মধ্যপ্রাচ্যে ‘পুলিশ’ হয়ে ফিরল যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র আবার মধ্যপ্রাচ্যে ফিরেছে। এবারকার প্রেক্ষাপট গাজায় গণহত্যা। ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা এখন পুলিশের ভূমিকায়। বাইডেন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকে সতর্ক করেছে যেন তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্রকে কেউ আঘাত করতে না পারে। ইসরায়েলকে রক্ষায় দুটি রণতরিও মোতায়েন করেছেন বাইডেন। এটুকু করেই ক্ষান্ত হয়নি বাইডেন প্রশাসন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এই বার্তা মধ্যপ্রাচ্যের সব অংশীজনকে জানিয়ে দিয়েছেন।

মার্কিন রাষ্ট্রদূতেরা ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলাকে আইএসএলের বর্বরতার সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁরা বলেন, এই হামলার কোনো কূটনৈতিক সমাধান নেই, একমাত্র বিকল্প সামরিক অভিযান। আইএসএলের প্রসঙ্গ তুলে তাঁরা আসলে ইসরায়েলকে একটা দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জুগিয়েছেন। বাইডেন প্রশাসন আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে আনা বা যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব, তা প্রত্যাখ্যান করেছে। যার অর্থ দাঁড়ায়, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের এই কুকর্মের সহযোগী।

অবশ্য মার্কিনদের চাপে আরব লিগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কায়রোতে একটি জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে মৃদু ভাষায় দুই পক্ষের বেসামরিক জনগণকে নিশানা করে হামলার নিন্দা জানিয়ে তাঁরা একটি বিবৃতিও দেন। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক আছে, এমন আরব দেশগুলোর একটিও ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করা বা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ প্রক্রিয়া বাতিল করা বা দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। যদিও ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরবের মানুষের অবস্থান একেবারে তঁাদের সরকারগুলোর বিপরীতে। যেখানেই সমাবেশের অনুমতি পাচ্ছেন মানুষ, সেখানেই ফিলিস্তিনের পক্ষে জমায়েত করছেন তাঁরা।

ইসরায়েলের দখলদারির বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনকে সমর্থন আরবের মানুষের কাছে সামগ্রিকভাবে অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান। কিন্তু বাইডেন প্রশাসন এ বাস্তবতা বুঝতে পারছে না। ব্লিঙ্কেন আরবে তাঁর অংশীদারদের মধ্যে যাঁর যাঁর সঙ্গে হামাসের যোগাযোগ আছে, তাঁদের কাজে লাগিয়ে জিম্মি মুক্তির চেষ্টা করেছেন বারবার। আরও অযৌক্তিক বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গাজার বেসামরিক জনগণের কথা এতটুকুও না ভেবে চিরদিনের জন্য হামাসকে ধ্বংসের অঙ্গীকার করে বসে আছে।

গাজায় বোমা হামলার সাত দিন পরও যুক্তরাষ্ট্র একবারও সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট নিয়ে টুঁ শব্দও করেনি। একবার শুধু বলেছে, হামাস বেসামরিক জনগণকে নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। আরব নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মাত্র একবার ব্লিঙ্কেন অস্পষ্টভাবে মানবিক সহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

ইসরায়েল স্থল অভিযান শুরুর আগে ১০ লাখের ওপর গাজাবাসীকে গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বলে। বাইডেন প্রশাসনও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মিসরের সিনাই উপত্যকায় মানবিক সাহায্যের জন্য একটি গলিপথ বের করে দেওয়ার কথা তোলে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা, যাঁরা স্থানান্তরের যন্ত্রণায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম জ্বলছেন, তাঁদের জন্য এই গলিপথ একটি ভীতিকর শব্দ। এর অর্থ আবারও জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে মিসরের সিনাইতে গিয়ে শরণার্থীজীবন বেছে নেওয়া। আবারও তাঁবুতে বসবাস করা।

আরব দেশগুলো এ প্রস্তাবে সায় না দেওয়ায় ব্লিঙ্কেন এবার ঘুরপথ ধরেন। তিনি গাজার ভেতরই নিরাপদ কোনো জায়গায় বাস্তুচ্যুত মানুষকে ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে সরে যেতে বলেন। এতে গাজার বাসিন্দারা আবারও তাঁদের বাসস্থান হারানোর শঙ্কায় পড়েন। দ্রুতই অবশ্য গাজার লোকজন পরে সীমান্তের দিকে ছোটেন। ইসরায়েলের সামগ্রিক অবরোধের মুখে খাবার আর আশ্রয়ের খোঁজে এসব মানুষকে বাড়ি ছাড়তে হয়। মিসরের হাতেও বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীকে প্রবেশ করতে দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

অদ্ভুত ঘটনা হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদিও ইসরায়েলকে শর্তহীন সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, অথচ তাদের সমর পরিকল্পনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানে না। সে কারণেই আমরা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে রোববার বলতে শুনলাম, ইসরায়েল যদি গাজা দখল করে, তা হবে বিরাট ভুল। কিন্তু যুদ্ধের তীব্রতা কমানো বা যুদ্ধবিরতির বদলে যুক্তরাষ্ট্র দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো হামাসকে নির্মূলের নামে দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি নাকবা বা বিপর্যয়ের আয়োজনে উসকানি দিয়েছে। এই সবকিছুই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সহিংসতা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শত্রু মনোভাব আরও জোরালো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রকে যদি আঞ্চলিক বিষয়ে কথা বলতেই হয়, তাহলে তারা শান্তি ও ন্যায্যতার পক্ষে দাঁড়াক, ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ বা গণহত্যার পক্ষে নয়।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

  • মারওয়ান বিশারা আল–জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক