এর জন্য ২০১০ সাল থেকে বিধিমালা রয়েছে। আর পিএসসি সে বিধিমালা অনুসরণে বিভিন্ন শূন্য পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে। এটা সত্যি, চাকরিপ্রার্থীর কাছে একটি ঈপ্সিত চাকরি, তাঁর জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং তাঁরা সেটা পেতে বহুমুখী তৎপরতা দেখান। অন্যদিকে পিএসসিকে এ ধরনের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করতে হয়। আর সে সুপারিশ করতে তাদের বিভিন্ন বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। পিএসসি একটি সাংবিধানিক সংস্থা। ১৯৭৭ সালের অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি। এ ছাড়া বিসিএস–সহ সব নিয়োগ কার্যক্রম চলে সংশ্লিষ্ট পদ বা ক্যাডারের নিয়োগবিধি অনুসারে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা পিএসসির নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার একক কর্তৃত্বের অধিকারী।

হালে একটি সংকট চলমান। প্রত্যাশী মন্ত্রণালয়/ সংস্থা সময়ে সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পিএসসির কাছে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার জনবল নিয়োগের অধিযাচনপত্র পাঠায়। বরাবরের ধারাবাহিকতায় তাই চলছিল। এ বিষয়ে ক্যাডার পদে নিয়োগ নিয়ে আপাতত কোনো সমস্যা সম্পর্কে জানা যায় না। যথারীতি সুপারিশ পাঠানো হয়।

সংকট হয় নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ করতে গিয়ে। বিলম্বে হলেও পিএসসি দেখতে পায় অধিযাচন করা এসব অনেক পদ বিজ্ঞাপিত হয়নি। আর এর জন্য আগের মতো ছাড় দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করা হয়নি। সুতরাং তারা পদসংখ্যা সীমিত রাখতে চায় শুধু বিজ্ঞাপিত পদে। এমনটা করলে স্বাভাবিকভাবে নন-ক্যাডার শূন্য পদ কমে যাবে।

চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়ের ছাপ সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। তবে সে জন্য যেসব পদে এত দিন যাঁরা নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালনা করে আসছিলেন, তাঁদেরই তা করতে হবে, এটি জোর দিয়ে বলা যায়। বিশ্বাসযোগ্যতা আছে বলেই সবকিছু পিএসসির ওপর চাপিয়ে দিতে হবে এটা কোনো ন্যায্য সমাধান নয়।

আপাতত সংকুচিত হবে নিয়োগ–সুবিধা। এটা জানতে পেরে চাকরিপ্রত্যাশীরা আশাহত হন। এতে তাঁরা একের পর এক প্রতিবাদী কর্মসূচি দিতে থাকেন। তবে বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিতে যেসব নন-ক্যাডার পদের উল্লেখ নেই, সেগুলোয় পিএসসি নিয়োগ দিতে পারছে না বলে জানা যায়। মানবিক বিবেচনায় চাকরিপ্রার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা থাকতে পারে। আবার সরকারেরও রয়েছে জনবলের চাহিদা।

সে হিসেবে বিদ্যমান শূন্য পদে উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে তাঁরা নিয়োগ পাওয়ার দাবিদার। অন্যদিকে বিধিগত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পিএসসির অবস্থানকেও উপেক্ষা করা চলে না। সরকার সমস্যাটি এবারকার মতো ছাড় দিয়ে নিয়োগ বিধিমালায় আরেকটি সংশোধনী আনলে আপাতত সংকট কাটতে পারে। বিষয়টি খুব জটিলও নয়। সরকারের লোক প্রয়োজন। উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীও রয়েছেন। তবে যে সংস্থার হাতে এ সুপারিশের দায়িত্ব, তাদের বিধি উপেক্ষা করতে বলা চলে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখানে একটু উদ্যোগী হলে বিষয়টির আপাতসমাধান হয়। এতে সব পক্ষ উপকৃত হবে।

যে পিএসসির হাতে সুপারিশের দায়িত্ব তারা মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপে আছে। এটা অতীতেও বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিসিএসের সাধারণ ও বিশেষায়িত ক্যাডারগুলোর পরীক্ষা একসঙ্গে নিয়ে উপযুক্ত লোকবল বাছাই একটি জটিল প্রক্রিয়া। শিক্ষা ক্যাডারের জন্য একটি পৃথক পিএসসি করা বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল।

সেসব অতীত হয়ে গেছে। পাশাপাশি জট বৃদ্ধি পেয়ে চলছে পিএসসির নিয়োগপ্রক্রিয়ায়। সেটা বাদই দিলাম। কয়েক হাজার ডাক্তারকে শুধু প্রিলিমিনারি ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশেষায়িত পদগুলো (কৃষিবিদ, শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক ইত্যাদি) এ প্রক্রিয়ায় পৃথক একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলে সব পদে নিয়োগ সহজতর হবে। এতে কোনো পক্ষেরই মানমর্যাদা, বেতন-ভাতা কমবেশি হবে না। এ বিষয়ে অনেক নিষ্ফল রচনা লিখে গেছি বছরের পর বছর।

কারও পড়ার সময় হয়েছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে এখানে নন-ক্যাডার সংযোজন জটিল নিয়োগপ্রক্রিয়াকে জটিলতর করেছে। সরকার চাইলে বেশ কিছু পদ-পদবিকে পিএসসির আওতামুক্ত করতে পারে। যেমন করা হয়েছে পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ ও ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগের একটি অবিতর্কিত পদ্ধতি ছিল। সেখান থেকে পিএসসিতে এনে কার কী লাভ হলো, বোধগম্য হচ্ছে না। স্বাধীনতার পর যে হিসাব-নিকাশ থেকে পিএসসি গঠিত হয়, জনপ্রশাসনের আকৃতি-প্রকৃতি সে তুলনায় অনেক বেড়েছে, অথচ পিএসসি খুব একটা বাড়েনি। আর এর বেশি বাড়ালে ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে পড়বে।

নন-ক্যাডার চাকরিগুলোর ধরন বহুমুখী। তাদের কাজের চাহিদাও অনেকাংশে সম্পূর্ণ পৃথক। গণপূর্তের উপসহকারী প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সচিবালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাজ অভিন্ন নয়। সুতরাং তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়াও ভিন্ন হতে হবে। এগুলোর চাকরিবিধিও পেশার সঙ্গে সংগতি রেখে অন্যটি থেকে পৃথক। বর্তমান নিয়মে পিএসসির মাথায় সব বোঝা চাপিয়ে দিয়ে স্বস্তি পেতে চান অনেকেই। অবশ্য এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

নিয়োগের অন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের ফলে অনেকাংশে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এমনটা হয়েছিল পিএসসির ক্ষেত্রেও, তবে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন বিশ্বাসযোগ্যতার একটি মান ধরে রেখেছে। তবে এর খেসারত হিসেবে তাদের সক্ষমতার অধিক কাজ চাপিয়ে দিলে সে মান ধরে রাখা কঠিন হবে। সুতরাং বিশেষায়িত ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদের জন্য পৃথক পিএসসি গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা না হলেও পৃথক পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা দরকার।

নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ নিয়ে হালে যে বিতর্কটি চলছে, তা দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া সংগত হবে না। ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য পিএসসির কর্ম পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রার্থীদের চাকরি দরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তবে সমস্যাটির বিধিগত সমাধান কোথায় সেটি দেখতে হবে। নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালায় পিএসসির ক্ষমতা সীমিত করা আছে বিধিমালা দিয়ে।

অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীদের বয়স হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা অপেক্ষমাণ আছেন দীর্ঘ সময়। প্রজাতন্ত্রের কর্মেও খালি পদ রয়েছে। এ বিবেচনায় সরকারকেই বিধিমালার সীমাবদ্ধতা দূর করতে মূল ভূমিকা রাখতে হবে। এখানে সমাধান দিতে হবে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদের ভিত্তিতে। বর্তমানে যে সমস্যার জট বেঁধেছে, তা দূর করার জন্য সাময়িক একটা ব্যবস্থা নিয়ে ফেলে রাখলে নিকট ভবিষ্যতে এরূপ আরও ঘটবে। সুতরাং পিএসসি যাতে সুচারুভাবে তার দায়িত্ব সম্পাদন করতে পারে, সে ব্যবস্থাও করে দিতে হবে।

চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়ের ছাপ সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। তবে সে জন্য যেসব পদে এত দিন যাঁরা নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালনা করে আসছিলেন, তাঁদেরই তা করতে হবে, এটি জোর দিয়ে বলা যায়। বিশ্বাসযোগ্যতা আছে বলেই সবকিছু পিএসসির ওপর চাপিয়ে দিতে হবে এটা কোনো ন্যায্য সমাধান নয়।

আর সব প্রতিষ্ঠানই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিল বা ফেলছে, এমনও নয়। বরং তাদের কাজ নিয়ে এসে পিএসসিকে দিলে তারা ক্রমান্বয়ে আস্থাহীনতায় ভুগবে। অন্যদিকে অত্যধিক চাপের মুখে পিএসসির গুণগত মান হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই চলমান সংকটটি আরও গভীর হওয়ার আগেই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা তৎপর হতে পারে। এতে মিটবে হালের বিষয়টি। আর এমনটা যাতে না হয়, তার জন্য এখন থেকে সবাইকে সতর্ক করা যায়।

  • আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]