট্রেচারে মরদেহ নিয়ে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা করেন।
মেডিকেল কলেজে ভর্তি ছিলেন আরও প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী। আমরা সেই শিক্ষার্থীদেরও খোঁজ নিতে থাকি। এমন সময়ে প্রথম আলোর ঢাকার প্রতিবেদক জহির রায়হান সেখানে চলে আসেন। জানতে পারি, জহির রায়হান লালমনিরহাটে একটি বিশেষ প্রতিবেদন করার জন্য গিয়েছিলেন। প্রথম আলোর প্রধান কার্যালয় থেকে তাঁকে আবু সাঈদের ওপর খবর সংগ্রহ করার জন্য আসতে বলা হয়েছে।
হাসপাতাল থেকে চলে যাওয়ার আগেই দেখলাম, পুলিশ আবু সাঈদের মরদেহ পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছে হাসপাতালে। শিক্ষক বলতে তখন আমি একাই ছিলাম। আবু সাঈদের মরদেহ তাঁদের বাড়ি থেকে কেউ গ্রহণ না করা পর্যন্ত আমি তো যেতে পারি না। আমি অপেক্ষা করতে থাকি, কখন আসেন আবু সাঈদের বাবা।
রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে তাঁর ভাই রমজান, ভগ্নিপতিসহ কয়েকজন এলেন শেষ বিকেলে। ততক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকও আসেন। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার-পাঁচজন শিক্ষকও এসেছিলেন দেখতে।
পুলিশের গড়িমসিতে তথা প্রশাসনের নানান রকম কূটকৌশলে মরদেহ পাঠাতে রাত ১২টা বাজিয়ে ফেলে। মরদেহবাহী গাড়ির সঙ্গে প্রশাসনের প্রায় ২০টি গাড়ি ছিল।
মরদেহের সঙ্গে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী কেউ ছিলেন না। তখন আমার মনে হয়েছিল, আবু সাঈদের মা-বাবা কত স্বপ্ন নিয়ে ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন, অথচ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জীবিত ফেরত পাঠাতে পারেনি। এই মরদেহের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ যাবেন না, এটি হতে পারে না। তখন আমি মরদেহের সঙ্গে রওনা দিই। সঙ্গে ছিলেন আবু সাঈদের কয়েকজন আত্মীয় এবং আন্দোলনে থাকা ৮-১০ জন শিক্ষার্থী।
আবু সাঈদের মরদেহ নিয়ে যখন আমরা তাঁর বাড়িতে পৌঁছাই, তখন রাত দুইটা বাজে। তাঁর মায়ের আহাজারি, বাবার পাথরদৃষ্টি, আমার হাত ধরে তাঁর ছোট বোনের চিৎকার—‘হামার চাকরি না নাগিল হয় স্যার, পুলিশোক কইনেন হয়, হামার ভাইটাক গুলি না করিল হয়। হামার ভাইটা বাঁচি থাকিল হয়। বিসিএস চাকরি কইরবার চাইছিল হামার ভাইটা।’
অনেকেই আমাকে সতর্ক করেছিলেন, সঙ্গে গেলে খারাপ ঘটনা ঘটতে পারে। কেউ কেউ আশঙ্কা করেন, আমাকে সরকারবিরোধী বিভিন্ন ট্যাগ দিতে পারে। আমি কেবল দেখেছি, আমার ছাত্র মারা গেছে। আমি বলেছি, ‘ছাত্র মারা গেলে শিক্ষকের আর শিক্ষকতা বলে কিছুই থাকে না।’
আবু সাঈদের মরদেহ নিয়ে যখন আমরা তাঁর বাড়িতে পৌঁছাই, তখন রাত দুইটা বাজে। তাঁর মায়ের আহাজারি, বাবার পাথরদৃষ্টি, আমার হাত ধরে তাঁর ছোট বোনের চিৎকার—‘হামার চাকরি না নাগিল হয় স্যার, পুলিশোক কইনেন হয়, হামার ভাইটাক গুলি না করিল হয়। হামার ভাইটা বাঁচি থাকিল হয়। বিসিএস চাকরি কইরবার চাইছিল হামার ভাইটা।’
আবু সাঈদের মরদেহ গোসল করিয়ে যখন রংপুরে বাসায় ফিরে আসি, দেখলাম মানুষ ফজরের নামাজ শেষে ফিরছেন।
আবু সাঈদের মারা যাওয়ার খবর সংগ্রহে প্রথম আলো যে তৎপরতা দেখিয়েছে, তা-ও উল্লেখ করার মতো। পত্রিকাটির ফটো সাংবাদিক মঈনুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের জীবন বাঁচাতে মেয়েদের হলের পেছনে একটি জঙ্গলে লুকিয়েছিলেন। বাইরের পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ যে তিনি আর সেখান থেকে বের হতে পারছিলেন না। উপাচার্যের বাংলোতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি ছিল ভীষণ থমথমে।
প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আরিফুল হক রুজু ভাই বারবার ফোন করছিলেন আর বলছিলেন, ‘মঈনুল হার্টের রোগী। ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়েছে ওর। ওকে হলের পেছন থেকে বের করার ব্যবস্থা নেন।’ আমি ছাত্রী হলের প্রাধ্যক্ষ, সহকারী প্রাধ্যক্ষকে ফোন করলে তাঁরা জানান, যেখানে লুকিয়ে আছেন, সেখানেই থাকতে বলুন। বের হলে বিপদ হবে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে জানাতে চাইলেন।
রাত ১২টায় যখন মরদেহ নিয়ে রওনা দিয়েছিলাম, তখন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক জহির রায়হান এবং বিক্রয় প্রতিনিধি ইমরান মরদেহবাহী গাড়ির পেছনে বাইক চালিয়ে তাঁরাও পীরগঞ্জের জাফরগঞ্জে বাবনপুর গ্রামে গেছেন। সেখানে প্রথম আলোর আরও একজন সাংবাদিক আলতাফ হোসেন দুলালের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি সারা রাত সেখানে ছিলেন।
পরদিন প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় আবু সাঈদের সাহসিকতার সঙ্গে দুই হাত প্রশস্ত করে বুক পেতে দেওয়ার ছবিসহ প্রধান শিরোনাম করা হয়। সেখানে মোট চারটি ছবি ছেপেছিল প্রথম আলো। ডান দিকের কলামে আবু সাঈদের ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাস উদ্ধৃত করে একটি খবর ছাপানো হয়েছে। রাতে ফেরার সময় আবু সাঈদকে নিয়ে দেওয়া আমার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস উদ্ধৃত করে সোহরাব হাসান পরদিনই প্রথম আলোয় একটি কলাম লেখেন।
আবু সাঈদের জীবন বিসর্জন ইতিহাসে বাংলাদেশের বাঁক পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যে বৈষম্যহীন জনবান্ধব দেশ গড়ার জন্য জীবন দিয়েছেন সেই পথে আমরা কতটুকু এগোতে পারলাম সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা আশা করব, ব্যক্তি, দল, অঞ্চল ভুলে তারা বৈষম্যহীন জনবান্ধব সরকার হয়ে উঠবে।
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
মতামত লেখকের নিজস্ব
