অর্থনীতির পাঁচ ঝুঁকি মোকাবিলা করব কীভাবে

গেল চুয়ান্ন বছরে আকার, আয়তন ও মাত্রিকতায় অনেক এগিয়েছে আমাদের অর্থনীতি। বেড়েছে জনসংখ্যা, এমনকি বেড়েছে সীমিত ভৌগোলিক সীমায় সুশাসনের অভাব আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সংকট। তার সঙ্গে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ আর ন্যূনতম চিকিৎসার অভাবে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস।

নতুন করে আবার বড় বড় সমস্যারও মুখোমুখি এখন দেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও বিনিয়োগে কড়াকড়ির পাশাপাশি দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি আর দেশি-বিদেশি ঋণের চাপ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঝুঁকি দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং নতুন সরকারের জন্য নিয়ে আসবে নতুন চ্যালেঞ্জ। তাই সময়মতো ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে সমস্যা আরও বাড়বে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে চলতি বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রথম ও দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ।

এসব ঝুঁকি শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগপ্রবাহে, এমনকি বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিদেশি সহায়তার ওপরও। শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন বাধা সৃষ্টি করছে, যা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ কঠিন করে তুলেছে। উদীয়মান রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনে বিশেষভাবে ঝুঁকির সম্মুখীন।

আমাদের শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার দিয়ে হবে না, বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশলও নিতে হবে। সতর্ক না হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে

রাজনীতি ও অর্থনীতির টানাপোড়েন এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। আমাদের সামনে পাঁচটি বড় ঝুঁকি দাঁড়িয়ে আছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র-চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনের মতো ঘটনাগুলো আমাদের আমদানি-রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি, প্রবাসী আয় ও বিনিয়োগপ্রবাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে, যা বিকাশমান দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই আমাদের শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার দিয়ে হবে না, বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশলও নিতে হবে। সতর্ক না হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে।

আমাদের দেশের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে ঝুঁকিগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নেওয়া। সুশাসন জোরদার, অপরাধ দমন, প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে আসা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

ডব্লিউইএফের তথ্যমতে, দেশের অর্থনীতিতে তৃতীয় ঝুঁকি হিসেবে রয়েছে মূল্যস্ফীতি। টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে,
প্রকৃত আয় কমেছে আর ব্যবসা ও শিল্প খাতে উৎপাদন খরচও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও সম্পূর্ণ স্বস্তির দূরত্ব এখনো অনেক। সুদের হার বাড়ানোর পরও বাজারে পণ্যমূল্যের ওপর তেমন প্রভাব পড়ছে না।

চতুর্থ ঝুঁকি অর্থনৈতিক শ্লথগতি। বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ মিলিয়ে প্রবৃদ্ধি কমার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসও এই আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয়। মন্দ ঋণ, সুদের হার বৃদ্ধি, শ্রমিক অসন্তোষ, নতুন করে ঋণের অভাব আর দক্ষ শ্রমিকের স্বল্পতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীর করে দিচ্ছে।

পঞ্চম ও বড় ঝুঁকি হলো ঋণের বোঝা। সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক সব পর্যায়েই ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। জাতীয় বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের ব্যয় হচ্ছে, যা উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত করে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে সরকারি চাকুরেদের মোটা অঙ্কের বেতন বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সামগ্রিক বেতন ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ।

অনেকের ধারণা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অন্য অনেক তুলনীয় দেশের মতো ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ আটকে পড়তে পারে। আমরা জানি, এই ঝুঁকিগুলো আলাদা নয়, বরং পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা দুর্বল করছে। অপরাধ ও অবৈধ অর্থনীতি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে,
ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ বাজার সংকুচিত করে আর মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।

ক্রমবর্ধমান কালো বা ধূসর অর্থনীতি অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সহায়তা করে না বা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করে। সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবেও কাজ করে।

আশু নির্বাচন ও নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সমাজ এমনকি সাধারণ মানুষের মনে বেশ কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি, শিল্পাঞ্চলে শান্তি ও প্রগতির পরিবেশ, আর্থিক বাজারে তারল্যের জোগান, কর্মবাজারে নতুন করে প্রবেশ করা তরুণদের চাকরির সংস্থান, বিশ্বায়নের এই যুগে পারস্পরিক সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো মোকাবিলায় ভালো বোঝাপড়া এবং নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতা এড়িয়ে একটি বৃহত্তর সমঝোতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর।

  • মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব