তৃণমূল ও বিজেপি—ক্ষমতা ধরে রাখার যত হিসাব–নিকাশ

নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ফাইল ছবি

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত দ্রুত পাল্টায়। ছয় মাসের ব্যবধানে নতুন করে বুঝতে হয় কে কার শত্রু বা বন্ধু, কার রাজনৈতিক ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছে, কার কপাল খুলছে। তাই মাঝেমধ্যে লিখে পরিস্থিতি বুঝতে হয়। না লিখলে বোঝা যায় না কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে, বাইরে থেকে বিষয়টা এতই জটিল। গত ডিসেম্বর মাসে লিখেছিলাম, ২০২২ সাল তৃণমূল কংগ্রেসের স্বস্তিতেই কেটেছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলেও কি অবস্থা অনুরূপ? না কিছু পরিবর্তন ঘটেছে? একনজরে গত চার মাসের প্রধান রাজনৈতিক ঘটনাগুলো দেখে নেওয়া যাক।

ঘটনাপ্রবাহ

এক. তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভা উপনির্বাচনে মুর্শিদাবাদের একটি আসনে (যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ মুসলমান) হেরেছে। এরপর মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

দুই. উপনির্বাচনে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস জোটের ভোট ভালো রকম বেড়েছে, কমেছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি)। তিন. পশ্চিমবঙ্গে বড় গোষ্ঠী-দাঙ্গা হয়েছে। চার. বিজেপি-শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে উন্নত পরিষেবার জন্য একের পর এক সার্টিফিকেট পেয়েছে তৃণমূল সরকার। পাঁচ. জাতীয় স্তরে বিজেপির মধ্যে একধরনের উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে, সম্ভবত রাহুল গান্ধী কিছুটা সক্রিয় হওয়ার ফলে। ছয়. তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় দলের পরিচয় খারিজ হয়ে গিয়েছে। সাত. ২০২২ সালের মতোই তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ লম্বা হয়েছে, পুরোনো মামলা চলছে এবং নতুন মামলা তালিকাভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি আরও কিছু নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। আট. অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত ছয় মাসে দলের ভেতর নিজের জায়গা আরও মজবুত করেছেন। নয়. ত্রিপুরাসহ অন্যান্য রাজ্যে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা ‘প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’ স্লোগান দেওয়া বন্ধ করেছেন। তিনি নিজেও এ ব্যাপারে কর্মীদের খুব উৎসাহিত করছেন বলে মনে হয় না। দশ. মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, আগামী লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস একাই লড়বে।

আরও পড়ুন

বিশ্লেষণ

এ ১০ ঘটনার ভিত্তিতে কিছু বিষয় উপস্থাপন করা যায়। যেমন প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জোটের সামান্য উত্থান বিপর্যয় ডেকে আনছে—না, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নয়—বিজেপির। কারণ, মমতাবিরোধী ভোট বাম জোট ও বিজেপির মধ্যে ভাগ হচ্ছে। এতে লাভ তৃণমূল কংগ্রেসের। কারণ, বিজেপির ভোট বিধানসভায় প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে, আর বামেদের সাড়ে ৫ শতাংশে। সেখান থেকে বিজেপির ভোট কমে যদি ২০ শতাংশে পৌঁছায়, আর বামেদের ভোট বেড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশের আশপাশে চলে যায়, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে খুশি আর কেউই হবেন না। কারণ, প্রায় দেড় দশক ধরে মোটামুটি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে ভোট পাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস।

দ্বিতীয়ত, বিষয়টা এখন আর খুব একটা পরিষ্কার নয় যে, পশ্চিমবঙ্গে ও কেরালায় বিজেপি সত্যিই ক্ষমতায় আসতে চায় কি না। এ দুই রাজ্যে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান। এ দুই রাজ্যে বিরোধিতা থাকলে ভারতের বাকি অংশে প্রচার করা যায়, এখানে ‘জিহাদি’ তৎপরতা বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম, গ্রুপ ও বক্তাদের ভাষণে সারাক্ষণ ‘জিহাদি’ কথাটি ব্যবহার করা হয়। এ দুই রাজ্যে বিরোধীরা ক্ষমতায় না থাকলে বিজেপির পক্ষে ‘ভিকটিমহুড ন্যারেটিভ’ বা ‘হিন্দুরা আক্রান্ত’—এ আখ্যান তুলে ধরা মুশকিল।

আরও পড়ুন

তৃতীয়ত, রাহুল গান্ধীকে নিয়ে হঠাৎ যে আলোড়ন শুরু হয়েছে, তা হয়তো কিছুটা উৎকণ্ঠায় ফেলেছে বিজেপিকে। এর কারণ, উত্তর ভারতের সাতটি রাজ্যে (মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, হরিয়ানা, গুজরাট, উত্তরাখন্ড ও হিমাচল প্রদেশ) বিজেপি গতবার ১১০টি আসনের মধ্যে ১০৬টি পেয়েছিল। এই ১১০ আসনে মোটামুটিভাবে বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসের লড়াই সরাসরি (যদিও আম আদমি পার্টির সামান্য উত্থান হয়েছে)। এখানে রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রভাব পড়লে বিজেপির বিপদ বাড়বে। মনে রাখা প্রয়োজন, ২০২৪ সালে বিজেপিকে ১০ বছরের ক্ষমতায় ফলে একটি সরকারের বিরুদ্ধে যে সাধারণ বিরোধিতা ও অসন্তোষ তৈরি হয় তাকে মোকাবিলা করতে হবে। এ ছাড়া, একটি বড় রাজ্য বিহারে তারা অতীতে ভালো ফল করলেও বর্তমানে ক্ষমতায় নেই। সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশে লোকসভা ও বিধানসভা—দুই নির্বাচনেই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বিজেপির আসন কমেছে। যে কারণে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের মধ্যে গিয়ে কাজ করার কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ অবস্থায় ১১০টির মধ্যে কিছু আসনেও কংগ্রেস ভালো ফল করলে বিজেপির সমূহ বিপদ।

তৃতীয় কারণের জন্যই (চতুর্থত) বিরোধী জোটকে বিচ্ছিন্ন রাখা জরুরি। বিরোধীদের বিচ্ছিন্ন রাখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রশ্ন উঠছে, বিরোধীদের বিচ্ছিন্ন রাখতেই কি লোকসভা নির্বাচনের এক বছর আগে মমতা ঘোষণা করলেন, তিনি এককভাবে নির্বাচনে লড়বেন? অন্তত নির্বাচনের আগে কোনো জোটে যাবেন না। সে রকমই অভিযোগ তাঁর বিরোধীদের। আরও একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করছেন, রাজ্যে বর্তমানে অত্যন্ত কমজোরি হলেও বিজেপি লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গে অনেক আসন পাবে এবং পরিবর্তে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে জমি ছেড়ে দেবে। প্রকাশ্যে, পশ্চিমবঙ্গে এই সমীকরণকে ‘সেটিং’ বলে চিহ্নিত করা হয়। বামফ্রন্ট জমানাতেও ‘সেটিং’-তত্ত্ব চালু ছিল। বলা হতো, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস সমঝোতা করে রাজ্য ও কেন্দ্র চালায়।

এই ‘সেটিং’-তত্ত্ব আরও জোরালো হয়েছে রাজ্যে সাম্প্রতিক গোষ্ঠী দাঙ্গার কারণে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কেউ বলতে পারছেন না, প্রধানত অবাঙালি অঞ্চলে এই দাঙ্গায় কার লাভ হলো? হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একটি শাখা সংগঠনের এক প্রভাবশালী নেতা এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দাঙ্গায় বিজেপির ক্ষতি হয়েছে। লাভ হয়েছে তৃণমূলের। তবে সবকিছু সব সময় রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।’ তৃণমূলের লাভের কারণ, দাঙ্গার আগে পশ্চিমবঙ্গের বড়সংখ্যক ভোটার, বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, তৃণমূলের দুর্নীতি এবং প্রশাসনের অরাজকতা নিয়ে সরব হয়েছিলেন। দাঙ্গার পরে তারা অতটাই সরব হবে কি না বলা মুশকিল।

আরও পড়ুন

এ চার কারণের পরিণাম হলো পঞ্চম কারণ। সেটি হলো তৃণমূল কংগ্রেসের সামগ্রিক অবস্থা বেশ ভালো। ধারাবাহিক গ্রেপ্তার এবং নানা দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনের কারণে যাঁরা মনে করছেন তৃণমূলের অবস্থা খারাপ, তাঁরা সম্ভবত বাস্তব বিশ্লেষণ করছেন না। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস কাছাকাছি এলে রাজনীতির স্বাভাবিক ছন্দেই তৃণমূল বিপরীত মেরুর দল কেন্দ্রীয় বিজেপির ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। এতে সবচেয়ে ক্ষতি হয় রাজ্য বিজেপির, যেমনটা বাম জমানায় হয়েছিল রাজ্য কংগ্রেসের। তৃণমূল-কেন্দ্রীয় বিজেপির অনানুষ্ঠানিক সখ্য গড়ে উঠলে রাজ্য বিজেপি তার দাঁত-নখ হারায়। তেমনই হচ্ছে বলে এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে।

তবে রাজনীতিতে হাওয়া ঘুরতে বিশেষ সময় লাগে না। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে আরও ছয়টি রাজ্যে নির্বাচন আছে। এর মধ্যে চারটি—কর্ণাটক, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা—বড় রাজ্য। এসব রাজ্যে কংগ্রেস বা বিজেপিবিরোধীরা কোনো কারণে জিতে গেলে হাওয়া ঘুরতে সময় লাগবে না। পশ্চিমবঙ্গেও তার প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়ে কোনো কারণে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা হাত দিলে বাধ্য হয়েই তৃণমূলকে বড় ধরনের বিজেপিবিরোধী আন্দোলনে যেতে হবে। সে রকম কোনো ঘটনা না ঘটলে আশা করা যায়, পশ্চিমবঙ্গে আগামী দিনে লোকসভায় বিজেপি ও বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থা আরও শক্তপোক্ত হবে।

  • শুভজিৎ বাগচী প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা