ইরান নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমঝোতার রেশ কাটতে না কাটতেই ইয়েমেনের ঘটনাপ্রবাহ বেইজিংকে নতুন চাপে ফেলেছে। এই সমঝোতা চীনকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে উৎসাহিত করছে। বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইয়েমেনের হুতি মিলিশিয়াদের পৃষ্ঠপোষক ইরান।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধে চীনা কূটনীতিকেরা কোনো পক্ষ নিতে চাননি। ওই যুদ্ধের জেরে ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করেছে এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোয় হামলা চালিয়েছে। চীন ইরানের তেল কেনে; আবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তার বিস্তৃত বাণিজ্যিক, বিশেষত জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে।
ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের অস্থিতিশীলতা এ অঞ্চলে চীনের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলছে। তিন বছর আগে ইরান–সৌদি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করে চীন কূটনৈতিক মহলকে চমকে দিয়েছিল। সেই সমঝোতার সূত্রে তার কিছু দায়ও রয়েছে। এখন তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় অংশীদারত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গত মাসে ঝটিকা অভিযানে হুতিরা সৌদি-সমর্থিত সরকারের কাছ থেকে বন্দর ও ভূখণ্ড দখল করে পশ্চিম ইয়েমেনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এক দশকের বেশি আগে রাজধানী সানা হারানোর পর সরকারটি এডেন থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ২০২৩ সালের মার্চের বেইজিং চুক্তি সৌদি–ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করলেও ইয়েমেনের বিষয়টি সরাসরি নিষ্পত্তি করেনি।
হুতি ও ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ বন্ধের যোগসূত্র পাওয়া যায়। এতে বাব আল-মানদেব প্রণালির গুরুত্ব বেড়েছে। উপসাগরীয় তেল রপ্তানিসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই পথ দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজে এখন হুতিরা হামলা করতে পারে; অন্যদিকে হরমুজে একই হুমকি তৈরি করতে পারে ইরান।
চীন, সৌদি আরব ও ইরানের ত্রিপক্ষীয় পর্যালোচনা বৈঠকগুলোয় ইয়েমেন গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর রিয়াদে দ্বিতীয় বৈঠকের বিবৃতিতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতির ভিত্তিতে সংকটের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমাধান সমর্থন করা হয়।
বেইজিংয়ের শিয়াংশান নিরাপত্তা ফোরামে সাবেক সৌদি কূটনীতিক প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল ইরানের আচরণ বদলাতে চীনের সহায়তা চান। তাঁর মতে, সৌদিতে হামলা বেইজিং চুক্তির লঙ্ঘন। চীনা বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিটি এখনো রিয়াদ–তেহরান যোগাযোগের কার্যকর মাধ্যম। গ্লোবাল টাইমসে অধ্যাপক সু ইং দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ফোনালাপকে এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
স্বার্থ ও সীমাবদ্ধতা
উপসাগরে কর্মরত এক চীনা দূত আল মাজাল্লাকে জানান, কূটনীতিকদের মূল্যায়নে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্প্রসারিত সম্পর্ক সুরক্ষায় চীনের বড় ভূমিকার সুপারিশ রয়েছে। তবে ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্যনীতি এবং অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অবস্থান কার্যকর কৌশল নির্ধারণ কঠিন করে তুলছে।
ইরানের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি অবস্থান নিলে বা হুতিদের উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরোধিতা করলে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব কমতে পারে। অথচ চীনা চাপ ফলপ্রসূ হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। পাশাপাশি ওয়াশিংটন চায়, উপসাগরীয় দেশগুলো প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করুক।
৯ অক্টোবর প্রকাশিত আলহুরা এমবিএনের ‘ইউএস–চায়না ইনফ্লুয়েন্স ইনডেক্স’ অনুযায়ী, সর্বাধুনিক মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ পেতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে মূল নেটওয়ার্ক থেকে চীনা প্রযুক্তি সরাতে বলছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে চীন ক্লাউড কম্পিউটিং, যোগাযোগ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় এআই অবকাঠামোর প্রধান সরবরাহকারী হতে চাইছে।
ফলে চীনের ওপর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ভূমিকা বাড়ানোর চাপ বাড়ছে এমন এক অঞ্চলে, যেখানে নিরাপত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
বাণিজ্যের সুরক্ষা
হুতিরা সৌদি জাহাজের জন্য বাব আল-মানদেব বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং সৌদি বন্দরে পণ্য ওঠানো–নামানো নিয়ে কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করেছে। তবে ২৮ জুলাই রয়টার্স জানায়, ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে হুতিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে লোহিত সাগরে নিজেদের ট্যাংকারের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করেছে চীন।
নভেম্বরে সরবরাহের জন্য চীনা শোধনাগারগুলো অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল কিনেছে। সৌদি আরামকো ও স্থানীয় অংশীদারেরা চীনে নতুন শোধনাগারে প্রথম অপরিশোধিত তেলের চালান পৌঁছানোর কথাও জানিয়েছে। নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা বহাল থাকলে সৌদি তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে, যদিও জাহাজ চলাচলে বৃহত্তর হুতি হুমকি থেকেই যাবে। ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ‘শুধু একটি দেশকেই প্রভাবিত করে’।
৯ অক্টোবর নিরাপত্তা পরিষদে চীন ইয়েমেনের সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পুনর্ব্যক্ত করে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান জানাতে বলে। বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় হামলার নিন্দার পাশাপাশি বেসামরিক মানুষ, অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক জাহাজ সুরক্ষার আহ্বানও জানায়। অর্থাৎ বেইজিং হুতি কর্মকাণ্ডের প্রভাবকে ইয়েমেনের সীমানার বাইরেও বিস্তৃত বলে দেখছে।
সামরিক ইঙ্গিত
গত ২০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে সামরিক উত্তেজনার মধ্যে চীনা ডেস্ট্রয়ার কুনমিং জিবুতির চীনা ঘাঁটি থেকে নৌমহড়া চালায়। প্রণালির অপর পারে ঘাঁটিটির দূরত্ব মাত্র ৪০ কিলোমিটার। মহড়ায় অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সশস্ত্র উদ্ধার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চীন নৌবহরের দায়িত্ব বা সংঘর্ষে জড়ানোর নিয়ম পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়নি। তবে মহড়াটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের হুমকি মোকাবিলায় বাড়তি প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সিএসআইএসের প্রতিবেদনে উপগ্রহচিত্রের ভিত্তিতে জিবুতি ঘাঁটিতে দুটি যোগাযোগ স্থাপনা নির্মাণের কথা বলা হয়, যেগুলোর সংকেত গোয়েন্দা তৎপরতায় সহায়ক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান ও হুতিদের কাছে চীনে তৈরি দ্বৈত ব্যবহারের যন্ত্রাংশ পৌঁছানোর পশ্চিমা প্রতিবেদনও নজর কেড়েছে। কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের দাবি, ইরানের খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্রের সংস্করণ তৈরির জন্য হুতিরা চীনা সরবরাহকারীর কাছ থেকে যন্ত্রাংশ কিনেছে। হুতিদের উপগ্রহচিত্র ও সামুদ্রিক নজরদারি তথ্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে।
চীন বলছে, তারা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে। তবে চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বৈধতা স্বীকার করে না।
দ্বিমুখী বাস্তবতা
গত মাসে মারিবে চীনা ডং ফেং–১৫এ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ায় এর উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের এই ক্ষেপণাস্ত্র নেই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের ধারণা, মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের বাড়তি ভূমিকার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। সৌদি আরব এটি ব্যবহার করলে বোঝা যাবে, অস্ত্রের উৎস বহুমুখী করতে দেশটি চীনা অস্ত্রভান্ডার বাড়িয়েছে।
ইয়েমেন–সংকট চীনের অবস্থানের দুই দিক প্রকাশ করেছে: কাঠামোগত বাধায় তার ভূমিকা সীমিত; আবার অংশীদারত্ব বহুমুখী করতে আগ্রহী আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে চীনা উদ্যোগের প্রয়োজন বাড়ছে।
চীন চাপ দিতে, মধ্যস্থতা করতে এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজে লাগিয়ে স্থিতিশীলতা উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর হিসাব–নিকাশে গড়ে ওঠা সংকট একা মেটাতে পারে না। তাই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সক্রিয় চীনা ভূমিকাই বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা; উত্তেজনা থামানোর মূল দায়িত্ব সরাসরি প্রভাবশালী পক্ষগুলোরই।
চারবেল বারাকাত কুয়েতভিত্তিক লেবাননি সাংবাদিক
সৌদিভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যের ম্যাগাজিন আল মাজালা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত ও সংক্ষেপিত।