চব্বিশের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর নতুন করে কিছু প্রশ্ন সামনে আসতে শুরু করেছে। কেউ কেউ মুখের ভাষায় ‘ন্যায়বিচার’ শব্দের বদলে ‘ইনসাফ’, ‘ব্যবস্থা’র বদলে ‘বন্দোবস্ত’, ‘মীমাংসা’র বদলে ‘ফয়সালা’ ইত্যাদি ব্যবহার শুরু করেছেন। এ রকম প্রয়োগ ভাষার চেহারা বদলে দিতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন অনেকেই। বলছেন, বাংলা ভাষার ‘নিজস্ব’ শব্দ থাকতে এ রকম আরোপণ বা সংযোজন কেন? এ নিয়ে নানা আলোচনা–সমালোচনা দেখা গেছে।
আবার যদি বলি, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের দাবি থেকে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয়, এটা মেনে নিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে যদি ইংরেজি মিডিয়াম, ইংরেজি ভার্সন আর মাদ্রাসাশিক্ষা সবই সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে একীভূত করা হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে? এভাবে আর্থিক বৈষম্য অথবা ভাষা-আধিপত্য কি রোধ করা সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তবে তা করা ঠিক হবে কি না।
আরেকটা প্রশ্ন বেশ পুরোনো, জেন-জি সেটা নতুন করে উসকে দিয়েছে। এই প্রজন্ম মুখের কথায় প্রমিত ভাষা ব্যবহার করে না। আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কথা বলার সময়েও তারা সেটা করে না অথবা পারে না। এই সচেতন বা অসচেতন প্রয়াস কি বাংলা ভাষার ‘বিকৃতি’ ত্বরান্বিত করছে? সে ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?
এসব প্রশ্ন এবং আরও অনেক প্রশ্ন শাখা-প্রশাখা নিয়ে এই সমাজেই, রাষ্ট্রের ভেতরে বিরাজ করছে। প্রশ্নের পাশাপাশি আছে দীর্ঘশ্বাস—চলতি সময় আর নতুন প্রজন্মকে নিয়ে। এখন সময় ভালো না; আর এই প্রজন্ম বই পড়ে না, পত্রিকা পড়ে না, মোবাইলে ইংরেজি হরফে বাংলা চ্যাট করে, ফেসবুকে ‘অশুদ্ধ’ ভাষায় পোস্ট-কমেন্ট করে। এরা বাংলা ভাষার ‘শুদ্ধ’ ব্যবহার জানে না, এদের হাতে বাংলা ‘নিরাপদ’ নয়!
এসব প্রশ্ন আর দীর্ঘশ্বাসের জবাব খুঁজতে পাকিস্তান পর্বে যাওয়া যাক। পূর্ব বাংলার সরকার ১৯৪৯ সালে বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে ‘ইস্ট বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটি প্রস্তাব করেছিল, নবগঠিত ‘মুসলিম’ রাষ্ট্রে জন্ম-জন্মান্তর শব্দের বদলে কিয়ামত, ঋণ শব্দের বদলে কর্জ, বিস্ময়ের বদলে তাজ্জব—এ রকম ‘মুসলমানি’ শব্দ ব্যবহার করতে হবে। ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হলে মুনীর চৌধুরী আপত্তি তুলে বলেন, ‘যাঁরা ভাষাতত্ত্বে অনভিজ্ঞ, ব্যাকরণের মর্মোদ্ধারে অনভ্যস্ত, অভিধানে অনাস্থাবাদী’, তাঁরাই এ রকম সংস্কারের সুপারিশ করেছেন। হুমায়ুন আজাদ পরে একে ‘বাঙালি জাতিসত্তাকে পর্যুদস্ত করার চক্রান্ত’ হিসেবে মন্তব্য করেন।
মুখের ভাষার বিকৃতি বা লেখার অপপ্রয়োগ বাংলা ভাষার মূল সংকট নয়; প্রকৃত হুমকি হলো প্রযুক্তিতে এর ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াতে ব্যর্থতা। এ কাজে দেরি হলে ভাষার পরিসর সংকুচিত হবে। প্রয়োজন দক্ষ ভাষাবিদ ও ভাষাদক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগগুলোকে সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি ভাষাপ্রযুক্তি ও প্রয়োগভিত্তিক দক্ষতায় জোর দিতে হবে।
যেকোনো ভাষায় একই ধরনের অর্থ প্রকাশক একাধিক শব্দ থাকে। যেমন বাংলা ভাষায় মীমাংসা, নিষ্পত্তি, ফয়সালা বা মিটমাটের অর্থ প্রায় একই। কিংবা এই ভাষায় ‘ন্যায়বিচার’, ‘ইনসাফ’, ‘জাস্টিস’ প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার যে ‘বন্দোবস্ত’ শব্দটি এখন নতুন অভিপ্রায়ে ব্যবহার শুরু হয়েছে, তার প্রয়োগ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ও আগে থেকে ছিল। নতুন করে শব্দ ব্যবহারের এই ধরন যতটা না ভাষার ব্যাপার, তার চেয়ে বেশি জাতিগত স্বাতন্ত্র্য কিংবা রাজনৈতিক ভেদের ব্যাপার। এটা ভাষিক বিকৃতি নয়—এটা নিয়ে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা করারও কিছু নেই। তবে এ ধরনের কৃত্রিম ও আরোপিত উদ্যোগ ভাষার মূল কাঠামো মেনে নেয় না; কেননা তা স্বতঃস্ফূর্ত নয় এবং ভাষা ব্যবহারকারীর বড় অংশ এর বাইরেই থেকে যায়।
