জেন-জিদের কাছে মিথ্যুক পরিচয় ঘুচবে তো!

বাংলাদেশে এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের যথাযথ পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশ্লেষণের কাঠামোও দুর্বল। তাই আমরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ব্যক্তি গুণাবলি এবং তাঁদের শাসনকাজের মূল্যায়নকে গুলিয়ে ফেলি। এই গুলিয়ে ফেলা বাংলাদেশে অবিরাম উদ্দেশ্যহীন বিতর্ক-বাহাস তৈরি করে। বিভাজন আরও জোরদার হয়।

শাসক ও শাসনের রাজনীতি বিশ্লেষণের পদ্ধতি আসলে আলাদা। একটি দিয়ে ব্যক্তি হিসেবে শাসক বা নেতার মূল্যায়ন করতে হয়। অন্যটি শাসনকালের রাজনৈতিক সাফল্য-ব্যর্থতাকে মূল্যায়ন করতে হয়। দুটি একাকার করে পাঠ করলে ইতিহাস বিকৃত হয়।

২.

একজন মানুষ ভালো হলে তিনি কি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভালো শাসক? আবার একজন শাসক ব্যর্থ হলে তিনি কি ব্যক্তি হিসেবে পুরোপুরিই অশ্রদ্ধেয় হয়ে যান?

অসামান্য ব্যক্তিত্বধারী রাজনীতিকদের অসফলতার ইতিহাসও অনেক। যুক্তরাষ্ট্রের জিমি কার্টার অত্যন্ত সৎ ও মানবিক মানুষ হিসেবে বিশ্বস্বীকৃত; কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনেকটাই দুর্বল। উরুগুয়ের হোসে মুহিকার ব্যক্তিগত জীবনে নৈতিকতার প্রতীক। অথচ তাঁর শাসননীতি নিয়ে বিতর্ক আছে। তানজানিয়ার জুলিয়াস ন্যয়েরে ব্যক্তিগত সততায় প্রশ্নহীন, কিন্তু তাঁর অর্থনৈতিক নীতি দেশকে সংকটে ফেলেছিল। ভারতের লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধেয়, কিন্তু শাসনকাল সংক্ষিপ্ত। মনমোহন সিং ভদ্র ও শালীন মানুষ হিসেবে সমাদৃত, কিন্তু তাঁর সরকারের দুর্বলতা সর্বজনবিদিত।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে ‘পারসন অ্যাডমায়ার্ড, গভর্নমেন্ট ডিবেটেড’ বলে একটি ধারণা আছে। ব্যক্তি ভালো; কিন্তু শাসনকাল বিতর্কমুক্ত নয়, এটিই সারকথা। এই তালিকা দীর্ঘ। উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দুই প্রেসিডে হার্বার্ট হুভার ও জেরাল্ড ফোর্ড। নেলসন ম্যান্ডেলা আইকনিক চরিত্র। শত্রু-মিত্রসহ সবাই তাঁকে শেষ দিন পর্যন্ত ভালোবাসলেও শাসনকালে তিনি জনপ্রত্যাশা পুরোপুরি মেটাতে পারেননি।

তৃতীয় বিশ্বে সৎ ও ভালো মানুষ শাসক তেমন মেলে না কথাটিও অসত্য। সেনেগালের লিওপোল্ড সেদার সাঁগোর, বুরকিনা ফাসোর টমাস সাংকারা, ফিলিপাইনের কোরাজন অ্যাকুইনো, চেক রিপাবলিকের ভাকলাভ হ্যাভেল, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা ভালো মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সম্মান ঠিকই পেয়েছেন; কিন্তু তাই বলে তাঁদের রাষ্ট্রনীতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে যায়নি। সেগুলোর বিশ্লেষণ নিয়ে এখনো বিতর্ক চলমান।

আরও পড়ুন

৩.

ফরাসি দার্শনিক আলব্যের কামু লিখেছিলেন, রাজনীতি আর নৈতিকতা এক নয়। আগেই রাজনৈতিক সাহিত্যের দর্শনগুরু জর্জ অরওয়েল লিখে রেখেছিলেন আরও স্পষ্ট ভাষ্য, ‘রাজনীতির ভাষায় মিথ্যাকে শোনাতে পারে সত্যের মতো, হত্যাকে করে তুলতে পারে পূজনীয়!’

