ইরানি সভ্যতার ওপর ট্রাম্পের এত আক্রোশ কেন

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি সভ্যতাকে চিরতরে মুছে দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন—এটি দেখে ওই রাতে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি।ছবি: এআই জেনারেটেড

নাইন-ইলেভেন সন্ত্রাসী হামলায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া বিল্ডিং ধসে যাওয়ার পরের দিন, অর্থাৎ ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকালে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই–এর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহমুদ আহমেদের অফিসের টেলিফোন বাজল।

মাহমুদ আহমেদ ফোন ধরলেন। অপর প্রান্তে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজ

আর্মিটেজ হিমশীতল গলায় বললেন, ‘মিস্টার মাহমুদ, টুইন টাওয়ারে হামলার হোতারা আফগানিস্তানে আছে। তাদের ধরতে তোমরা যদি আমাদের সহযোগিতা করো তো ভালো, আর যদি না করো, তাহলে পুরো পাকিস্তানকে স্টোন এজ-এ পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’

ওই সময়কার পাক-প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ২০০৬ সালে ছাপা হওয়া আত্মজীবনী ইন দ্য লাইন অব ফায়ার: আ মেমোয়ার- এ এভাবেই ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন।

পাক-প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ২০০৬ সালে ছাপা হওয়া আত্মজীবনী ইন দ্য লাইন অব ফায়ার: আ মেমোয়ার- এ এভাবেই ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন।
ছবি: সংগৃহীত

সেই ঘটনার সিকি শতাব্দী পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে ‘স্টোন এজ’ শব্দবন্ধটি আবার শোনা গেল।

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ মার্চ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করার তিনদিন পর (১ এপ্রিল, ২০২৬) তিনি কথাটা বললেন। ওই দিন টেলিভিশন ভাষণে ট্রাম্প বললেন, ‘দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর কঠিন থেকে কঠিনতর আঘাত হানা হবে। ইরানকে স্টোন এজ-এ ফিরিয়ে নেওয়াই হবে সে হামলার লক্ষ্য।’

এরপর তুমুল যুদ্ধের মধ্যে ৭ এপ্রিল রাতে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-য়ে টুইট করলেন, ‘আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতার মরণ হবে, আর কস্মিনকালেও তা ফিরে আসবে না।’ মানে, তিনি সরাসরি বলে দিলেন, ইরান এবং ইরানের নয় কোটি মানুষকে ‘আজ রাতেই’ মুছে ফেলা হবে।

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি সভ্যতাকে চিরতরে মুছে দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন—এটি দেখে ওই রাতে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি। কারণ তারা জানে, এক রাতে একটি গোটা সভ্যতাকে হত্যা করতে গেলে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে হবে তা পরমাণু বোমার ব্যাবহার ছাড়া সম্ভব নয়; আর ট্রাম্প যে ধরনের লোক, তাতে তাঁর পক্ষে সে ধরনের কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলা অসম্ভব কিছু না। তবে সভ্যতার কপাল ‘আপাতত ভালো’ যে ট্রাম্প সে সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছেন।

৭ এপ্রিল রাতে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-য়ে টুইট করলেন, ‘আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতার মরণ হবে, আর কস্মিনকালেও তা ফিরে আসবে না।’
ছবি: সংগৃহীত

কপাল ‘আপাতত ভালো’ বলছি এই কারণে যে, ট্রাম্পের ‘গোটা সভ্যতা’ ধ্বংসের ইচ্ছা হয়তো একেবারে উবে যায়নি। গত রোববারও (১৯ এপ্রিল, ২০২৬) তিনি একইভাবে ইরান নামক পুরো দেশটাকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন।

ওই দিন ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইয়িংস্ট-এর সঙ্গে ২০ মিনিটের কথোপকথন অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘তারা (ইরান) যদি চুক্তি না করে, তাহলে পুরো দেশটাই উড়িয়ে দেওয়া হবে।’

গোটা দেশ উড়িয়ে দেওয়া বা সভ্যতা গুঁড়িয়ে দেওয়া কিংবা সভ্যতাকে প্রস্তরযুগে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা যে আমেরিকা নামক রাষ্ট্রটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে শুধু আর্মিটেজ বা ট্রাম্পই দিয়েছেন-এমন না।

১৯৬৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমেরিকা যখন ‘অপারেশন রোলিং থান্ডার’ চালিয়ে বোমাবৃষ্টি শুরু করে, সে সময় মার্কিন জেনারেল কার্টিস লেমে উত্তর ভিয়েতনামকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁর ওই সময়কার কুখ্যাত উক্তিটি ছিল, ‘বম্ব দেম ব্যাক ইন টু দ্য স্টোন এজ’ (‘বোমা মেরে তাদের প্রস্তরযুগে পাঠিয়ে দাও’)। এই কথাটা পরে আমেরিকায় সামরিক বাগধারা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সর্বশেষ ঘটনায় ট্রাম্পের ‘গোটা সভ্যতা মেরে ফেলা’ বা ‘পুরো দেশ উড়িয়ে দেওয়া’র হুমকির বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। ভ্যাটিকানের পোপ লিওর মতো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে এক সময় কট্টরভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া টাকার কার্লসনের মতো ডানপন্থী আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরাও ট্রাম্পের এই কথার সমালোচনা করেছেন।

আরও পড়ুন

আড়াই শ বছরের যুক্তরাষ্ট্র হাজার বছরের সভ্যতার মানে জানে?

‘ইরানকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে দেওয়া হবে’—কথাটির মধ্যে ট্রাম্পের আত্মম্ভরি যতটা না আছে, তার চেয়ে বেশি আছে অজ্ঞতা। আছে ইতিহাসের ব্যাপারে অজ্ঞতা, আছে ভৌগোলিক বাস্তবতার বিষয়ে মূর্খতা, আর আছে একটি দীর্ঘ সভ্যতার ধারাকে বুঝতে না পারার অক্ষমতা।

রেকর্ডপত্র বলছে, ছোটবেলায় নিউইয়র্কের কিউ ফরেস্ট স্কুল থেকে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অভব্য আচরণের কারণে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর তাঁকে একটি সামরিক-ধাঁচের স্কুলে পাঠানো হয়। পরে সায়েন্স ইন ইকনোমিকস বিষয়ে তিনি কোনো রকমে স্নাতক ডিগ্রি পান।

তবে অর্থবিজ্ঞানের গড়পড়তা মানের ছাত্র হলেও ট্রাম্পের বিষয়বুদ্ধি বরাবরই টনটনা। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই পয়সা-কড়ির হিসাবের খাতায় বন্দী। রিয়েল এস্টেট আর ক্যাসিনো বা জুয়ার ব্যবসায় সফল হওয়া ট্রাম্পের কাছে এই পৃথিবী তাই হয়তো শুধুই বিষয়-সম্পত্তি আর লেনদেনের জায়গা।

হয়তো সে কারণেই তিনি যে সহজ সত্যটি ধরতে পারেন না, তা হলো-আজকের ইরান (যার প্রাচীন নাম পারস্য) এমন এক সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করে, যে সভ্যতা আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বের জন্মের বহু আগেই সুসংগঠিত রূপ পেয়েছিল। পারস্য সভ্যতা যখন পূর্ণমাত্রায় বিকশিত, তখন ‘আমেরিকা’ নামের কোনো দেশ বা ভূখণ্ডের ধারণাও দুনিয়ার মাটিতে ছিল না।

লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ৫২ নম্বর কক্ষে প্রদর্শনীর জন্য রাখা সাইরাস সিলিন্ডার।
ছবি: সংগৃহীত

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সাইরাস দ্য গ্রেটের নেতৃত্বে পারস্য এমন এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল যার আওতা ছিল মধ্য এশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত। সেই সাম্রাজ্যে ছিল উন্নত প্রশাসন। ছিল করব্যবস্থা। ছিল সড়ক ও যোগাযোগের সুসংগঠিত কাঠামো।

ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সিলিন্ডারের মতো দেখতে মাটি দিয়ে বানানো একটি বস্তু আছে। সেটির নাম ‘সাইরাস সিলিন্ডার’। তার ওপর আক্কাদীয় কিউনিফর্ম লিপিতে সম্রাট সাইরাসের ব্যাবিলন জয়ের কথা, পূর্ববর্তী শাসকের অত্যাচারের সমালোচনা, স্থানীয় মানুষের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শনের ঘোষণা, বিভিন্ন ধর্ম ও উপাসনালয়ের প্রতি সম্মান দেখানোর কথা, নির্বাসিত জনগোষ্ঠীকে নিজ নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যাওয়ার অনুমতির কথা লেখা আছে।

ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, শাসকের সহনশীলতা ও ন্যায্যতার ধারণা তুলে ধরা প্রাচীন পারস্যের এই সাইরাস সিলিন্ডারকে বিশ্বের প্রথম ‘মানবাধিকার ঘোষণার’ প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।

ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, প্রাচীন পারস্যের ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছিল আব্বাসীয় খেলাফতের সময়। ওই সময় খেলাফতের রাজধানী ছিল বাগদাদ, কিন্তু তার প্রাণস্পন্দন ছড়িয়ে ছিল পারস্যের নিশাপুর, রেই, মেরভ, বালখ্, তুস, ইসফাহানের মতো শহরগুলোতে। এই শহরগুলো জ্ঞান, সংস্কৃতি আর উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

তেহরানের লালেহ পার্কে ওমর খৈয়ামের ভাষ্কর্য।
ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, যে সভ্যতার পীঠস্থানকে তিনি এক রাতে মেরে ফেলতে চেয়েছেন, সেখানে জন্ম নিয়েছেন ওমর খৈয়াম, আল-রাজি, ফেরদৌসির মতো মানুষ। তাঁরা কাব্য, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন ও গণিতের জগতে দিকপাল হয়ে আছেন।

ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, ইসলামের স্বর্ণযুগে জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক কেন্দ্র ‘বাইতুল হিকমা’ বা ‘জ্ঞানগৃহ’ ছিল একাধারে গ্রন্থাগার, অনুবাদ কেন্দ্র, গবেষণাগার ও একাডেমি যেখানে বিভিন্ন সভ্যতার জ্ঞান একত্রিত করে অধ্যয়ন ও উন্নয়ন করা হতো।

এখান থেকেই গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় গ্রন্থের অনুবাদ হতো; এখান থেকেই গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন, ভূগোল ইত্যাদিতে গবেষণা হতো; এখান থেকেই পণ্ডিতদের মধ্যে জ্ঞান-বিনিময় ও বিতর্ক হতো।

এখান থেকেই ইউরোপের রেনেসাঁর ভিত তৈরি হয়েছিল; এখান থেকেই আল-খোয়ারিজমি বীজগণিতের ধারণা দেন যার ওপর আজকের অ্যালগরিদম দাঁড়িয়ে আছে।

ইবনে সিনা এখান থেকে অনূদিত গ্রন্থগুলোর পাঠ নিয়ে গ্রিক ও ইসলামি চিকিৎসা জ্ঞানকে একত্রিত করেছিলেন এবং তারপর নিজের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা যুক্ত করে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানের বই ‘আল কানুন ফিৎ তিব্ব’ (দ্য ক্যানোন অব মেডিসিন) যা ইউরোপে দীর্ঘদিন পাঠ্য ছিল।

ট্রাম্প কি জানেন, পারস্য সভ্যতায় ঋদ্ধ এই বায়তুল হিকমা থেকে উঠে আসা আল-ফারাবি ও আল-গাজ্জালি দর্শনের জগতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন?

ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, যখন বাগদাদ, নিশাপুর বা মেরভে উন্নত পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তখন আমেরিকা তো দুরে কথা, ইউরোপের অনেক অঞ্চলই ছিল সভ্য দুনিয়ার বাইরে।

‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে রাজার ভূমিকায় উৎপল দত্ত।
ছবি: সংগৃহীত

যে জানে না, ক্ষমতা যদি তার হাতে যায়, তাহলে তার জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর হয় সেই সব লোক, যারা জানে। মূর্খ ক্ষমতাধর তাই জ্ঞানী সমাজ রাখতে চায় না।

সত্যজিতের ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে হীরক রাজা উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা বন্ধ করতে হুকুম দেওয়ার সময় বলেছিলেন, পাঠশালার ছাত্রপাত্র ‘যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে’।

ট্রাম্পের মধ্যে হীরক রাজা সিনড্রোম অনেক আগে থেকেই আছে। সেটি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে গত বছরের এপ্রিলে। ওই সময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গাজায় ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করায় ট্রাম্প হার্ভার্ডের জন্য বরাদ্দ করা দুই বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল তহবিল বাতিল করে দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য আদালত এই তহবিল বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

এ কথা কি শুধু কথার কথা?

যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই সমৃদ্ধ ইতিহাসকে এক কথায় ‘স্টোন এজ’ বলে উড়িয়ে দিয়ে আসছে। এই ‘স্টোন এজ’ শুধু কথার মধ্যে আটকে নেই, এটি আক্রমণের কৌশলে পরিণত হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধের প্রথম দিনে (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবের শাহরাক-ই আল-মাহদি মহল্লার শাহজারেহ তাইয়েবেহ বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তাতে ১৫৬ জন বেসামরিক মানুষ মারা যায়। এদের মধ্যে ১২০ জনই ফুটফুটে বাচ্চা বয়সী ছাত্রী।

ক্ষেপণাস্ত্রটি যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ওই ভবনে আঘাত হেনেছে, তা নয়। সবাই এক রকম নিশ্চিত, খুব ঠান্ডা মাথায় হিসাব নিকাশ করে এই কন্যাশিশুদের সেদিন হত্যা করা হয়েছে।

সামরিক স্থাপনার বাইরে এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমায় ইরানের ১,৩০০টি বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩০ টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয়েছে।

তেহরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, শরিফ ইউনিভার্সিটি এবং শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে।

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গোলেস্তান প্যালেসের ভেতরের অংশ।
ছবি: সংগৃহীত

এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণাকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। পরীক্ষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসা অবকাঠামোও রক্ষা পায়নি। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসা শতবর্ষী পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরান-কেও টার্গেট করে হামলা হয়েছে।

ইরানে ২৯টি ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান আছে। এগুলো সময়ের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা এক দীর্ঘ সভ্যতার স্মৃতি। দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস জুড়ে বিস্তৃত এই স্থাপনাগুলো কখনো ছিল সাম্রাজ্যের রাজধানী, কখনো ইসলামি নগরজীবনের নিখুঁত নকশা, আবার কখনো মরুভূমির বুক চিরে ওঠা শহর।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আগ্রাসন, রাজনৈতিক ঝড় আর শাসন পরিবর্তনের ভেতর দিয়েও তারা টিকে আছে নিঃশব্দ সাক্ষীর মতো। কিন্তু ইরান যুদ্ধের মুখে পড়ে সেই স্থিরতা আজ নাজুক হয়ে পড়েছে।

রাজধানী তেহরানে বিমান হামলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর একটি হলো গোলেস্তান প্যালেস, অপরটি তেহরান গ্র্যান্ড বাজার।
গোলেস্তান প্যালেস শুধু একটি প্রাসাদ নয়-এ যেন ইতিহাসের নীরব দরবারঘর।

ইসফাহান শহরের চেহেল সুতুন প্রাসাদে মার্কিন বিমান বাহিনীর হামলা।
ছবি: রয়টার্স

উনিশ শতকে কাজার রাজবংশের রাজসভা হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। আয়নার টুকরোতে ঝলমল করা দেয়াল, রঙিন টাইলস আর সূক্ষ্ম কারুকাজে ভরা হলঘরগুলো আজও যেন অতীত পারস্যের গৌরবকে নিঃশব্দে বহন করে চলে।

অন্যদিকে তেহরান গ্র্যান্ড বাজার কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়;-এ এক জীবন্ত নগর, শহরের ভেতরে আরেক শহর। এখানে দোকান, মসজিদ, মানুষের পদচারণা আর দৈনন্দিন জীবনের শব্দ মিলেমিশে এক অবিরাম জীবনপ্রবাহ তৈরি করে। বোমার আঘাতে আজ দুটিই বিপন্ন।

বিমান হামলার প্রভাব পড়েছে ইসফাহান শহরেও। ইসফাহান ইরানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। এটি এক সময়কার সাফাভি সাম্রাজ্যের রাজধানী। শিল্প, স্থাপত্য আর বাণিজ্যের সেই স্বর্ণযুগে শহরটি ছিল এক জীবন্ত ক্যানভাস।

প্রথম শাহ আব্বাসের আমলে ইসফাহান হয়ে উঠেছিল এক সাম্রাজ্যিক শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্র। সেখানে ছিল নকশে জাহান স্কয়ার-মসজিদ, প্রাসাদ আর বাজারের এক অপূর্ব সমাহার। সেই বিস্ময়কর নগর বিন্যাসের জন্যই শহরটি পরিচিত হয়েছিল ‘নেসফে জাহান’ বা ‘অর্ধেক বিশ্ব’ নামে।

আরও পড়ুন

বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, বিস্ফোরণের অভিঘাতে ইসফাহান শহরের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-তিমুরি হল, জেবে খানেহ ভবন, রাকিব খানেহ, আশরাফ হল ও চেহেল সুতুন প্রাসাদ।

ইরানের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো কেবল পুরোনো নিদর্শন নয়। এগুলো হাজার বছরের শিল্প, সাহিত্য আর স্থাপত্যের ধারায় গড়ে ওঠা এক জীবন্ত পরিচয়। শিরাজ, ইসফাহান আর ইয়াজদ-এই শহরগুলো যেন কবিতার শহর। এই শহরগুলোতে হাফিজ আর ফেরদৌসির মতো কবিদের শের আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এই সভ্যতা-সংস্কৃতি এখন একের পর এক টার্গেটে পড়ে যাচ্ছে।

এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য শুধু রাষ্ট্রকে দুর্বল করা নয়। এর লক্ষ্য আরও বড়। তা হলো-একটি জাতিকে পিছিয়ে দেওয়া, একটি সমাজকে ভেঙে ফেলা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে জেনারেল কার্টিস লেমে বা রিচার্ড আর্মিটেজ বা ডোনাল্ড ট্রাম্প গোটা সভ্যতাকে প্রস্তরযুগে পাঠিয়ে দিতে চান, তার পেছনে কি শুধুই শক্তির দাপট দেখানো বা ভয় দেখানোর রাজনৈতিক ভঙ্গি কাজ করে, নাকি এর পেছনে আরও কোনো মিহি কারণ মিশে আছে?

যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে অন্য দেশের সভ্যতাকে ‘স্টোন এজ’-এ পাঠিয়ে দিতে চায়, সেভাবে বিশ্বের অন্য কোনো শক্তিধর দেশ চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের সভ্যতাকে ‘স্টোন এজ’-এ পাঠানোর হুমকি দিতে পারবে না; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সেই অর্থে কোনো ‘সভ্যতা’ই নেই। তাঁরা জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস মাত্র আড়াই শ বছরের ইতিহাস।

জ্বালা রে... জ্বালা... ! অন্তরের জ্বালা...?

লেমে, আর্মিটেজ, ট্রাম্পের মধ্যে হাজার হাজার বছরের সভ্যতাকে প্রস্তর যুগে ফেরত পাঠানোর ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে যে অনুভূতিটি, সম্ভবত তার নাম ‘অন্তরের জ্বালা’।

ভারতীয় নিউজ মিডিয়া রিপাবলিক মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিক ও মুখ্য সম্পাদক অর্ণব গোস্বামী এক অনুষ্ঠানে বলছিলেন, ট্রাম্পকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কি কোনো সমৃদ্ধ সভ্যতা আছে? কোনো ইতিহাস আছে?’ তাহলে তাঁকে বলতে হবে-‘না’। বিশ্বের প্রতি আমেরিকার সবচেয়ে বড় অবদান কী? এর জবাব হলো-টেসলা, ম্যাকডোনাল্ডস আর অ্যাটম বোমা।

অর্নব মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে অন্য দেশের সভ্যতাকে ‘স্টোন এজ’-এ পাঠিয়ে দিতে চায়, সেভাবে বিশ্বের অন্য কোনো শক্তিধর দেশ চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের সভ্যতাকে ‘স্টোন এজ’-এ পাঠানোর হুমকি দিতে পারবে না; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সেই অর্থে কোনো ‘সভ্যতা’ই নেই। তাঁরা জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস মাত্র আড়াই শ বছরের ইতিহাস। সভ্যতা বলতে এখন যুক্তরাষ্ট্রে যা দাঁড়িয়ে আছে, তা গড়ে উঠেছে কৃষ্ণাঙ্গদের পশুর মতো ব্যবহার করা দাসপ্রথার ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেমাগুলো সুপারম্যান, আয়রনম্যান, স্পাইডারম্যান, ওয়ান্ডার উওম্যানের মতো ফিকশনাল হিরো দিয়ে ভরা।
গ্রাফিক্স ছবি: এআই জেনারেটেড

যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীন সভ্যতা নেই, সেহেতু সাইরাস, ভ্লাদিমির দ্য গ্রেট, আলেকজান্ডার, অশোক, উমর বিন খাত্তাবের মতো কোনো বীর সন্তানও তাদের নাবালক ইতিহাস পয়দা করতে পারেনি।

এ কারণেই তাদের সিনেমাগুলো সুপারম্যান, আয়রনম্যান, স্পাইডারম্যান, ওয়ান্ডার উওম্যানের মতো ফিকশনাল হিরো দিয়ে ভরা।

এই না থাকার জ্বালা ট্রাম্পের মতো লোকদের হিংস্র করে তোলে।

গত ৮০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশের সাথে যুদ্ধ করেছে। কারও সাথে এখনো যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব রয়ে গেছে। এসব যুদ্ধের সবগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র একচেটিয়া জয় পায়নি। কখনো কখনো তারা কঠিন বেকায়দায় পড়েছে, কখনো মারাত্মকভাবে হেরেছে।

কোরিয়া যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে চীন ও উত্তর কোরিয়ার কাছে নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে চরমভাবে হারতে হয়েছে। ইরাক যুদ্ধে তারা ইরাককে মুঠোয় আনতে পারেনি। আফগানিস্তান থেকে শেষ পর্যন্ত সরে আসতে হয়েছে। আর এখন ইরানের প্রতিরোধ তো দেখাই যাচ্ছে।

এই ছয়টি দেশের মধ্যে মিল হলো-এরা সবাই প্রাচীন সভ্যতার দেশ। চীন প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। কোরিয়ার ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছরের। ভিয়েতনামের ইতিহাসও পাঁচ হাজার বছরের কাছাকাছি। ইরাকের ইতিহাস ছয় হাজার বছরেরও বেশি। আফগানিস্তানের ইতিহাস তিন হাজার বছরের বেশি। আর ইরানের ইতিহাস প্রায় সাত হাজার বছরের পুরোনো।

পারস্য, আরব, মিসর, ভারত, চীন বা জাপানকে ট্রাম্প শুধু দেশ হিসেবে জানেন। কিন্তু এগুলো নিছক দেশ নয়। এগুলো হলো সভ্যতা শক্তি বা সিভিলাইজেশন পাওয়ার। এই সভ্যতা-শক্তি অসংখ্য আক্রমণ ও উত্থান-পতনের মধ্যেও টিকে থাকে।

কিন্তু ট্রাম্প একটি ব্যর্থ প্রেসিডেন্সির সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সভ্যতাকে দেখছেন।

আরও পড়ুন

ট্রাম্পের মতো লোকেরা জানেন, যখন পুরো আমেরিকা মহাদেশ ছিল একটি বিশাল জলাভূমি বা জঙ্গল, তখন পারস্য সভ্যতা জ্বল জ্বল করছিল। এই হীনমন্যতা তাঁকে এবং তাঁর মতো মার্কিনিদের তাড়িয়ে বেড়ায়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে অনেক আলোকিত মানুষ আছেন, যাঁরা এই সত্যকে অকপটে স্বীকার করেন। ট্রাম্পের ‘স্টোন এজ’ সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সে দেশের অনেকেই ট্রাম্পের বিস্তর সমালোচনা করেছেন।

টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনা নিয়ে ‘ফারেনহাইট ৯/১১’ নামের তথ্যচিত্র বানিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন যিনি, সেই বিশ্বনন্দিত পরিচালক মাইকেল মুর বলেছেন, ‘ইরান এই পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম মহান একটি সভ্যতার জন্মভূমি। যখন ইউরোপে আমাদের পূর্বপুরুষেরা কুঁড়েঘর বানানো শিখছিল, তখন পারস্যরা বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার ঘোষণা লিখে ফেলেছিল। তারা এমন একটি বহুসাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, যেখানে বিজিত জনগণের সঙ্গে মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করা হতো। তারা গণিত ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন অগ্রগতি অর্জন করেছিল, যা আমরা ধরতে পেরেছি হাজার বছর পরে। এই মানুষগুলোই আমাদের অ্যালজেব্রা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং “গেম অব থ্রোনস”-এর থিম সংগীতের মতো সাংস্কৃতিক অনুপ্রেরণা দিয়েছে।’

নিউইয়র্কে ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশে মাইকেল মুর।
ছবি:এএফপি

কিন্তু ট্রাম্প গোষ্ঠীর কাছে মাইকেল মুরের বক্তব্যের চার পয়সার দাম নেই। এ কারণেই ইরানকে নিয়ে বহু বছর ধরে পারমাণবিক অস্ত্র, নিউট্রন বোমার আলোচনা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই সভ্যতাকে ধ্বংসের ধারণাকে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা চলছে। কারণ শুধু শক্তি দিয়ে সব হয় না। তার সঙ্গে লাগে গল্প ও বিশ্বাস। লাগে ন্যারেটিভ বা ভাষ্য। তার প্রয়োজনেই আবার ফিরে আসে পুরোনো নির্মম যুক্তি। ফিরে আসে বাইবেলীয় আমালেকের ধারণা, যে ধারণায় শত্রুকে শুধু হারানো নয়, সম্পূর্ণ মুছে ফেলাই লক্ষ্য।

সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে এক সমাবেশে ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান নেতাদের সামনে বাইবেলের ‘এস্থার’-এর কাহিনি তুলে ধরা হয়। সেখানে আধুনিক ইরানিদের ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের প্রাচীন শত্রুর উত্তরসূরি হিসেবে দেখানো হয়।

ওই সমাবেশে বলা হয়, এই সময়ের জন্যই নাকি ঈশ্বর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি ‘অসৎ পারস্যবাসীদের’ ধ্বংস করেন। ট্রাম্প নিজে সেখানে ইরানিদের ‘পশু’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, ইরানিদের দেহে ‘খারাপ জিন’ আছে। এই ভাষা ইতিহাসের সেই ভয়াবহ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন আমেরিকায় জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের নামে গণহত্যা চালানো হয়েছিল।
ছবি: এএফপি

এক টুইটে ট্রাম্প ইরানিদের ‘বাস্টার্ড’ বলে গালি দিয়েছেন। আবার সেই তিনিই দাবি করেছেন, তিনি ইরানিদের ‘মুক্তি’ দিচ্ছেন। এই ‘মুক্তি’র অর্থ কি পুরো সভ্যতাকে মেরে ফেলা কিনা তা নিয়ে সম্ভবত তিনি নিজেই ধন্দ্বে আছেন।

ইরাক যুদ্ধের সময় আরবদের ‘দানব’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় তাঁদের ‘সাব হিউম্যান’ বা ‘ঊনমানুষ’ দেখানো হয়েছে। আজ একইভাবে ইরানিদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানিদের দেহে ‘খারাপ জিন’ আছে। এই ভাষা ইতিহাসের সেই ভয়াবহ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন আমেরিকায় জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের নামে গণহত্যা চালানো হয়েছিল।

কিপলিংয়ের ‘শ্বেতাঙ্গের দায়’ কি ট্রাম্পের কাঁধে?

পশ্চিম যখন বিভিন্ন বনেদি সভ্যতার ওপর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এবং আফ্রিকা-এশিয়ার অশ্বেতাঙ্গদের বন্দুকের নলের মুখে শাসন করছিল, কৃষ্ণাঙ্গদের দাস বানাচ্ছিল, তখন ব্রিটিশ ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া কবি, গল্পকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক রুডিয়ার্ড কিপলিং ১৮৯৯ সালে একটি কবিতা লিখলেন।

কবিতার নাম ‘দ্য হোয়াইট ম্যান’স বারডেন’ (‘শ্বেতাঙ্গের দায়’)। এই কবিতায় কিপলিং বললেন, ‘অসভ্য’ বা ‘পিছিয়ে থাকা’ জাতিগুলোকে সভ্য করা, শাসন করা এবং শোধন করা দরকার। আর এই নৈতিক ‘বারডেন’ বা ভার বা দায় শ্বেতাঙ্গদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। এই ‘দায়’ শোষণ নয়, এই দায় হলো এক ধরনের আত্মত্যাগ।

এই কবিতায় কিপলিং উপনিবেশের শিকার জনগণকে অবলীলায় ‘হাফ ডেভিল অ্যান্ড হাফ চাইল্ড’ বা ‘আধা-শয়তান আর আধা-শিশু’ বললেন। অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের উপনিবেশের শিকার হওয়া অশ্বেতাঙ্গরা হলো একইসঙ্গে বিপজ্জনক এবং অপরিণত ও অক্ষম বললেন।

‘দ্য হোয়াইট ম্যান’স বারডেন’ কবিতায় কিপলিং বললেন, ‘অসভ্য’ বা ‘পিছিয়ে থাকা’ জাতিগুলোকে সভ্য করা, শাসন করা এবং শোধন করার দায়িত্ব হলো শ্বেতাঙ্গদের।
ছবি: সংগৃহীত

এ কবিতায় কিপলিং শ্বেতাঙ্গদের শাসনকে এক ধরনের কঠিন আর কষ্টকর দায়িত্ব হিসেবে দেখালেন। তিনি এই কবিতায় শ্বেতাঙ্গদের বললেন, ‘তোমরা কষ্ট পাবে, ঘৃণা পাবে, দোষারোপের শিকার হবে, তবুও তোমাদের কাজ করে যেতে হবে।’

মানে কিপলিং বললেন, উপনিবেশবাদ লাভজনক কিছু নয়, বরং এটা হলো আত্মবলিদানমূলক কাজ। সভ্য দুনিয়া গড়তে শ্বেতাঙ্গদের এই কাজের ভার নিতেই হবে। তিনি বললেন, শ্বেতাঙ্গদের আফ্রিকা বা এশিয়ার মানুষকে ‘শোধন’ করতে ‘স্যাভেজ ওয়ারস অব পিস’ বা ‘শান্তির বর্বর যুদ্ধ’ চালাতে হবে।

কিপলিংয়ের এই ‘দ্য হোয়াইট ম্যান’স বারডেন’ মাথায় নিয়ে ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গরা এশিয়া, আফ্রিকা আর আমেরিকায় গড়ে তোলা নতুন বসতি স্থলের অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে ‘শান্তির বর্বর যুদ্ধ’ চালিয়ে কত মানুষ হত্যা করেছে তার কোনো লেখাজোখা নেই। এই কবিতা আসলে ট্রাম্পের ঔপনিবেশিক চিন্তাভিত্তিক মতাদর্শের একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ।

কিপলিংয়ের ভাষ্যে মোগলি শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব আর বুদ্ধির প্রতীক। আর শের খান ভয় ও হিংস্রতার প্রতীক। এই গল্পে কিপলিংয়ের ‘আমরাই অন্যদের সভ্য করব’ দর্শন দেখা যায়।
ছবি: এআই জেনারেটেড

একই ধরনের চিন্তা নিয়ে কিপলিংয়ের লেখা গল্প সংকলন দ্য জঙ্গল বুক –এর ওপর বানানো কার্টুন সিরিজ বহু বছর ধরে সারা দুনিয়ায় জনপ্রিয়।

গল্পের মোগলি চরিত্রটি একজন ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ শিশু যে কিনা দুঘর্টনাবশত জঙ্গলে পশুদের মধ্যে এসে পড়ে। নেকড়ে পরিবারে সে বড় হতে থাকে। এখানে কিশোর বয়সী মোগলি সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে, আর জঙ্গল বা পশুদের দেখানো হয় ‘অসভ্য’ হিসেবে।

দেখানো হয় মোগলির মধ্যে যুক্তি, ভাষা, শৃঙ্খলা আছে। সে নেকড়েদের তথা পশুদেরও শৃঙ্খলা শেখায়। সে ‘বনের আইন’ বোঝে এবং প্রয়োগ করে। সে বিভিন্ন জন্তুর মধ্যে ভারসাম্য আনে। এখানে সে ‘শিক্ষক’।

‘দ্য জঙ্গল বুক’ গল্পের ভিলেন হলো ‘শের খান’ নামের একটি বাঘ। সে বার বার মোগলিকে মারার চেষ্টা করে। ‘শের খান’ নামটি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় মুসলিম শাসক বা যোদ্ধাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ‘খান’ উপাধিটি মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মঙ্গোল, তুর্কি ইত্যাদি নানা ঐতিহাসিক গোষ্ঠীতেও ‘খান’ বংশ আছে।

কিপলিংয়ের ভাষ্যে মোগলি শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব আর বুদ্ধির প্রতীক। আর শের খান ভয় ও হিংস্রতার প্রতীক। এই গল্পে কিপলিংয়ের ‘আমরাই অন্যদের সভ্য করব’ দর্শন দেখা যায়।

আজকের ট্রাম্প ও তাঁর অনুসারীরা কিপলিংয়ের দর্শন ধারণ করে ‘শ্বেতাঙ্গদের দায়’ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এখন তাঁদের দায় ইরানকে ‘সভ্য’ করা, নয়তো পুরো পারস্য সভ্যতাকে মুছে ফেলা।

‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ নাকি ‘ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’?

মনোবিজ্ঞানের ‘ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স’ ধারণামতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজের পরিচয়, ইতিহাস বা মর্যাদা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভোগে, তাহলে তারা অতিরিক্ত ক্ষমতা খাটায়, আধিপত্য বা কঠোরতা দেখায়। আর এর মাধ্যমে তারা সেই ঘাটতি ‘পুষিয়ে’ নিতে চায়।

যাদের দীর্ঘ প্রাচীন সভ্যতার ধারাবাহিকতা নেই, তারা নিজেদের বৈধতা তৈরি করে সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক আধিপত্য দিয়ে। এই কম্পেনসেটরি ডমিন্যান্স বা ভেতরের অনিশ্চয়তা ঢাকতে বাহ্যিক শক্তির অতিরিক্ত প্রদর্শন এক ধরনের রোগ।

এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের কাছে সভ্যতা মানে ইতিহাস, শিল্প, দর্শন, জ্ঞান নয়। তাদের কাছে সভ্যতা মানে গায়ের জোর, সামরিক শক্তি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি। পোস্ট-কলোনিয়াল থিউরি বলে, এ কারণেই পশ্চিমা বিশ্ব বাড়াবাড়িভাবে নিজেকে ‘আধুনিক’ এবং অন্যদের চেয়ে ‘শিক্ষিত’ হিসেবে দেখাতে চেয়েছে।

ট্রাম্পের কাছে মধ্যপ্রাচ্য কোনো সভ্যতা নয়, এটি একটি হিসাবের খাতা। তেল, জ্বালানি, অর্থ-এই হিসাবের বাইরে কিছু নেই। আর যেখানে ইতিহাস আছে, তা মুছে ফেলতে হবে, ফিরিয়ে দিতে হবে তথাকথিত প্রস্তরযুগে।

তাই যখন ট্রাম্প ইরানকে ‘স্টোন এজ’-য়ে ফেরানোর কথা বলেন, তখন সেটিকে শক্তির ভাষা হিসেবে নয়, ব্যর্থতার ভাষা হিসেবেই দেখতে হবে। এটি আসলে রাজনৈতিক ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। এটি নৈতিক দেউলিয়াত্বকে স্বীকার করে নেওয়া।

অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ বলেছিলেন, যে সংঘাত হবে সেটিকে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ বা ‘সভ্যতার সংঘাত’ না বলে বরং ‘ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’ বা ‘অজ্ঞতার সংঘাত’ বলা উচিত হবে।
ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন তাঁর ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্বে বলেছিলেন-ভবিষ্যতের বিশ্বসংঘাত আর অর্থনৈতিক আদর্শের (যেমন সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদ) মধ্যে হবে না; হবে বিভিন্ন ‘সভ্যতার’ মধ্যে; প্রধানত হবে পশ্চিমা বিশ্ব বনাম ইসলামি বিশ্বের মধ্যে।

কিন্তু প্রাচ্যবাদী বুদ্ধিজীবী অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ (আমি যাঁর নাম দিয়েছি ‘পূবালী সাঈদ’) এই ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, যে সংঘাত হবে সেটিকে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ বা ‘সভ্যতার সংঘাত’ না বলে বরং ‘ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’ বা ‘অজ্ঞতার সংঘাত’ বলা উচিত হবে।

ট্রাম্পের মূর্খতা আর অজ্ঞতা ভরা কথাবার্তা শুনে বোঝা যাচ্ছে, পূবালী সাঈদ কেন এই কথা বলেছেন।

‘“সিভিলিজেশন”, যাকে আমরা সভ্যতা নাম দিয়ে তর্জমা করেছি তার যথার্থ প্রতিশব্দ আমাদের ভাষায় পাওয়া সহজ নয়। এই সভ্যতার যে-রূপ আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল মনু তাকে বলেছেন সদাচার।’

ট্রাম্প আমাদের রবীন্দ্রনাথের নাম কোনোদিন শুনেছেন কিনা জানি না। মৃত্যুর ঠিক তিন মাস আগে ১৯৪১ সালের ৭ মে ওই ভদ্রলোকের বয়স ৮০ বছর পূর্ণ হয়। ওই দিন ‘সভ্যতার সংকট’ নামে তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

ওই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘“সিভিলিজেশন”, যাকে আমরা সভ্যতা নাম দিয়ে তর্জমা করেছি তার যথার্থ প্রতিশব্দ আমাদের ভাষায় পাওয়া সহজ নয়। এই সভ্যতার যে-রূপ আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল মনু তাকে বলেছেন সদাচার।’

‘সদাচার’ মানে যে ‘সিভিলাইজেশন’ বা ‘সভ্যতা’, সে কথা গায়ের জোরকে সভ্যতা বলে প্রচার করা ট্রাম্পের না বোঝারই কথা। এ কারণেই তিনি এক রাতে গোটা পারস্য সভ্যতা মুছে দেওয়ার হুমকি দিতে পারেন। কারণ পারস্য সভ্যতার মূল্য তাঁর কাছে একেবারে অজানা। তাঁর হয়তো জানা নেই, কীভাবে ইউরোপীয়দের দমন থেকে তাঁরা নিজেদের কীভাবে বাঁচিয়েছিল।

তবে ওই প্রবন্ধেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দেখে এসেছি, পারস্যদেশ একদিন দুই যুরোপীয় জাতির জাঁতার চাপে যখন পিষ্ট হচ্ছিল তখন সেই নির্মম আক্রমণের যুরোপীয় দংষ্ট্রাঘাত থেকে আপনাকে মুক্ত করে কেমন করে এই নবজাগ্রত জাতি আত্মশক্তির পূর্ণতা সাধনে প্রবৃত্ত হয়েছে। দেখে এলেম, জরথুষ্ট্রিয়ানদের সঙ্গে মুসলমানদের এককালে যে সাংঘাতিক প্রতিযোগিতা ছিল বর্তমান সভ্যশাসনে তার সম্পূর্ণ উপশম হয়ে গিয়েছে। তার সৌভাগ্যের প্রধান কারণ এই যে, সে যুরোপীয় জাতির চক্রান্তজাল থেকে মুক্ত হতে পেরেছিল।’

কিন্তু এইসব জ্ঞানের কথা কি কোনোদিন ট্রাম্পের কাছে পৌছাবে?

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
    ইমেইল: [email protected]