নতুন শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা অনেক সময় ভাষার চেয়ে বেশি জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। এটি ভাষিক বিকৃতি নয়। এ নিয়ে অযথা আতঙ্কের কারণও নেই। তবে কৃত্রিম ও আরোপিত উদ্যোগ ভাষার স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, ভাষা শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীর সম্মিলিত চর্চায় টিকে থাকে।
পরের প্রশ্ন বৈষম্যের ধারণার সঙ্গে ভাষা-অধিকার ও ভাষা-আধিপত্যের সম্পর্কের। একটি রাষ্ট্রে বহু ভাষা বিদ্যমান থাকতে পারে, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বহু ভাষার সুযোগ রাখাটাও রাষ্ট্রের পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে শিশু প্রথম স্কুলে যায়, তার শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটা ভাষা-অধিকারের প্রশ্নে রীতিমতো অপরাধ ও ইনজাস্টিস। তবে এটা ঠিক, বহুমুখী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষাকাঠামো রাষ্ট্রব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ায়। শিক্ষার্থীর জন্য বিকল্প মাধ্যম বা ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ শিক্ষাস্তরের কোন পর্বে রাখা হবে, সেটি নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।
এবার আসা যাক উচ্চারণের প্রশ্নে। তরুণ প্রজন্মের প্রমিত উচ্চারণ নিয়ে যে হতাশা, তা অন্তত দুই দশক আগের। ভালো কথা, কিন্তু প্রমিত ভাষার সঙ্গে
তাদের যোগাযোগ ঘটাবে কে? একটি শিশু স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরপরই পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে প্রমিত লিখিত ভাষায় প্রবেশ করে, অথচ তার মুখের ভাষা অপ্রমিতই রয়ে যায়। এ ব্যাপারে না আছে পাঠ্যবইয়ের ভূমিকা, না আছে শিক্ষকের প্রয়াস। পরিবার ও সমাজে তো বটেই, এমনকি আনুষ্ঠানিক-প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও মানুষ এখন ভাষার অপ্রমিত রূপে অবলীলায় কথা বলে যায়। মুখের ভাষাকে যদি প্রমিত করতে হয়, তবে এর দায়িত্ব স্কুলপাঠ্য বাংলা বই এবং শ্রেণিকক্ষে বাংলা শিক্ষককেই নিতে হবে।
শেষ প্রশ্নটি প্রযুক্তিনির্ভর সময়কে ঘিরে। নতুন প্রজন্ম কাগজের পত্রিকার বদলে অনলাইনে সংবাদ পড়ে, টেলিভিশনের বদলে ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। এতে হুমকি কোথায়?
বিশ্বের বড় ভাষাগুলোও ইংরেজির প্রভাব অস্বীকার করতে পারেনি। ইংরেজিকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে লাভ নেই; প্রয়োজন বাংলাকে প্রযুক্তিসক্ষম করা। অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াতে হবে। মুখের ভাষাকে লেখায় ও লেখাকে কথায় রূপান্তরের প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে বটে, কিন্তু ব্যবহার সীমিত। মানসম্মত ডিজিটাল অভিধান নেই, অনুবাদব্যবস্থা মসৃণ নয়, ভাষা সম্পাদনার কার্যকর অ্যাপসের অভাব রয়েছে। ফন্ট রূপান্তরেও জটিলতা রয়ে গেছে।
প্রযুক্তিতে বাংলা অক্ষর যুক্ত হতে বিলম্ব হওয়ায় এখনো অনেকে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখেন। পরিভাষা উন্নয়নের ঘাটতিতেও যন্ত্রের নির্দেশিকায় ইংরেজির আধিপত্য বজায় রয়েছে। বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক করতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোই মুখ্য কাজ।
কাগজের বই পাঠক হারালে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পাঠযন্ত্রকে সহজলভ্য করতে হবে। প্রকাশনা সংস্থাগুলো নিজেদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে ডিজিটাল বই সরবরাহের উদ্যোগ নিতে পারে।
মুখের ভাষার বিকৃতি বা লেখার অপপ্রয়োগ বাংলা ভাষার মূল সংকট নয়; প্রকৃত হুমকি হলো প্রযুক্তিতে এর ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াতে ব্যর্থতা। এ কাজে দেরি হলে ভাষার পরিসর সংকুচিত হবে। প্রয়োজন দক্ষ ভাষাবিদ ও ভাষাদক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগগুলোকে সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি ভাষাপ্রযুক্তি ও প্রয়োগভিত্তিক দক্ষতায় জোর দিতে হবে।
এর সঙ্গে মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তসংস্কৃতির চর্চাও জরুরি। তুর্কি, হিন্দি, ইংরেজি, ফারসি, কোরিয়ানসহ নানা ভাষার নাটক ও চলচ্চিত্র বিশ্বজুড়ে দেখা হচ্ছে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাই ভাষার শক্তি বাড়ায়। ভাষার স্বার্থেই নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিমনা করে তোলা এখন সময়ের দাবি।
● তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
