বাংলাদেশ এখন গণমাধ্যম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রস্তাবিত সম্প্রচার অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৬ সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। এই দুটি খসড়া আইন থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সরকার একটি পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই করতে চায়। বাস্তবতা হলো, গণমাধ্যমের জগৎ আইনের চেয়ে অনেক দ্রুত বদলে গেছে।
এই উদ্যোগ স্বীকৃতির দাবিদার। আজকের দিনে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ আর শুধু টেলিভিশন চ্যানেল বা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন সাংবাদিকতা এবং সম্প্রচারের নতুন মিশ্র রূপ তথ্যের প্রবাহের ধরনই বদলে দিয়েছে। সারা বিশ্বের সরকারই এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। বরং বলা যায়, এমন এক সময়ে এই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যখন অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
তাই মূল প্রশ্ন সংস্কার দরকার কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এই সংস্কার কি যথেষ্ট যত্ন নিয়ে করা হচ্ছে, যাতে তা দীর্ঘদিন কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য থাকে। খসড়া আইনগুলোর ভেতরে একাধিক ইতিবাচক দিক আছে। বিচ্ছিন্ন ও অনানুষ্ঠানিক তদারকি থেকে সরে এসে কমিশনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দিকে যাওয়া একটি বড় পরিবর্তন। এতে অনিশ্চয়তার জায়গায় প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা আসে। পেশাগত মান, নৈতিক আচরণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দেওয়াও দেখায়, এখানে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, গণমাধ্যমের মান নিয়েও ভাবা হয়েছে। ডিজিটাল ও অনলাইন গণমাধ্যমকে আলোচনায় আনার সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয়, নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারছেন যে অ্যানালগ যুগে আটকে থাকলে চলবে না।
কিছু যত্নশীল পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি গণমাধ্যম শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যা দৃঢ়, ন্যায্য এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত। এই ভারসাম্য রক্ষা করা আইন পাস করার চেয়ে কঠিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সেটিই।
এই পদক্ষেপগুলো ছোট নয়। এগুলো একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু ভিত্তি শক্ত হলেই কাজ শেষ হয় না। ওপরের কাঠামোটি কেমন হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই খসড়া আইনগুলোর একটি বড় দুর্বলতা চোখে পড়ে। সেটি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন। সংবিধানে দেওয়া বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা খসড়াগুলোতে উল্লেখ আছে, কিন্তু তা মূলত আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে। নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এই স্বাধীনতাকে কীভাবে বিবেচনায় নিতে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
বাস্তবে কার্যকর গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ কিছু মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আইন পরিষ্কারভাবে অনুমতি দিলে তবেই হস্তক্ষেপ করা হয়। প্রকৃত জনস্বার্থ থাকলে তবেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আর যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই করা হয়। যুক্তরাজ্যের মতো দেশে এই যুক্তির ভিত্তিতেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর ওপর সীমা দেওয়া হয়, আবার একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও সুরক্ষিত থাকে।
এই নীতিগুলো যদি আইনের কার্যকর ধারাগুলোতেই স্পষ্টভাবে লেখা থাকে, তাহলে সবার উপকার হয়। সাংবাদিকেরা অযথা হস্তক্ষেপের আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে পড়ে না। সরকারও আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে পারে। এতে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় না, বরং আরও স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রশ্নেও সতর্কতা দরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সম্প্রচার কমিশন ও জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনকে প্রায় একই ধরনের বহু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স দেওয়া, বিষয়বস্তু তদারকি, নৈতিকতা দেখা, বিরোধ মীমাংসা এবং নির্দেশনা দেওয়া—সবই কাছাকাছি পরিসরে পড়ে। সমন্বয় প্রয়োজন, কিন্তু দায়িত্ব যদি অতিরিক্তভাবে মিশে যায়, তাহলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তখন বোঝা কঠিন হয় কে কোন সিদ্ধান্ত নেবে, দায় কার আর ক্ষমতার সীমা কোথায়। ইউরোপের বহু দেশে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ একভাবে হয় আর নৈতিকতা ও পেশাগত মানের বিষয়গুলো আলাদা কাঠামোতে দেখা হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। খসড়া আইনগুলোতে নিয়োগের নিয়ম আছে, তবে পুরো কাঠামো এখনো অনেকটাই নির্বাহী নির্ভর। এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, নির্দিষ্ট মেয়াদ, স্বচ্ছ নিয়োগনীতি এবং অপসারণের স্পষ্ট কারণ থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। যেসব নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিয়মভিত্তিক হিসেবে দেখা হয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক হিসেবে নয়, তারা সাধারণত বেশি সহযোগিতা পায়।
আইনি স্পষ্টতার প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। পেশাগত নৈতিকতা, দায়িত্বশীল আচরণ, জনস্বার্থ কিংবা সাংবাদিকতার মান—এসব শব্দ খসড়া আইনগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। নমনীয়তা দরকার, কিন্তু অতিরিক্ত অস্পষ্টতা ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে। ইউরোপের অনেক দেশ এই সমস্যার সমাধান করেছে আইনের সঙ্গে বিস্তারিত আচরণবিধি যুক্ত করে, যা পরামর্শের মাধ্যমে তৈরি হয় এবং সময়ের সঙ্গে হালনাগাদ করা যায়।
ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াও সমান জরুরি। প্রস্তাবিত কমিশনগুলো নির্দেশনা দিতে ও বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারবে, কিন্তু নোটিশ দেওয়া, বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ, সিদ্ধান্তের যুক্তি জানানো এবং আদালতে যাওয়ার অধিকার সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। এগুলো কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়। এগুলো ছাড়া নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘ মেয়াদে গ্রহণযোগ্য হয় না।
ডিজিটাল ও অনলাইন গণমাধ্যমের প্রশ্নটি সবচেয়ে সংবেদনশীল। ফ্রিকোয়েন্সি সীমিত বলে সম্প্রচারমাধ্যমে কড়া নিয়ন্ত্রণ যৌক্তিক হতে পারে। কিন্তু ইন্টারনেট ভিন্নভাবে চলে। তাই অনেক দেশ অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য তুলনামূলক হালকা নিয়ন্ত্রণ বেছে নিচ্ছে, যেখানে আগাম অনুমতির চেয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর জোর দেওয়া হয়। এই পার্থক্য খসড়া আইনগুলোতে আরও স্পষ্ট হলে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
এই লেখা সংস্কারের বিপক্ষে নয়। বরং সংস্কার যেন ঠিকভাবে করা হয়, সেই আহ্বানই এখানে মুখ্য। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে দেখানোর যে শক্ত নিয়ন্ত্রণ আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। কিছু যত্নশীল পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি গণমাধ্যম শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যা দৃঢ়, ন্যায্য এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত। এই ভারসাম্য রক্ষা করা আইন পাস করার চেয়ে কঠিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সেটিই।
রিজওয়ান-উল-আলম চেয়ারম্যান, মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
*মতামত লেখকের নিজস্ব