জাতিরাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে একটি দেশের পরিচিতি নির্মাণের রাজনীতি আধুনিক সামাজিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পরিচিতি নির্মাণের রাজনীতির সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ধর্মীয় পরিচিতি ও আবহমানকাল ধরে লালিত জাতীয়তাবোধের ধারণাও জরুরি।
একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ গড়ে ওঠে সেই দেশের অন্যান্য নাগরিকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও সম্পর্কিত থাকার মাধ্যমে। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণায় এই যুক্ত থাকার প্রক্রিয়াটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যখন একটি দেশের জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে কোনো এক কাল্পনিক ও একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত হিসেবে দেখে এবং গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করে, তখনই তাদের মধ্যে সেই সামষ্টিক বোধ তৈরি হয়, যা জাতীয়তাবোধের মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
এই ধারণা অনেকাংশেই খুব ব্যক্তিক পরিসরে শুরু হলেও এটি ধীরে ধীরে একটি সামষ্টিক যূথবদ্ধতার দিকে ধাবিত হয়। ঠিক এ কারণে বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট এন্ডারসন তাঁর ‘ইমাজিন্ড কমিউনিটি’র ধারণায় জাতিকে একটি কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যেখানে নাগরিকেরা একে অপরের সঙ্গে আধুনিক সময়ের যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রিন্ট ক্যাপিটালিজমের নানাবিধ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একে অপরের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত মনে করেন, যা একধরনের সামাজিক নির্মাণও বটে।
এই যূথবদ্ধতার নির্মাণই আধুনিক সময়ের নাগরিকেরা দেশপ্রেমের আকাঙ্ক্ষার উদ্ভব ঘটায়। যদিও এমন দেশপ্রেমের ধারণা বর্তমানে জাতিরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হলেও নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসা অনেকটা পুরোনো, যা মূলত একটি স্থানিক ও গোষ্ঠীগত বিষয়, যে বিষয়গুলো জাতিরাষ্ট্রের ধারণায় আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ে। দেশকে ভালোবাসার এমন ধারণায় নাগরিকদের একটি সুতায় গেঁথে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় নানা প্রতীকী ব্যবস্থার।
দেশপ্রেমও যে একটা শেখার বিষয়, সেটি হয়তো অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না। যে কারণে আমরা অনেককেই দেখি জাতীয় সংগীত থেকে শুরু করে জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করতে।
দেশ কিংবা ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসা অনেকাংশেই একটি সমন্বিত প্রতীকী ব্যবস্থার নানা মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই প্রতীকী ব্যবস্থাগুলো মূলত একটি দেশ কিংবা ভূখণ্ডের ঐতিহ্যের সঙ্গে যেমন যুক্ত, ঠিক তেমনি একটি দেশের জাতীয় পরিচিতির সঙ্গে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আবেগের বিষয়গুলোও যুক্ত থাকে। যেমন বলা যেতে পারে, একটি দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম থেকে সেই দেশের উদ্ভব বা নতুন একটি দেশে রূপান্তরের বিষয়গুলো অনেক বেশি আবেগতাড়িত ও গৌরবের বিষয় হিসেবে একটি দেশের পরিচিতি নির্মাণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আমরা যদি এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি নির্মাণের দিকে তাকাই, তাহলে দেখি যে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচিতির নির্মাণের পেছনে যতগুলো ঐতিহাসিক ও সামষ্টিক স্মৃতি রয়েছে, তার সবই বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিকদের মধ্যে প্রোথিত ও প্রকাশিত। যেমন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের প্রাথমিক পরিচিতি নির্মাণের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক প্রপঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশেষ করে স্বাধীনতার ইতিহাস একটি জাতির জন্য যেমন একটি গৌরবের বিষয়, ঠিক তেমনি এই ইতিহাস তার জাতিসত্তার পরিচিতি নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত আছে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধে সহায়তা করা রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামক গোষ্ঠী, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়, যেখানে নিজ দেশেরই একটি গোষ্ঠী স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। বিগত সময়ে তাদের একাংশের বিচার হলেও এখন আবার ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমরা দেখতে পাই।
আমাদের জাতীয় গৌরবের সঙ্গে যুক্ত একাত্তরে লাখো শহীদের আত্মত্যাগ। এর মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা আমাদের ইতিহাসের দুঃখভারাক্রান্ত একটি সামষ্টিক স্মৃতি। স্বাধীনতার প্রাক্কালে, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, আমাদের সূর্যসন্তানদের সুকৌশলে নিধনের মাধ্যমে এই জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। এর ভার আমাদের আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এমন দুঃখের স্মৃতির সামষ্টিক ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও জাতীয় পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের দেশকে ভালোবাসার একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়।
আমাদের এই জাতিগত ইতিহাস এসব সামষ্টিক ঐতিহাসিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ধারণা নিয়ে আমাদের মানসপটে আবির্ভূত হয়। যে সামষ্টিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশপ্রেমের ভিত্তি রচিত হয়। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি ডি. স্মিথের ‘মিথস অ্যান্ড মেমোরিজ অব দ্য নেশন’ বইয়ের ধারণা খুবই প্রাসঙ্গিক, যেখানে তিনি বলেন একটি জাতির ভিত্তি গড়ে ওঠে তার ঐতিহাসিক মিথ, সূর্যসন্তানদের বীরত্বগাথা ও সামষ্টিক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ধারণার মধ্য দিয়ে।
এর সঙ্গে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে একটি দেশের জাতীয় পতাকা, আচার-প্রথা যেমন জাতীয় সংগীতসহ জাতীয় বীরদের বীরত্বগাথার প্রতীকী উদ্যাপন ও সম্মান প্রদর্শনের প্রক্রিয়া। এসব মিথ, স্মৃতি ও প্রতীক মানুষের মধ্যে একটি সমষ্টিগত অন্তর্ভুক্তির অনুভূতির বোধ সৃষ্টি করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। ফলে জাতীয় পরিচয় শুধু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা মানুষের আবেগ ও কল্পনার আরও গভীরে প্রোথিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী শক্তি অর্জন করে।
এই দেশপ্রেমের নানা প্রতীকীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে জাতীয় সংগীতের সম্মানের মধ্য দিয়ে, কেননা জাতীয় অধিকাংশ কার্যক্রম শুরু হয় জাতীয় পতাকার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান এবং দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে। আবার আমাদের দেশের স্কুলের প্রতিটি দিন শুরু হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে, যা আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মধ্য দিয়ে শিশুকাল থেকেই দেশের প্রতি ভালোবাসা যেন প্রতিটি শিশু শিখতে পারে।
দেশপ্রেমও যে একটা শেখার বিষয়, সেটি হয়তো অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না। যে কারণে আমরা অনেককেই দেখি জাতীয় সংগীত থেকে শুরু করে জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করতে। অনেকে আবার সেই সম্মান প্রদর্শনে তেমন কোনো ইতিবাচক তাগিদও অনুভব করেন না, যা বিভিন্ন সময় আমাদের জনপরিসরে দৃশ্যমান। এ হেন চর্চা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য একটি লজ্জার বিষয়। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এটি যে একটি লজ্জার বিষয়, সেটিও তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন না।
দেশকে ভালোবাসা চর্চার বিষয়, নিয়মিত চর্চার মাধ্যমেই তা পরিপক্বতা পায়।
বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
