দৃষ্টান্ত হিসেবে অবৈধ মাদক কেনার বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। অনেকেই অন্ধকার গলির কোনো অপরিচিত আগন্তুকের কাছ থেকে এ ধরনের কিছু কেনার চেয়ে ইন্টারনেটকে নিরাপদ মাধ্যম বলে মনে করেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংগঠিত অপরাধী চক্রের সরাসরি যোগাযোগ থাকে। নিষিদ্ধ এসব পণ্যের নিয়ন্ত্রণও থাকে অপরাধী চক্রের হাতে। ফলে মাদকসেবীরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এমন সব তহবিলে অর্থায়নে সহযোগিতা করেন, যেগুলো সন্ত্রাসবাদ ও অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচার কিংবা মানব অঙ্গ ও টিস্যু পাচারের মতো বৈশ্বিক অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

কোভিড-১৯ মহামারিতে আমাদের সামনে নতুন নতুন ধরনের ডিজিটাল উদ্যোগের দরজা খুলে গেছে। অনলাইনে মাদক বিক্রির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ডার্ক নেট, ওপেন ওয়েব, ক্রিপটো মার্কেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাম্ফেটামিনের মতো উদ্দীপক মাদক কিংবা নতুন ধরনের সাইকো-অ্যাকটিভ (মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কাজ করে) মাদক অনেক বেশি সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন এই বিতরণব্যবস্থায় ঝুঁকির সঙ্গে কিছু সুবিধাও আছে। এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে জনস্বাস্থ্যের ওপর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, এমন নতুন মাদক দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত করা সম্ভব। আবার সশরীর ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে না বলে তাঁরা শারীরিক সহিংসতা, চুরি, যৌন নিপীড়ন এবং অপহরণের মতো অপরাধ থেকে অনেকটাই রক্ষা পান।

আমরা ক্রমাগত যখন অনলাইন বিশ্বের দিকে চলেছি, তখন সাইবার নিরাপত্তাকে হ্যাক কিংবা জালিয়াতি প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আরও বড় পরিসর থেকে ভাবতে হবে। বিষয়টা জননিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও জনকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত।

অনলাইনে একটি নিরাপদ পরিসর সৃষ্টি করতে হলে সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষগুলোকে এ বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত। পুলিশি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেবল অপরাধ দমন নয়, কোন কোন বিষয়কে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্বও রাষ্ট্রের। জনস্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মতো মৌলিক অধিকার সুরক্ষার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। সুনির্দিষ্ট করে মাদকের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে কে প্রকৃতপক্ষে অপরাধী আর কে অপরাধের শিকার, সেটা নির্ধারণের জন্য আরও ভালো করে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। এ জন্য সাইবার অপরাধ বিভাগকে শক্তিশালী ও সক্ষম করে গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। মাদকসেবী আর মাদকের বাজারের পেছনে না ছুটে তথ্য ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ এবং সেসব অপরাধ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে একটা সম্ভাবনাময় নতুন মডেল হলো ‘প্রি-অ্যারেস্ট পুলিশ ডাইভারশন’। এটি মাদকসেবীদের সমাজভিত্তিক চিকিৎসা এবং পথপ্রদর্শনের একটি পদ্ধতি, যাতে তাঁদের বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বায়োসাইকোসোশ্যাল (জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান) উপকরণ ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই মডেলের মাধ্যমে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন করা যায়। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্যাক চার্লিয়ারের মতে, মাদকাসক্তদের সমাজভিত্তিক এ চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সুপারিশকারীর (কার আগে, কার পরে) ভূমিকা পালন করতে পারে।

একটি নিরাপদ ডিজিটাল বিশ্ব তৈরির জন্য মাদকাসক্তদের প্রতি এখন যে দমনমূলক মনোভাব দেখানো হয়, তা পরিবর্তন করে শিক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো প্রয়োজন। দৃষ্টিভঙ্গিতে এই বদল আনা গেলে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সঙ্গে জনগোষ্ঠীর যে দূরত্ব আছে, তা-ও অনেকটাই ঘুচিয়ে ফেলা সম্ভব। সাইবার অপরাধের যে হাইব্রিড ধরন, তাতে নতুন একটি কার্যকর কৌশল বাস্তবায়ন করতে গেলে আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন। এ জন্য ‘অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিরোধে সমন্বিত আন্তর্জাতিক সনদ’-এর খসড়া তৈরির জন্য জাতিসংঘ একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু সাইবার পরিসরে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, আইন প্রয়োগপদ্ধতিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাজানো জরুরি।

আমরা ক্রমাগত যখন অনলাইন বিশ্বের দিকে চলেছি, তখন সাইবার নিরাপত্তাকে হ্যাক কিংবা জালিয়াতি প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আরও বড় পরিসর থেকে ভাবতে হবে। বিষয়টা জননিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও জনকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

মার্টিন ইগ্নাসিও দিয়াজ ভেলাসকুয়েজ ওয়ান ইয়াং ওয়ার্ল্ডের দূত

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন