আমি বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ছোট একটা প্রতিবেদন তাঁর কাছে উপস্থাপন করলাম। তিনি সেটা রাখলেন। পরে সহকারীর মাধ্যমে একদিন খবর দিলেন, আমি যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি। তিনি তখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব। যাওয়ার পর আমাকে বললেন, আপনারা তো বিদেশি ব্যাংকে অর্থায়নের আগে খাতওয়ারি বিশ্লেষণ করেন।

কয়েকটি খাতের কথা উল্লেখ করে আমাকে বললেন, এ খাতগুলো কীভাবে চলছে, কারা চালাচ্ছে, এগুলো একটু গভীরভাবে দেখতে পারি কি না। আর তাঁরা যদি এ খাতকে উৎসাহিত করতে চান, তাহলে কীভাবে তা হতে পারে। তিনি দুগ্ধ খাত নিয়ে একটা বিশ্লেষণ দিতে বললেন। তখন মিল্ক ভিটা ও কুমিল্লা বাটার ছাড়া আমি খুব একটা চিনতাম না। তখন প্রাণও আসেনি। আমি কিছুদিন ভারতে কাজ করেছি। আমূল ও সমমানের দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ বিবেচনায় নিয়ে ছোট্ট করে একটা বিশ্লেষণ লিখে দিলাম। এটা ২৫ বছর আগের কথা। সেই থেকে তিনি বিভিন্ন খাত, অর্থনীতি তথা আর্থিক খাতে বিভিন্ন ঘটে যাওয়া বিষয় নিয়ে আমার কাছে জানতে চাইতেন। অনেক অনেক বিষয়ে তাঁর ছিল নিরন্তর উৎসাহ। কথা বলতেন কম, লিখতেন আর পড়তেন অনেক বেশি।

আরেকটি কথা মনে পড়ছে, আমি তখন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন বিভাগে যোগ দিয়েছি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার বিভাগের কাজ কী? আমি বললাম, এটা করেসপনডেন্ট ব্যাংকিং বা ব্যাংকগুলোর জন্য ব্যাংকিং সেবা। আমাদের যেহেতু বিভিন্ন দেশে শাখা আছে, তাই তাদের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পাদনে সহায়তা করি। জেনে তিনি বললেন, আপনি তাহলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যাংকের ম্যানেজারকে ফোন করে জানার চেষ্টা করুন, ইদানীং কী কী পণ্য বেশি আমদানি হয় এবং প্রয়োজনে ভোক্তার জন্য পণ্যমূল্য কীভাবে কমানো যেতে পারে।

একদিন তাঁর অফিসে গেলাম। তিনি কোথাও যাবেন। বললেন, আমি একটু বিশ্বব্যাংকের মিটিংয়ে যাচ্ছি। তবে আমি লন্ডন হয়ে যাব। আমাদের ভৈরবে একটা সড়ক সেতু হবে। টাকা নেই তো, সে জন্য ইউকে সরকারের যে ইসিজিডি বা এক্সপোর্ট ক্রেডিট সুবিধা রয়েছে, তাদের সঙ্গে তা নিয়ে আলাপ করব। তিনি বললেন, কাজটা কোনো ব্রিটিশ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি পেলে তারা এক্সপোর্ট ক্রেডিট গ্যারান্টি দেবে। আজ বলতে দ্বিধা নেই, কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা নয়, তার কাছ থেকেই আমি প্রথমে ইসিজিডির নাম শুনেছিলাম। একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সির গ্যারান্টি পেলে আমাদের সেতু নির্মাণ সহজ হয়ে যাবে।

ড. আকবর আলি খান পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের পক্ষ ছেড়ে প্রবাসী সরকারে যোগ দিয়েছেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধু সরকারের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সব সময়ই দেশের স্বার্থ চিন্তা করতেন। তাঁর ছিল বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহ এবং পাণ্ডিত্য। অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যা খুব বিরল।

