গত বছরের অক্টোবরেই বলেছিলাম, চীনের মিলিটারি কমিশনের তৎকালীন সহ-সভাপতিকে অপসারণের পর যদি আর জ্যেষ্ঠ কাউকে সরানো হয়, তাহলে তা চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির ভেতরে একটি গভীর সংকট সৃষ্টি করবে। সেই মুহূর্ত এখন এসে গেছে।
শুধু ঝাং ইউশিয়াই নন, পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএর চিফ অব স্টাফ লিউ ঝেনলিও পতিত হয়েছেন। দুজনের বিরুদ্ধেই আনা হয়েছে ‘গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আইনি লঙ্ঘন’-এর অভিযোগ। এই সংক্ষিপ্ত সরকারি ব্যাখ্যা আগের সব শুদ্ধি অভিযানের তুলনায় আলাদা।
আগে প্রতিবারই এমন তদন্তকে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু এবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেই পরিচিত বয়ান ব্যবহার করার প্রয়োজনই বোধ করেননি। এতে স্পষ্ট হয়ে গেছে, পিএলএর শীর্ষে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এতটাই গভীরে পৌঁছেছে যে তা আর যত্নসহকারে সাজানো দুর্নীতিবিরোধী গল্প দিয়ে ঢেকে রাখা যাচ্ছে না।
এই নাটকীয় ঘটনার পর সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে এখন কার্যত মাত্র দুজন সদস্য রয়েছেন। চেয়ারম্যান সি চিন পিং এবং সহসভাপতি ঝাং শেংমিন। ঝাং শেংমিন একজন পেশাদার রাজনৈতিক কমিশার (মতাদর্শিক পণ্ডিত)। তাঁর কার্যকর যুদ্ধ পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রায় নেই।
ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলির অপসারণের মধ্য দিয়ে পিএলএর সেই শেষ জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররাও সরে গেলেন, যাঁরা বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে মূলত মেধার ভিত্তিতে উঠে এসেছিলেন। ফলে পিএলএর পেশাদার নেতৃত্বের কেন্দ্রটাই যেন খালি হয়ে গেল। তাঁদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ ও সহযোগীরাও তদন্তের আওতায় পড়তে পারেন। এর ফলে আরও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল।
পিএলএর নেতৃত্বে এমন অস্থিরতা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ের পর আর দেখা যায়নি। তাই একটি প্রশ্ন এখন অত্যন্ত জরুরি। ঝাং ও লিউ কেন পতিত হলেন এবং এরপর কী ঘটতে পারে।
কারণ কী?
পিএলএর অস্বচ্ছ ও গোপন কাঠামোর কারণে ঝাং ও লিউয়ের পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা কঠিন। পুরো চিত্রটি হয়তো জানেন হাতে গোনা কয়েকজনই, যাঁরা তাঁদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবু সি চিন পিংয়ের শৈশবের পরিচিত ঝাং ইউশিয়ার অপসারণ স্বাভাবিকভাবে বিস্ময় জাগায়। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং পিএলএর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সির বিশ্বস্ত লোকদের প্রয়োজন ছিল।
লিউ ঝেনলির অপসারণও যুক্তির বাইরে মনে হয়। তিনি একজন অভিজ্ঞ যোদ্ধা, প্রচারবিমুখ কর্মকর্তা। যৌথ স্টাফ বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি পিএলএর সিফোরআইএসআর সক্ষমতার দায়িত্বে ছিলেন। আধুনিক যুদ্ধে এসব সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চ পেশাগত দক্ষতা ছাড়া এগুলো পরিচালনা সম্ভব নয়। এমন একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া পিএলএর প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
নিশ্চিত তথ্যের অভাবে সম্ভাব্য কারণগুলো বাদ দেওয়ার পদ্ধতিতে দেখা যেতে পারে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আরেকটি লেখায় আমি পিএলএতে শুদ্ধি অভিযানের পাঁচটি বিশ্লেষণী দিক চিহ্নিত করেছিলাম। সেগুলো হলো দুর্নীতি, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, বয়স্ক শাসকের মানসিকতা, সীমিত সামরিক অভিজ্ঞতা এবং আগের শুদ্ধি অভিযানের সফলতা।
এরপর কী?
