চলতি সপ্তাহে বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছেন। সম্মেলনে সংস্থাটি ইরানের ওপর সামরিক হামলার নিন্দা করেছে। এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সংঘাত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে সংস্থাটি ইরানকে সামরিকভাবে রক্ষার কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। রাজনৈতিক সংহতি আর সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নিশ্চয়তা এক বিষয় নয়। ইরানের এ অভিজ্ঞতা শুধু সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সীমাবদ্ধতাই নয়, গড়ে উঠতে থাকা নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ধরনও স্পষ্ট করে।
বহু বছর ধরে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে এমন ধারণা ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চীন, রাশিয়া এবং ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো সংগঠনকেন্দ্রিক একটি বিকল্প ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করবে। মধ্যম শক্তির দেশগুলোর কাছে এসব প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়া তাই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। ধারণা ছিল, পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে সম্পর্ক বাড়ালে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ ও বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি কমবে।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দেখিয়েছে, এসব সম্পর্ক আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের মতো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। এর অর্থ বহুমেরুব্যবস্থা মধ্যম শক্তির জন্য ব্যর্থ হয়েছে, তা নয়; বরং নতুন ব্যবস্থাটি প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্নভাবে গড়ে উঠছে।
ফলে বহুমেরু বিশ্বে মধ্যম ও ছোট দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ছে। তারা পাচ্ছে বেশি অংশীদার, বেশি দর-কষাকষির সুযোগ এবং ‘না’ বলার বেশি স্বাধীনতা। কিন্তু বিপদের সময় সুরক্ষার জন্য সাহায্য চাইলে কে পাশে দাঁড়াবে, সে নিশ্চয়তা আগের চেয়ে কম।
একটি জোটের জায়গায় আরেকটি জোট তৈরি হওয়ার বদলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত নানা ধরনের অংশীদারত্ব তৈরি হচ্ছে। এতে দেশগুলোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকল্প বাড়ছে। কিন্তু নিরাপত্তার সংকটে কে তাদের পাশে দাঁড়াবে, সে নিশ্চয়তা বাড়ছে না। অর্থাৎ মধ্যম শক্তির দেশগুলোর চলাফেরার সুযোগ বাড়ছে, কিন্তু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কমছে।
তুরস্ক এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটি সাত দশকের বেশি সময় ধরে ন্যাটোর সদস্য এবং পশ্চিমা নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ। তবু আঙ্কারা দেখিয়েছে, কোনো সামরিক জোটের সদস্য হওয়া মানেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় সংলাপের অংশীদার হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
এর অর্থ তুরস্ক ন্যাটো ছেড়ে চীন বা রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন কোনো জোটে যাচ্ছে না। বরং তার কৌশল হলো কোনো একটি পক্ষকে এককভাবে বেছে না নেওয়া। ন্যাটো তাকে যে নিরাপত্তাসুবিধা দেয়, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা তা দিতে পারে না। আবার রাশিয়া, চীন, ইরান, উপসাগরীয় দেশসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তুরস্কের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকল্প বাড়িয়েছে।
ব্রাজিলও একই ধরনের উদাহরণ। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে নেই। তবে ঐতিহাসিকভাবে এমন একটি অঞ্চলে কাজ করেছে, যেখানে ওয়াশিংটন আঞ্চলিক সরকারগুলোর কাছ থেকে যথেষ্ট রাজনৈতিক সমর্থন আশা করে। ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আমেরিকা মহাদেশের কাউন্টার-কার্টেল জোটে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইরানের যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংকটেও দেশটির অবস্থান দেখিয়েছে, আঞ্চলিক নৈকট্য মানেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সঙ্গে একমত হওয়া নয়।
তবে ব্রাজিলও পক্ষ বদল করছে না। ব্রিকসে অংশগ্রহণ, চীনের সঙ্গে বিস্তৃত অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সংস্কারের দাবির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও তার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ব্রাসিলিয়ার লক্ষ্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতার বদলে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়া নয়; বরং উভয়ের সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজন হলে উভয়ের সঙ্গেই মতভেদ প্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখা।
ভারত এ কৌশলকে আরও স্পষ্টভাবে অনুসরণ করছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোয়াডের সদস্য। একই সঙ্গে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থারও সদস্য। বিশকেকের সম্মেলনে ভারত ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে ঘোষণাকে সমর্থন করেছে। আবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনায় হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নৌ চলাচল ও বাণিজ্যের স্বাধীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্যদেশগুলোও একই ধরনের বৈচিত্র্য আনছে। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। একই সঙ্গে তারা চীন, ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে এবং নতুন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। তারা ওয়াশিংটনের জায়গায় বেইজিংকে বসাতে চায় না। উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে চায়।
বহুমেরু বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুযোগ এখানেই। বিকল্প শক্তির কেন্দ্র যত বাড়ছে, কোনো একটি পরাশক্তিকে ‘না’ বলার ঝুঁকি তত কমছে। একটি দেশ ওয়াশিংটনের সঙ্গে মতবিরোধ হলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে পারে, চীনের মিত্র না হয়েও। আবার চীনের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক বাড়াতে পারে, সেটা ওয়াশিংটনের সব নীতি মেনে না নিয়েও। ব্রিকসের সদস্য হওয়া পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার পথে বাধা নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হওয়াও চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের পথে বাধা নয়।
তবে এই স্বাধীনতার মূল্য আছে। পক্ষ বেছে না নেওয়ার সুযোগ বাড়লেও অস্তিত্বের সংকটে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কমে যায়। ব্রিকসের কোনো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাও নিজেকে অসামরিক সংগঠন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। কৌশলগত অংশীদারত্ব অস্ত্র, বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সমর্থন ও রাজনৈতিক সহযোগিতা দিতে পারে। কিন্তু একে অপরের হয়ে যুদ্ধে নামার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।
তাই নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব থেকে সরাসরি চীনের নেতৃত্বাধীন বিশ্বে রূপ নেবে—এমন সম্ভাবনা কম। আবার এটি দুটি স্পষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী জোটেও বিভক্ত হবে না। ন্যাটো এখনো ইউরোপ ও তুরস্কের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্পর্ক অপরিহার্য। এর পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বেছে নেওয়া অংশীদারত্ব এবং প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক।
ফলে বহুমেরু বিশ্বে মধ্যম ও ছোট দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ছে। তারা পাচ্ছে বেশি অংশীদার, বেশি দর-কষাকষির সুযোগ এবং ‘না’ বলার বেশি স্বাধীনতা। কিন্তু বিপদের সময় সুরক্ষার জন্য সাহায্য চাইলে কে পাশে দাঁড়াবে, সে নিশ্চয়তা আগের চেয়ে কম।
● লুসিয়ানো জাকারিয়া কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপসাগরীয় অধ্যয়ন কেন্দ্রে উপসাগরীয় রাজনীতির অধ্যাপক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত