ড. হাসিনা খান তাঁর গবেষণা ও শিক্ষকতার গণ্ডিতেই সচরাচর জীবন কাটিয়েছেন। তবে পাট ও ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স নিয়ে গবেষণার সাফল্যে নিজের ও জাতির জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন। তাই তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদক স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে তিনি এবারই শুধু নন, আগেও বহুবার নৈতিক সৎসাহসের পরিচয় দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে প্রকাশ্যে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ ও বক্তব্য প্রদানে কখনো পিছপা হননি।

তবে হ্যাঁ, জনপ্রিয় লেখক বা সৎসাহসী কোনো শিক্ষাবিদ বলেই কেউ আইনের বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নৈতিক দায় গ্রহণের পর সমালোচনা কতটা যথার্থ হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাবতে বলব। এ কথাও স্মরণ করা দরকার যে এবারের প্রথম, ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির বইগুলো নতুন পদ্ধতিতে লেখা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির বই ২০২২ সালে পাইলটিংয়ের মাধ্যমে যাচাই করা হলেও সপ্তম শ্রেণির বই তা করার সুযোগ হয়নি। তাই শিক্ষামন্ত্রী বারবারই সাংবাদিকদের জানাচ্ছেন যে এ শ্রেণিগুলোর জন্য ২০২৩ সাল হবে পরীক্ষামূলক বছর।

আজকাল অর্থনীতিবিদেরা বলেন, বিনিয়োগের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র হচ্ছে শিক্ষা, যার মাধ্যমে উৎকৃষ্ট মানবসম্পদ তৈরি করা যাবে। এমন মানবসম্পদই পারবে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে। আসুন, আমরা বরং আওয়াজ তুলি, অবকাঠামো উন্নয়নের এ পর্যায়ে এবার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হোক শিক্ষায়। সত্যিই শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ ব্যতীত কাঙ্ক্ষিত মানসম্পন্ন শিক্ষা, সোনার বাংলা, উৎকৃষ্ট মানবসম্পদ কিছুতেই নিশ্চিত করা যাবে না। অতএব গণমাধ্যমকর্মীদের বলব, শিক্ষায় অবিলম্বে মেগা প্রকল্প চালুর জন্য কলম ধরুন, আওয়াজ তুলুন।

ফলে সারা বছর শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষাবিদ-সাংবাদিকসহ সচেতন মহলের পরামর্শ নেওয়া হবে। কারণ, এই প্রথম দেশে শিক্ষার পদ্ধতিতে গুণগত মৌলিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। এ কাজ লেখক থেকে শিক্ষক, সম্পাদক থেকে শিক্ষার্থী সবার জন্যই নতুন। তার ওপর পদ্ধতিটি বুঝে সে অনুযায়ী পাঠ্যবই প্রণয়ন ছিল এক কঠিন পথ, বলা যায় দীর্ঘ বন্ধুর অভিযাত্রা। ফলে বই-সংশ্লিষ্ট সবারই ধারণা যে প্রতিটি বইয়ের আরও উন্নয়ন সম্ভব বা প্রয়োজন এবং তাই এর পরিমার্জন চালিয়ে যেতে হবে অন্তত আরও কয়েক বছর। উন্নত বিশ্বেও এ পদ্ধতি শতভাগ সফলভাবে প্রবর্তনে যথেষ্ট সময় লেগেছে।

এ পদ্ধতির বই লেখার কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে অভিজ্ঞতা থেকে সবার জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে কালে কালে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে, বারবার সংস্কারের কাজ হয়েছে। এগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে বলা যায়, এবার যে নতুন অভিজ্ঞতাভিত্তিক (শিক্ষার্থীর) শিখনপদ্ধতি চালু হলো, সেটির প্রথমবারের মতো স্কুলশিক্ষায় অনেক মৌলিক পরিবর্তন ঘটানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এটি সফল হলে প্রথমত, শিক্ষার এ পর্যায়ে শিক্ষকের পরিবর্তে শিক্ষার কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হবে শিক্ষার্থী অর্থাৎ এটি আগের শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষার ধারা পাল্টে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাপদ্ধতিতে রূপান্তরিত হবে। দ্বিতীয়ত, পড়া মুখস্থ করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা স্ব-উদ্যোগে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান, দক্ষতা অর্জন ও চর্চা করবে। তৃতীয়ত, আগের পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়নের পরিবর্তে শিখনকালীন অভিজ্ঞতার ওপর বেশি জোর থাকবে। এতে যে গুণগত পরিবর্তন ঘটবে তা হলো, এতকাল শিক্ষার্থীরা অন্যের (শিক্ষকের) প্রশ্নে অন্যের তৈরি (নোট বই) উত্তর মুখস্থ করত। এখন তারা নিজে প্রশ্ন থেকে উত্তর তৈরিসহ সব কাজে সরাসরি যুক্ত থাকবে।