বাংলাদেশের বিশ্লেষকেরা রাজনীতিতাত্ত্বিক মাইকেল ওয়ালজের ‘ডার্টি হ্যান্ডস’ ধারণাটি মনে রাখতে পারেন। ওয়ালজ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘পলিটিক্যাল অ্যাকশন: দ্য প্রবলেম অব ডার্টি হ্যান্ডস’-এ লেখেন, ‘রাজনৈতিকভাবে “সঠিক” কাজ করতে গিয়ে একজন নেতাকে অনেক সময় নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বেলায় হাত সব সময় পরিষ্কার রাখা যায় না, এটিই বাস্তবতা।’

ওয়ালজ বাস্তবতাটি তুলে ধরেছেন মাত্র। রাষ্ট্রনায়কদের অপকর্মের বৈধতা দেননি; বরং বলেছেন, ব্যক্তি শাসক নীতিনৈতিকতাবিবর্জিত হলে ‘ডার্টি হ্যান্ডস’ মহা নোংরা হয়। ব্যক্তিশাসক উচ্চ নৈতিকতাধারী মানুষ হলে হাত অনেকটাই কম নোংরা হয়। সহনীয় বা পরিষ্কার করে নেওয়ার সুযোগ থাকে। পার্থক্য এখানেই।

তরুণের অভিযোগটি আমাকে দীর্ঘ সময় ভাবিয়েছে। মনে পড়েছে কীভাবে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনে হাজার হাজার কোটি টাকা তছরূপ হয়েছে ইতিহাস শেখানো এবং বঙ্গবন্ধু–বন্দনার নামে একদল লুটেরার হাতে। অগণিত, অসংখ্য বানোয়াট, অসত্য, অপাঠ্য ও নিম্নমানের বইপত্র লিখে ও প্রকাশ করে একদল দুর্বৃত্ত কোটিপতি হয়েছে।

৪. 

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যক্তি রাজনীতিকের চরিত্র চিত্রণ ও শাসনকাজ বিশ্লেষণ গুলিয়ে ফেলার সমস্যা আমাদের মতো প্রকট নয়। নাগরিকেরা অন্ধভাবে দল-মতের পূজারি বা বিরোধী নন বলেই সমস্যাটি কম। তাঁদের সমর্থন ও মতাদর্শিক দুর্বলতাও সময়ে সময়ে বদলে যেতে পারে। তাঁরা ইতিহাসকে অত্যন্ত নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে দেখতে চান। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা দেশ চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে ইতিহাস লিখতে ও লেখাতে বসে যাবেন—এসব পছন্দ করেন না। মসনদে বসেই নেতার ভাস্কর্য-ম্যুরাল আর প্রশস্তি-বন্দনার কল্পকাহিনি লেখালেখির দোকান খুলে বসার তীব্র বিরোধিতা করেন, প্রতিবাদ জানান।

লেখালেখির সুবাদে প্রায়ই বিভিন্ন রকম মেসেজ ও ই-মেইল পাই। সম্প্রতি একজন তরুণ এক দীর্ঘ লেখায় জানিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের শিশুকাল থেকেই শুনে এসেছেন, পাঠ করেছেন এবং গভীরভাবে বিশ্বাস করে এসেছেন যে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া ক্ষতি ছাড়া দেশের উপকারে তাঁরা কিছুই করেননি। তাই তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল অনেকটাই এই দুই চরিত্র এবং তাঁদের সমর্থক মানুষদের প্রতি বিরূপ মনোভাব নিয়ে।

আরও পড়ুন

তরুণ আরও জানান, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় স্কুলজীবনের শেষ দিক থেকে সঠিক সত্য জানতে উদ্‌গ্রীব হলেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আগে পর্যন্ত ইতিহাসের সত্যকে খুঁড়ে দেখার চেষ্টাও করেননি। তবে জুলাই বিপ্লব তাঁকে সত্যান্বেষণে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ও তাঁর জানাজায় জনতার বিপুল উপস্থিতি। এরপর খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ও তাঁর জানাজায় দেখা জনসমুদ্র তাঁকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছে। লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা নিজেকে এবং বঙ্গবন্ধুকেই বাংলাদেশের সর্বেসর্বা বন্দনাচরিত্র দেখাতে গিয়ে ১৫টি বছরে জাতির মন ও মননের একটি চিরস্থায়ী ক্ষতি করে গেছেন। সেই ক্ষতির উপশমও সহজ নয়। তবু তিনি এবং তাঁর প্রজন্মের অসংখ্যজন সত্য জানার পথ খুঁজছেন।

জেন-জি তরুণটি সরাসরি ‘মিথ্যুক’ বিশেষণে অভিযুক্ত করেছেন জেনারেশন এক্স বা আমাদের প্রজন্মকে। নিন্দা জানিয়েছেন তাঁদের এবং মিলেনিয়ালদের (জেন–ওয়াই) কাছে মিথ্যা ছড়ানোর। আবার জানতেও চেয়েছিলেন কীভাবে বাংলাদেশের নির্মোহ ইতিহাস পাঠ করবেন।

উত্তরে পরামর্শ দিলাম, ‘ব্যক্তি শাসকের চরিত্র এবং শাসনপদ্ধতিকে আলাদা রেখে পাঠ করবেন। শাসনকাজে দায় একজন ব্যক্তির থাকে না। অসংখ্য জনের দায়িত্ব ও শ্রমবিভাজনের পরিণাম শাসনকাজের সাফল্য–ব্যর্থতা’। ভাবলাম, এ বিষয়ে আলোকপাত হয়তো অন্যদেরও কাজে লাগতে পারে। এই লেখাও সে কারণেই লেখা।

আরও পড়ুন

তরুণের অভিযোগটি আমাকে দীর্ঘ সময় ভাবিয়েছে। মনে পড়েছে কীভাবে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনে হাজার হাজার কোটি টাকা তছরূপ হয়েছে ইতিহাস শেখানো এবং বঙ্গবন্ধু–বন্দনার নামে একদল লুটেরার হাতে। অগণিত, অসংখ্য বানোয়াট, অসত্য, অপাঠ্য ও নিম্নমানের বইপত্র লিখে ও প্রকাশ করে একদল দুর্বৃত্ত কোটিপতি হয়েছে।

স্কুলে স্কুলে লাইব্রেরির জন্য বরাদ্দের সিংহভাগ খরচ করে এসব বইপত্র কিনতে বাধ্য ছিল স্কুলগুলো। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক দান-অনুদান বরাদ্দও ছিল শর্তযুক্ত। ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতাধর নেতারা হতেন অনুষ্ঠানগুলোর শিরোমণি। গানে-নাটকে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলক থাকত তাঁদের তুষ্ট করা দলীয় বয়ান ও ব্যক্তি-স্তুতি। পত্রপত্রিকায় সত্য বলতে চাওয়া মানুষদের টুঁটি চিপে ধরার তথ্যপ্রযুক্তি আইন ছিল ‘জ্ঞান পুলিশের’ ভূমিকায়।

তরুণটিকে দেওয়া উত্তরে স্বীকার করেছিলাম, ‘ব্যক্তি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সততা, দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা ও অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব মূল্যায়নে আমজনতা অনেক প্রাজ্ঞ বিশ্লেষকের চাইতেও এগিয়ে। প্রমাণ তাঁদের জানাজার জনসমুদ্র। দুজনেরই দেশ শাসনের ভালো-মন্দ বিশ্লেষণের বিতর্কও বজায় থাকতে হবে ইতিহাসের নির্মোহ সত্যানুসন্ধানের দরকারে। শুধু তাঁরাই নন, যাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতা নেবেন—কেউই যেন ছাড় না পান।

 তরুণটি জানতে না চাইলেও নিজের কাছেই একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে—জেন-জিদের কাছে আমাদের মিথ্যুক পরিচয়টি ঘুচবে তো!

  • হেলাল মহিউদ্দীন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত

    মতামত লেখকের নিজস্ব