যে দোয়া-আমলে হজের তাওফিক লাভ হয়
হজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক একটি ইবাদত ও নেক আমল। যাঁরা হজ করার সুযোগ পাবেন, তাঁদের হজ যেন মাকবুল ও মাবরুর হয়, এ জন্য সর্বদা দোয়া করা দরকার।
প্রিয় নবীজি (সা.) হজে মাবরুরের জন্য দোয়া করেছেন—‘আল্লাহুম্মারযুকনা হাজ্জান মাবরুরা, ওয়া যাম্বান মাগফুরা, ওয়া সায়িয়ান মাশকুরা, ওয়া তিজারাতান লান তাবুর।’ অর্থ—‘হে আল্লাহ! আমাদের হজে মাবরুর নসিব করুন, আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করুন, আমাদের সৎ প্রচেষ্টা গ্রহণ করুন, আমাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন এবং (ইহজগতে ও পরকালে) এমন লাভজনক ব্যবসায় সফলতা দিন, যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’ (তিরমিজি ও মুসলিম)
বায়তুল্লাহ বা কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণের পর হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.) উভয়ে এই দোয়া করেছেন, ‘রব্বানা ওয়াজআলনা মুসলিমাইনি লাকা ওয়া মিন যুররিয়্যাতিনা উম্মাতাম মুসলিমাতান লাকা; ওয়া আরিনা মানাসিকানা ওয়া তুব আলাইনা, ইন্নাকা আনতাত-তাওয়াবুর রহিম।’ অর্থাৎ—‘হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার অনুগত একটি জাতি তৈরি করুন। আমাদের হজের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হোন। আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৮)
তিনটি আমল করলে আল্লাহ–তাআলা হজ করার তাওফিক দান করবেন অথবা ওই ব্যক্তিকে হাশরের ময়দানে হাজি হিসেবে ওঠাবেন। এক. হজের নিয়ত করা, ‘হে আল্লাহ! আমি হজ করার নিয়ত বা ইচ্ছা করেছি। আপনি সহজ করুন ও কবুল করুন।’ দুই. সব সময় দোয়া করতে থাকা, ‘হে আল্লাহ! আমি হজের জন্য নিয়ত করেছি। আপনি কবুল করুন এবং তাওফিক দান করুন।’ তিন. সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা—আর্থিক সংগতি অনুযায়ী সঞ্চয় করতে থাকা।
হজ ফরজ হওয়ার পর বিলম্ব করলে পরে সামর্থ্য হারিয়ে ফেললে বা মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ–তাআলার কাছে ফরজ তরককারী অপরাধী হিসেবেই তাঁকে হাজির হতে হবে।
হজের সামর্থ্য থাকলেই সবাই হজ পালন করতে পারেন না। যেমন ভারতীয় উপমহাদেশে সাত শ বছর রাজত্ব করা মোগল শাসকদের একজনও হজ করার সুযোগ পাননি; যদিও তাঁদের কেউ কেউ খুবই ধার্মিক ছিলেন।
সামর্থ্যবান ব্যক্তি যদি হজ পালনে বিলম্বের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা-ইস্তিগফার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে হজ সম্পাদনের নিয়ত ও দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করেন এবং তদনুযায়ী প্রচেষ্টা, প্রস্তুতি ও আয়োজনে ব্রতী হন, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরপর বা বারবার হজ ও ওমরাহ পালন করো। কারণ, এই উভয় দ্বারা দারিদ্র্য দূর হয় এবং পাপমোচন হয়, যেমন আগুন লোহা ও স্বর্ণ-রুপার ময়লা দূর করে।’ (তিরমিজি: ৮১০)। ‘হজ পালনকারী ব্যক্তি কখনো নিঃস্ব হবে না, অভাব-অনটনে পড়বে না।’ (মুসনাদে বাযযার: ১০৮০, তাবরানী—আল-আওসাত: ৫২০৯)
রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছা করে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা আদায় করে নেয়। কারণ, যেকোনো সময় সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা বাহনের ব্যবস্থা না–ও থাকতে পারে, অথবা অন্য কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।’ (আবু দাউদ: ১৭৩২; ইবনে মাজাহ: ২৮৮৩; মুসনাদে আহমদ: ১৮৩৩; সুনানে দারিমি: ১৭৮৪; মুসতাদরাকে হাকিম: ১৬৮৭; তাবরানী: ৭৩৮)। ‘ফরজ হজ আদায়ে তোমরা বিলম্ব কোরো না। কারণ, তোমাদের কারও জানা নেই, তোমাদের পরবর্তী ভবিষ্যৎ জীবনে কী ঘটবে।’ (মুসনাদে আহমদ: ২৮৬৭; বায়হাকি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৪০)
হাদিসে কুদসিতে রয়েছে, ‘আল্লাহ–তাআলা বলেন—আমি আমার বান্দার শরীরকে সুস্থ রাখলাম, তার রিজিক ও আয়-উপার্জনে প্রশস্ততা দান করলাম। এমতাবস্থায় পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি সে আমার ঘরের হজের উদ্দেশ্যে আগমন না করে, তবে সে হতভাগা, বঞ্চিত।’ (বায়হাকি—সুনানে কুবরা, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৬২; ইবনে হিববান: ৩৬৯৫; আবু ইয়ালা: ১০৩১; তাবরানী: ৪৯০; মাজমাউয যাওয়াইদ: ৫২৫৯)
হজ ফরজ হওয়ার পর বিলম্ব করলে পরে সামর্থ্য হারিয়ে ফেললে বা মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ–তাআলার কাছে ফরজ তরককারী অপরাধী হিসেবেই তাকে হাজির হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার ইচ্ছা হয় কিছু লোককে বিভিন্ন শহরাঞ্চল ও লোকালয়ে পাঠিয়ে দিই। তারা সেখানে গিয়ে দেখবে, কারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ করছে না। তারা তাদের ওপর জিজিয়া কর আরোপ করবে; কারণ তারা মুসলমান নয়, তারা মুসলমান নয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৭৮)
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম