যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, সরকার দেশে প্রাথমিক জ্বালানি ডিজেল, ফার্নেস তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদির দাম বাড়ায়; যখন স্থির থাকে বা কমে, তখন সেকেন্ডারি জ্বালানি, অর্থাৎ বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। ১২ বছরে বিদ্যুতের দাম অন্তত আটবার বেড়েছে, এই সময় ডিজেলের দাম ৩৪ টাকা থেকে ১৩০ টাকা হয়েছে।
এরপরও সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লোকসান করছে, কখনো কখনো দিনেই ১০০ কোটির বেশি লোকসান। কেন?

১. আনুকূল্য পাওয়া ব্যবসায়ীদের পকেট ভারীর জন্য চুক্তির ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। এসব চুক্তিতে ৭, ৯, ১২, ১৫, ২২ এ রকম যথেচ্ছ বিদ্যুতের দামে নির্ধারিত হয়েছে। যে কোম্পানি যা পেরেছে বাগিয়ে নিয়েছে, কোনো বিধিবদ্ধ নীতি ছিল না।

২. ক্যাপাসিটি চার্জ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া ১৪ বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক চুক্তি অনুযায়ী টাকা দিতেই হচ্ছে এবং হবে। অথচ জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের সময় অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোই যায়নি। অথচ প্রতি ইউনিট বেশি দামে বিক্রি, ক্যাপাসিটি চার্জ, আমদানিতে শুল্ক ছাড়া, সহজ সুদে ব্যাংক ঋণসুবিধা, জমি ক্রয়ে সুবিধা-কী পায়নি তারা!

৩. ওপেক, ওপেক প্লাস দেশগুলো থেকে তেল ও গ্যাস কেনার বড় ও স্থায়ী সরবরাহ চুক্তি নেই। বড় তেল উৎপাদনকারী নয় এমন দেশ, যেমন চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি। অর্থাৎ জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে।

এখন কেউ চাইলেও এসব জঞ্জাল সরানো এবং বিদ্যুৎ খাতে নতুন বিনিয়োগ আনা কষ্টের বিষয় হবে। শ খানেক অযৌক্তিক অন্যায্য শর্তের (বাজেট ড্রেনিং) বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি বাদ দিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, সঞ্চালন ও বিতরণে বিনিয়োগ করা, সবুজ বিদ্যুৎ বিনিয়োগ আনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম অটোমেটেড করতে বিনিয়োগ আনা চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ অবকাঠামোগত বিনিয়োগ কিন্তু করা হয়েছে ভুল জায়গায় ও ভুল হাতে।

৪. মোট আমদানির ৫০ শতাংশ স্পট মার্কেট থেকে কেনার সিদ্ধান্তটি কমিশনবান্ধব ও বাজে সিদ্ধান্ত। দুঃখজনকভাবে ভাগ-বাঁটোয়ারার সুবিধার জন্য দেশের জ্বালানিনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে। অথচ জ্বালানির নিরাপত্তার বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এর জন্য বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো নিয়মিত যুদ্ধবিগ্রহে জড়াতে পর্যন্ত দ্বিধা করে না।

৫. কাতার ও ওমানের মতো দেশ বড় গ্যাস সরবরাহ চুক্তির কথা বলেছিল। কিন্তু সরকার সেটা করেনি। কেন? স্পট মার্কেটের কমিশন খাওয়ার লোভ ছাড়া এর পেছনে আর কোনো কারণ থাকতে পারে না। এখন কাতার, ওমানের গ্যাস পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে আবেদন জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা ইউরোপে গ্যাস বিক্রি শুরু করেছে, বাংলাদেশের তাই এখন এই দেশ দুটি থেকে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এদিকে সমুদ্রসীমা জয়ের ১০ বছর হতে চললেও সমুদ্রের কোনো ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধান করেনি, যদিও যৌথ ব্লকের ওপারে মিয়ানমার গ্যাস পেয়েছে। সব ক্ষেত্রে পরিকল্পনাহীনতা ও ভাগ-বাঁটোয়ারার আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট।

এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ৮৯ ডলার। কিন্তু ডলার-সংকটে সরকার তেল-গ্যাস কিনতে পারছে না। বিদ্যমান সরবরাহ চুক্তিগুলো ছোট বলে জ্বালানি ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। স্পট মার্কেটের দাম আন্তর্জাতিক বাজারদর থেকে এবং বাড়তি কমিশনের কারণে এখান থেকে কেনায় খরচ অনেক বেশি পড়ে। অথচ হাতে ডলার নেই, এক বছরে আমদানি ও রপ্তানির ঘাটতি অন্তত ৩৩ বিলিয়ন ডলার।

সরকার অপেক্ষা করছে শীতের জন্য, তখন বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকভাবে কমে আসে। কিন্তু শীতে যদি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ভয়াবহ অবস্থায় যায়, মন্দার ভয়ে ওপেক রাষ্ট্রগুলো তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তাহলে তেলের দাম না-ও কমতে পারে। মন্দার কারণে প্রবাসী আয় কমলে ডলার-সংকটও বাড়বে। ফলে শীত এলেই যে বিদ্যুতের সংকট চলে যাবে, তেমন ভাবার নিশ্চিত কারণ নেই। হ্যাঁ, পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হবে। এটা সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। বরং ভয় হয় মার্চ-এপ্রিলে আবার যখন গরম ফিরবে, তখন কী হবে?

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি কিনতে না পেরে, জ্বালানি কম কিনে ডলার সাশ্রয় করতে শুরু করছে, পরিকল্পিত লোডশেডিং। লোডশেডিং শুরু হয়েছে এক ঘণ্টা দিয়ে, এখন চার-ছয় ঘণ্টায় পৌঁছেছে।

লোডশেডিং করতে গিয়ে দেখা গেল, বিদ্যুৎ গ্রিড স্মার্ট নয়। অটোমেশন না করে সেখানেও চুরি এবং পরিকল্পনাহীন কাজ হয়েছে। শ খানেক বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাজার হাজার সাবস্টেশন স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণের স্ক্যাডা সেন্টারে সংযুক্ত নেই, অর্থাৎ অটোমেশনে নেই। পুরোনো সমস্যা ছিল গ্রীষ্মে প্রায় ২০ হাজার ট্রান্সফরমার ওভারলোডেড ছিল!

ফলে দূরনিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোড কমানো যায় না; বরং ফোনে নির্দেশ দিয়ে হাতে লোডশেড করতে হয়। এ রকম ‘ম্যানুয়াল’ লোডশেডের সঙ্গে উৎপাদনও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। বেসরকারি বহু কেন্দ্র স্ক্যাডা ও লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারে সংযুক্ত নেই বলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ ও সচল করা যায় না। সমস্যা বহুমুখী, এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিড বিপর্যয় হয়ে গেছে এক বছরে দুবার।

বিএনপির সময়ে বিনিয়োগ না পেয়ে নীতিগত ভুলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যায়নি, কিন্তু পল্লী বিদ্যুতের মাধ্যমে গ্রামে সঞ্চালন বাড়িয়ে শহরে লোডশেডিং তীব্র করেছে। মানুষ বিএনপির আমলের সেই ‘খাম্বা’ (মেসার্স খাম্বা লিমিটেড) নিয়ে ব্যাপক গালাগালি ও ট্রল করেছে।

আওয়ামী লীগের ১৪ বছরে প্রাথমিক জ্বালানি পরিকল্পনা ঠিক না করে, বিতরণ ঠিকঠাক না বাড়িয়ে, সঞ্চালনে ভুল পরিকল্পনা করে, সমন্বয়হীন উৎপাদন বাড়ানোর নামে অর্থ লোপাটের মহা আয়োজন হয়েছে। চলমান অর্থবছরেও উৎপাদনে বিদ্যুৎ বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ বিপরীতে বিতরণে ২০ শতাংশ। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার গেছে উৎপাদনের নামে, কিন্তু প্রাথমিক জ্বালানি কীভাবে আসবে, তার কোনো চিন্তা ছিল না। করা হয়নি সবুজ বিদ্যুৎ পরিকল্পনাও।

২০০৬ থেকে ২০২২-১৬ বছরে বিদ্যুতের ‘জড়’ খাম্বাগুলোর অভিজ্ঞতা একই। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের অভাবে খাম্বায় ঝোলানো তারে বিদ্যুৎ ছিল না দিনের পাঁচ-ছয়-সাত ঘণ্টা, এখন জ্বালানি তেল গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ থাকে না চার-ছয় ঘণ্টা। উৎপাদনের বিপরীতে সঞ্চালন, সঞ্চালনের বিপরীতে বিতরণের পরিকল্পনাহীনতার কী করুণ ব্যবস্থা! বাংলাদেশের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অযোগ্যতার কী দীর্ঘ মিছিল!

বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা কোনোকালেই টেকসই ছিল না। সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের পর বিদ্যুৎ আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় শীর্ষ উন্নয়ন ব্যয়ের খাত হলেও এই খাতকে টেকসই করা যায়নি। বরং কিছু অতি ধনী ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি করেছে। চুক্তির ফাঁকে ও ফাঁদে আটক দেখিয়ে আদতে আওয়ামী লীগের লোকেরাই কৌশলে সরকারের বাজেট-সংকট তৈরি করেছে। সব মিলে যা দেখা যায়, তার চেয়েও বাস্তব সংকটের গভীরতা বেশি। সেগুলো হলো :

ক. তেল-গ্যাস আমদানির বড় ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চুক্তি নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ জ্বালানিনিরাপত্তা হুমকিতে।

খ. আমদানি ও রপ্তানির ঘাটতি মাত্রাতিরিক্ত বলে প্রাথমিক জ্বালানি কেনার পর্যাপ্ত ডলার নেই।

গ. সবুজ জ্বালানি মাত্র ৪ শতাংশ।

ঘ. সাগরের মীমাংসিত ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের আয়োজন নেই। সরকার নিজের করা টেন্ডার বাতিল করেছে।

ঙ. বিশাল বিনিয়োগসাপেক্ষ বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা সেকেলে।

চ. গভীর সমুদ্র বন্দর হিসেবে পায়রা কার্যকর নয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে আসতে বহু সময় লাগবে বলে সেখানকার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্বল্প ব্যবহৃত থাকবে। উপরন্তু সেসব লোড সেন্টার থেকে বহু দূরে বলে সঞ্চালন লাইনের পেছনে বিশাল অর্থ চলে গেছে। রূপপুরও লোড সেন্টার থেকে দূরে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে শিল্প স্থাপন ও লোড তৈরির পরিকল্পনা সমন্বিত করা যায়নি বা হয়নি। অনেকগুলো পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে, যেগুলা নন-ফাংশনাল, কিন্তু সেখানে সঞ্চালনব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা আছে। অর্থাৎ বিশাল বিশাল বিনিয়োগের রিটার্ন নগণ্য।

ছ. আরও দুটি অদৃশ্য কিন্তু গভীর সমস্যা হচ্ছে, জ্বালানি অদক্ষতার সমস্যা (অতি নিম্ন প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ও প্ল্যান্ট ইফিসিয়েন্সি)। অন্তত ৩০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকতে পারে, যেগুলার জ্বালানি দক্ষতা ৩০ শতাংশের কম, অর্থাৎ অনেক বেশি জ্বালানি পুড়ে খুব কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। বহু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর কম বলে একটানা সচল থাকতে পারে না। বড় সমস্যা ক্যাপটিভ। শিল্পবিদ্যুতের দাম বেশি বলে ব্যক্তিমালিকানায় চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে।

সার্টিফিকেট অরিজিন নকল করে মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশ থেকে আনা মেয়াদোত্তীর্ণ ও চরম জ্বালানি অদক্ষ এসব প্ল্যান্ট বিদ্যুৎ খাতের গলার ফাঁস। দেশে লোডশেডিং যত বাড়বে, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র তত বেশি চলবে, ততই জ্বালানি অপচয়ের সমস্যাও প্রকট হবে।

জ. জাতীয় গ্রিড স্মার্ট নয়। স্ক্যাডা পুরোনো। তাহলে অর্জন কী! অর্জন হচ্ছে ভুলভাল ও মিথ্যা সক্ষমতার কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থাৎ হার্ডওয়্যার। যেগুলো তেলের অভাবে বন্ধ, সেগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে দেখানো। বসে থেকেও যারা রাষ্ট্রের অর্থ লুটে নিচ্ছে।

ঝ. শেষের সমস্যা হচ্ছে, এসব চুক্তির জঞ্জাল সরানো। এসব অযৌক্তিক ও অন্যায্য লুটেরা চুক্তি গলার কাঁটা। এখন কেউ চাইলেও এসব জঞ্জাল সরানো এবং বিদ্যুৎ খাতে নতুন বিনিয়োগ আনা কষ্টের বিষয় হবে। শ খানেক অযৌক্তিক অন্যায্য শর্তের (বাজেট ড্রেনিং) বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি বাদ দিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, সঞ্চালন ও বিতরণে বিনিয়োগ করা, সবুজ বিদ্যুৎ বিনিয়োগ আনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম অটোমেটেড করতে বিনিয়োগ আনা চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ অবকাঠামোগত বিনিয়োগ কিন্তু করা হয়েছে ভুল জায়গায় ও ভুল হাতে।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তড়িৎ প্রকৌশলী, বুয়েট। টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক। গ্রন্থকার: চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ; বাংলাদেশ: অর্থনীতির ৫০ বছর; অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অভাবিত কথামালা; বাংলাদেশের পানি, পরিবেশ ও বর্জ্য। [email protected]