আরেকবার আকবর আলি খান আমাকে ডেকেছিলেন। সম্ভবত তিনি তখন গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান। ১৯৯৮ সালের বন্যার সময়। অনেক ক্ষয়ক্ষতি। গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রাহকেরা ঋণ ফেরত দিতে পারছিলেন না। তিনি বললেন, গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য তুমি কিছু করতে পার কি না দেখো। আমাদের ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এবং ঋণ অনুমোদন লন্ডন থেকে হয়। তিনি বললেন, তুমি দুটো কাজ করো। প্রফেসর মুহম্মদ ইউনূসের ওপর ব্যাংকার টু দ্য পুওর বইটি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মডেলের ওপর বিদেশে কেউ একজন পিএইচডি করেছিলেন, বইটি গ্রামীণ ট্রাস্টে গিয়ে সংগ্রহ করে কুরিয়ার করে লন্ডনে পাঠিয়ে দাও। সঙ্গে আবেদনপত্রও পাঠিয়ে দিও। মনে আছে, সহায়তা পেতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আকবর আলি খান গতানুগতিক কাজের বাইরে গিয়ে অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়ের আদ্যোপান্ত কীভাবে বুঝতেন, তা ভাবলে অবাক হতে হয়।

আরেকটা কথা। সম্ভবত ২০০০ কি ২০০১ সাল। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি অনেক কমে এল। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, তোমাদের ব্যাংক এবং আরও কিছু ব্যাংক আফ্রিকায় রিসিভেবল সিকিউরিটাইজেশন করেছে বলে জানি। বাংলাদেশে কত রেমিট্যান্স আসে, কোন ব্যাংকের মাধ্যমে আসে ব্যাখ্যা করে বললেন, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ৩/৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এলে তার বিপরীতে ১ বিলিয়ন ডলারকে রিসিভেবল সিকিউরিটি ধরে তোমাদের ব্যাংক আমাকে ঋণ দিক এলসি খোলার জন্য। এলসি খুলতে পারলে সরকারের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্য আমদানি হবে এবং দরিদ্র লোক স্বস্তিতে থাকবে।

ড. আকবর আলি খান পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের পক্ষ ছেড়ে প্রবাসী সরকারে যোগ দিয়েছেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধু সরকারের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সব সময়ই দেশের স্বার্থ চিন্তা করতেন। তাঁর ছিল বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহ এবং পাণ্ডিত্য। অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যা খুব বিরল।

ব্যক্তিগতভাবে ড. আকবর আলি খান যেখান থেকে যা পেয়েছেন, তা শিখেছেন তা জনগণের কল্যাণে কাজেও লাগিয়েছেন। এটা তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যবোধের একটা বড় জায়গা। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর স্ত্রীকে তিনি খুব সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, একজন সফল মানুষ হতে গেলে দুটো বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক, জ্ঞান এবং দুই, সুখী পরিবার। আমি তাঁর বাসায় অনেকবার গিয়েছি। যাওয়ার পর প্রতিবারই অনেক জিনিস এসে যেত। তাঁর স্ত্রী ছিলেন সানবিমস স্কুলের একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, ভালো ও জ্ঞানদীপ্ত পরিবারের সদস্যও ছিলেন।

ড. খান তাঁর মেয়েকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। কিছুদিনের ব্যবধানে স্ত্রী ও কন্যা–বিয়োগ তাঁকে অনেক দুঃখে ফেলে দিলেও তিনি ভাঙেননি। যেন বেঁচেছিলেন এ দেশের, জনগণের জন্য আরও ভালো কিছু করতে আর লেখালেখি করতে।

কীভাবে সৎভাবে জীবন যাপন করতে হয়, দুঃসময়েও সাহস নিয়ে কথা বলতে হয়, প্রান্তজনবঞ্চিত মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে হয় এবং নানাভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের দায় শোধ করতে হয়, তার সমুজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবেন সদা জ্ঞানপিপাসু ড. আকবর আলি খান। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

  • মামুন রশীদ ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক