মিয়ানমারের নির্বাচন নিয়ে একটি সত্য সব সময়ই অপরিবর্তিত থাকে। যখনই গণতন্ত্রপন্থী দলকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের নেতাদের কারাগারে পাঠানো হয়, তখনই নির্বাচনে জয়ী হয় একটি সেনাপন্থী দল।
এটি কোনো নৈরাশ্যবাদী মন্তব্য নয়, বরং ইতিহাসের নথিভুক্ত সত্য। দশকের পর দশক ধরে কঠোর আইন, দীর্ঘ কারাবাস এবং জোরজবরদস্তিমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসক জেনারেলরা এই বাস্তবতা চাপিয়ে দিয়েছেন।
২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত শাসক জান্তার নির্বাচনের প্রথম ধাপ এর সাম্প্রতিক উদাহরণমাত্র। আনুষ্ঠানিক ফলাফল পুরোপুরি ঘোষণার আগেই ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং সরকারপন্থী মহলে এটিকে একটি বিশাল জয় বলে উদ্যাপন শুরু হয়েছে। পেছনে তাকালে এই ধারাবাহিকতা প্রায় বিব্রতকরভাবে স্পষ্ট।
যখনই ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়েছে, তখনই মিয়ানমারের ভোটাররা স্পষ্ট রায় দিয়েছেন। ১৯৯০ সালে এনএলডি বিপুল বিজয় অর্জন করে সামরিকপন্থী ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির তথাকথিত জনসমর্থনের দাবি ভেঙে দেয়। এর জবাবে জেনারেলরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানান। নির্বাচন হতে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফলাফলকে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়।
এখন ২০২৫ সালে এসে মিয়ানমারকে আবারও একটি সাজানো ভোটকে নির্বাচন বলে মানতে বলা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যা কোনো প্রকৃত গণতন্ত্রেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ভোট ধাপে ধাপে এবং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ।
এই অস্বীকৃতি জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছাকে দুর্বল করেনি। বরং এটি জেনারেলদের কৌশল বদলাতে বাধ্য করেছিল। ২০১০ সালে এনএলডিকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তখন সামরিক সমর্থিত ইউএসডিপিকে জয়ী করার মতো পরিবেশ তৈরি করা হয়। ফলাফলকে স্বাভাবিকভাবেই বড় বিজয় হিসেবে প্রচার করা হয়।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল জনগণের সম্মতির নয়, বরং পরিকল্পিত রাজনৈতিক কারসাজির। এরপর আসে ২০১৫ সাল, যখন দেশ আবার এমন একটি নির্বাচনের মুখোমুখি হয়, যা কিছুটা হলেও প্রকৃত প্রতিযোগিতার মতো ছিল। ফলাফল ছিল সামরিক দলের জন্য কঠোর ধাক্কা। এনএলডি প্রায় পুরো নির্বাচন জয় করে নেয় এবং ইউএসডিপি কার্যত ভেঙে পড়ে।
২০২০ সালে এই বার্তাই আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এনএলডি আবার বিপুল ব্যবধানে জয় পায়। ইউএসডিপি আবারও ভরাডুবির মুখে পড়ে। তখন জেনারেলরা আবার করে শক্তি প্রয়োগ। ভোট জালিয়াতির অভিযোগ ছিল অজুহাত। অভ্যুত্থান ছিল ফলাফল। আর কারাগার, গুলি ও বিমান হামলা ছিল সেই ফলাফল কার্যকর করার উপায়।
এখন ২০২৫ সালে এসে মিয়ানমারকে আবারও একটি সাজানো ভোটকে নির্বাচন বলে মানতে বলা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যা কোনো প্রকৃত গণতন্ত্রেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ভোট ধাপে ধাপে এবং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ। এনএলডিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং আইনগত রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলের নেত্রী এখনো বন্দী।
সমাজের বড় একটি অংশ, যারা একসময় ভোটকে নাগরিক দায়িত্ব মনে করত, তারা এখন এটিকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া একটি আচার হিসেবে দেখছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউএসডিপির তথাকথিত বড় জয় কোনো রাজনৈতিক বিস্ময় নয়। এটি আগেই নির্ধারিত ছিল। একটি সামরিক দলের পরিকল্পিত বিজয়ের একটাই উদ্দেশ্য। বেসামরিক পোশাক পরিয়ে সামরিক স্বৈরশাসনকে টিকিয়ে রাখা। এটাই জান্তার মূল হিসাব।
যদি তারা ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকে হারাতে না পারে, তাহলে ভোট ছাপার আগেই তাকে পরাজিত করবে। সবচেয়ে জনপ্রিয় দলকে নিষিদ্ধ করে, তাদের সংগঠনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, নেতাদের কারাগারে পাঠিয়ে এবং সমর্থকদের কণ্ঠরোধ করে। এমন পরিস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। আর ভোটার উপস্থিতির হার নিয়ে আলোচনা করা সম্পূর্ণ অর্থহীন।
কিন্তু মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাস যেকোনো বিদেশি নিন্দার চেয়েও বেশি শক্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যে নির্বাচনগুলো সত্যিকার অর্থে জাতীয় জনমত প্রকাশ করেছিল, ১৯৯০, ২০১৫ ও ২০২০—সেগুলোই ছিল এমন নির্বাচন, যার ফলাফল জেনারেলরা মেনে নিতে পারেননি। আর যেসব নির্বাচনে সামরিক দলের আরামদায়ক জয় দেখা গেছে, সেগুলোতে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাই অনুপস্থিত ছিল।
এ কারণেই ২০২৫ সালের নির্বাচন, ধাপে ধাপে সম্পন্ন হলেও এবং সংবিধানের ভাষায় সাজানো হলেও মিয়ানমারের সংকটের কোনো সমাধান দেবে না। মিয়ানমারে একটি সামরিক দল বহুবার নির্বাচনে জিততে পারে। এমনকি বিশাল ব্যবধানে জয়ও পেতে পারে।
এর জন্য তাদের শুধু একটি কাজই আগে নিশ্চিত করতে হয়—গণতন্ত্রপন্থী দল যেন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারে এবং তাদের নেতারা যেন কারাগারের ভেতরেই থাকে।
এটি গণতন্ত্র নয়। এটি পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের একটি ব্যবস্থা। এমন ব্যবস্থা মিয়ানমার আগে দেখেছে এবং দেখতে থাকবে—যত দিন না দেশটিকে সেই একটি জিনিসের সুযোগ দেওয়া হয়, যা নির্বাচনকে অর্থবহ করে তোলে—জনগণের সামনে একটি বাস্তব ও সত্যিকারের বিকল্প।
দ্য ইরাবতী থেকে নেওয়া, ইংরেজিতে থেকে অনূদিত