এখানে দুর্নীতির ব্যাখ্যাটি দুর্বল। কারণ, সরকারি ঘোষণায় সেটির উল্লেখই নেই; বরং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নেওয়া অবিশ্বাস, বয়সজনিত নিরাপত্তাহীনতা ও আগের শুদ্ধি অভিযানের সাফল্য সিকে আরও সাহসী করে তুলেছে বলে মনে হয়।
অর্থাৎ সি চিন পিং, ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলির মধ্যকার সম্পর্ক হয়তো এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখান থেকে আর ফেরার পথ ছিল না। অনেক প্রবীণ শাসকের মতোই সি হয়তো ক্রমে তাঁর চারপাশের লোকজনকে নিয়ে আরও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছেন। তাঁর নিজের সীমিত সামরিক অভিজ্ঞতা পেশাদার অফিসারদের প্রতি এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে যখনই পেশাদার সামরিক কর্মকর্তারা ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, তা সির নিরাপত্তাহীনতাকে আরও গভীর করেছে।
যা–ই হোক, ঝাং ও লিউ দুজনকেই শীর্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এক অভূতপূর্ব ঘটনা, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য।
কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পরবর্তী ধাপ নিয়ে প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, পিএলএর শীর্ষ নেতৃত্ব যে প্রবল অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। বাইরের দুনিয়া যা দেখতে পাচ্ছে, তা ভেতরের আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার সামান্য অংশমাত্র। লাল দেয়ালের ভেতরে যা ঘটছে, তা আরও ভয়াবহ বলেই ধরে নেওয়া যায়। শীর্ষ কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সম্পর্কে এখন নেতিবাচক আবেগই প্রাধান্য পাচ্ছে, যা কমান্ড কাঠামোর স্থিতিশীলতা ও সংহতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে। একসময় এই কমিশন বিভিন্ন মত ও স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করত। এখন সেখানে আছেন মাত্র দুজন, যাঁদের কার্যকর যুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত। এই কাঠামোতে কমিশনের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব।
এখন প্রশ্ন হলো সি একাই পিএলএ পরিচালনা করবেন, নাকি নতুন নিয়োগ দেবেন। অতীতে দেখা গেছে, শুদ্ধি অভিযানের পর তিনি অনেক সময় শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করেননি। যা–ই হোক, মাত্র দুই সদস্যের একটি কমিশন মানে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং পিএলএর একটি সমন্বিত যুদ্ধক্ষম সংগঠন হিসেবে কাজ করার সক্ষমতায় বড় ধরনের ধস।
তৃতীয়ত, ঝাং ও লিউয়ের পতনের পর পিএলএর ভেতরে আরও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, এমনকি বিভক্তির ঝুঁকি বেড়েছে। নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা ও জমে থাকা ক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। এই দ্বন্দ্ব যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে শীর্ষ নেতৃত্বে আরও অস্থিরতা তৈরি হবে।
উপসংহার
সবশেষে প্রশ্ন ওঠে, এর প্রভাব পিএলএর যুদ্ধক্ষমতার ওপর কী হবে? লিউ ঝেনলির অপসারণ সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শীর্ষ পদে বিশৃঙ্খলা এবং পেশাদার নেতৃত্বের কার্যত শিরশ্ছেদ স্বল্প মেয়াদে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে।
তবে একেবারেই যে কোনো পদক্ষেপ হবে না, তা নয়। সীমিত পরিসরের কোনো সামরিক তৎপরতা চালানো হতে পারে, যার উদ্দেশ্য হবে বিদেশি শক্তিকে সতর্ক করা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সময়ে সির জন্য জাতীয়তাবাদী সংহতি তৈরি করা।
আগামী দিনে ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলির ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে আরও শুদ্ধি অভিযান চলতে পারে, যদিও তার বেশির ভাগই প্রকাশ্যে আসবে না। ২০২৬ সালের বড় একটি সময়জুড়ে পিএলএর নেতৃত্ব অস্থির থাকবে বলে ধরে নেওয়া যায়। এই দ্বন্দ্ব অভিজাত স্তরকে বিভক্ত করতে পারে এবং এমনকি প্রকাশ্য সংঘাতের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
ঝাং ও লিউয়ের পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ আমরা হয়তো জানব না। তবে এটি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, সি চিন পিংয়ের বয়সজনিত নিরাপত্তাহীনতা, তাঁর সীমিত সামরিক অভিজ্ঞতা এবং ক্ষমতা সংহত করতে শুদ্ধি অভিযানের ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতার সম্মিলিত ফল বলেই মনে হয়।
যা–ই হোক, ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারির ঘটনাবলি পিএলএর ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই মুহূর্তে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন নামমাত্র সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্থা হয়ে পড়েছে এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর এই প্রথম চিফ অব স্টাফের পদ শূন্য রয়েছে। এই অস্থিরতা পিএলএর পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধক্ষমতাকে স্বল্প মেয়াদে সীমিত করবে। তবে অভ্যন্তরীণ ভাঙন ঠেকাতে ও বাইরের শক্তিকে বার্তা দিতে সীমিত সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ড. জি ইয়াং চীনের সামরিক সম্পর্ক গবেষক
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত