গণভোট, জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে যে বিতর্ক এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান, সেটি কেবল একটি আইনি বা কারিগরি বিতর্ক নয়। এটি আমাদের সাংবিধানিক সংস্কৃতি, প্রক্রিয়াগত শুদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থন পাওয়া একটি সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নপদ্ধতি নিয়ে যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জটিলতার বীজ বপন করতে পারে।
প্রথমে একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সংসদীয় নির্বাচন হয়েছে সংবিধানের অধীনে। যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তা বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই বৈধতা পেয়েছে। অন্যদিকে গণভোটে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো ছিল বহুমাত্রিক। কিছু বিষয়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করে বাস্তবায়ন করা তুলনামূলক সহজ।
কোনো এক প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মকে সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে রাখতে পারে না। সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই যুক্তি থেকেই বিএনপির নোট অব ডিসেন্টকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
কিন্তু যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলো গণভোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় একটি নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। গণভোটে মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু সেই মতামত সংসদ কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, তার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়।
সংসদ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকা আলাদা। সংসদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। সংবিধান সংশোধনও সংসদের মাধ্যমেই হয়। যদি বর্তমান সংসদকে হঠাৎ করে একটি সংস্কার পরিষদে রূপান্তর করা হয়, তবে তার আইনি ভিত্তি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। সংবিধান সংশোধন ছাড়া এমন কোনো কাঠামো কার্যকর করা হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
উদাহরণ হিসেবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব ধরা যেতে পারে। যদি সংবিধান সংশোধন করে বলা হয় যে ভবিষ্যৎ নির্বাচন থেকে দ্বিকক্ষব্যবস্থা কার্যকর হবে, তবে সেটি বৈধ প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান সংসদ গঠনের দিন থেকেই সেটি কার্যকর ঘোষণা করা হলে তা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক ঐকমত্য। একটি বড় দল ইতিমধ্যে জানিয়েছে যে সংস্কার পরিষদ গঠনের পদ্ধতিতে তাদের সরাসরি সম্মতি ছিল না। অন্যদিকে কিছু দল হুবহু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে। এই বিভাজন সংসদের ভেতরেই একটি ভিন্নমত তৈরি করছে। গণতন্ত্রে মতভেদ অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা না থাকলে সেই মতভেদ অবিশ্বাসে রূপ নিতে পারে।
গণভোটের প্রশ্নেও একই কথা প্রযোজ্য। সাধারণত সংসদে আলোচনার পর কোনো বড় পরিবর্তনের জন্য গণভোট হয়। এবার প্রক্রিয়াটি উল্টো হয়েছে। প্রথমে আলোচনা, তারপর গণভোট, এরপর সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন। গণভোটে সমর্থন পাওয়া মানেই প্রতিটি প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে, এমন নয়। বিশেষ করে যখন প্রস্তাবগুলো বহুবিধ এবং জটিল। সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
আরও একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা জরুরি। কোনো এক প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মকে সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে রাখতে পারে না। সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই যুক্তি থেকেই বিএনপির নোট অব ডিসেন্টকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। একই সঙ্গে অন্য দলগুলোর দাবিও অগ্রাহ্য করা যায় না। সমাধান একটাই, সংসদে আলোচনা করা।
ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সংস্কার প্রশ্নে মতভেদ থাকলে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্ক টানাপোড়েনে পড়তে পারে। কিন্তু ইতিবাচক দিকও আছে। প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও সংলাপের উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। গণতন্ত্রে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে ধারাবাহিক চর্চার মাধ্যমে। তর্ক, আপস, সমঝোতা ও স্বচ্ছতা এই সংস্কৃতির ভিত্তি।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো সংসদকে কার্যকরভাবে কাজ শুরু করতে দেওয়া। অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, সহিংসতা রোধ এবং জনজীবনের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সংবিধান সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, কিন্তু সেটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প নয়। বরং স্থিতিশীলতার ভিত মজবুত হলেই সংস্কার টেকসই হয়।
রিদওয়ানুল হক সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক
*মতামত লেখকের নিজস্ব