অভিজ্ঞতাভিত্তিক এই শিখনপদ্ধতি সফলভাবে বাস্তবায়নের পথে আমাদের দেশের জন্য কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত। এ অনুপাত মাধ্যমিক স্কুলে ১: ৪০ এবং প্রাথমিকে ১: ৩০ ও প্রাক্‌-প্রাথমিকে ১: ২৫ হওয়া উচিত। কিন্তু সবাই জানেন আমাদের দেশে খুব কমসংখ্যক স্কুলেই এই অনুপাতে ছাত্র-শিক্ষক রয়েছেন। এটি রাতারাতি পরিবর্তন করা যাবে না।

অথচ ছাত্র-শিক্ষক হার ১: ৮০ বা ১: ৭০ রেখে এ পদ্ধতি সফল করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষকেরা এক-দুই দিনের অনলাইন এবং পাঁচ দিনের প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়নে কতটা সফল হবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তৃতীয়ত, যেহেতু এ পদ্ধতিতে স্কুলের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর পারিবারিক সহযোগিতাও (আর্থিক নয়) প্রয়োজন হবে, তাই অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে অবহিত ও উদ্বুদ্ধকরণ জরুরি ছিল।

কিন্তু তার সময় পাওয়া যায়নি। চতুর্থত, সত্যিই সব বই-ই একই, মানে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের উপযোগী হয়নি। পঞ্চমত, নতুন ধারার শিখনকালীন মূল্যায়নসহ এসএসসির আগপর্যন্ত সব মূল্যায়নের জন্য শিক্ষকের ওপর অনেকখানি নির্ভর করতে হবে, যদিও সহপাঠী, অভিভাবক, অন্য শিক্ষকেরও মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু আমাদের দেশে একজন জাফর ইকবাল বা হাসিনা খানের মতো উচ্চ নৈতিকতার মানুষ সত্যিই কম। পক্ষপাতিত্ব, দুর্বলতা এ দেশে সহজাত প্রবণতা, ফলে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির সাফল্য নিয়েও সংশয় থাকছে।

মানসম্পন্ন এবং অর্থপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এ রকম মৌলিক গুণগত পরিবর্তনের দিকেই আমাদের যেতে হবে। সমস্যা থাকবে, তাতে পিছিয়ে গেলে চলবে না। বরং সবাই একত্র হয়ে এই নতুন শিক্ষাযাত্রাকে সফল করার জন্য এর দুর্বলতা, ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে সহযোগিতার হাত বাড়াবেন, এটাই কাম্য।

এরই সূত্রে শেষ কথা হিসেবে গণমাধ্যমকর্মীদের বলতে চাই, দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করে একধারার শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতের মেধাসম্পন্ন দক্ষ নাগরিক তৈরি করতে হলে শিক্ষার কাঠামো-অবকাঠামোসহ ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ চালাতে হবে। সব স্কুলে বা সব শিক্ষার্থীর জন্য গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ল্যাব, কম্পিউটার ল্যাব, খেলার মাঠ, মিলনায়তন থাকা প্রয়োজন।

আজকাল অর্থনীতিবিদেরা বলেন, বিনিয়োগের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র হচ্ছে শিক্ষা, যার মাধ্যমে উৎকৃষ্ট মানবসম্পদ তৈরি করা যাবে। এমন মানবসম্পদই পারবে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে। আসুন, আমরা বরং আওয়াজ তুলি, অবকাঠামো উন্নয়নের এ পর্যায়ে এবার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হোক শিক্ষায়।

সত্যিই শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ ব্যতীত কাঙ্ক্ষিত মানসম্পন্ন শিক্ষা, সোনার বাংলা, উৎকৃষ্ট মানবসম্পদ কিছুতেই নিশ্চিত করা যাবে না। অতএব গণমাধ্যমকর্মীদের বলব, শিক্ষায় অবিলম্বে মেগা প্রকল্প চালুর জন্য কলম ধরুন, আওয়াজ তুলুন।

  • আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক