কংগ্রেসের নতুন কৌশল, বিজেপি কি উত্তরপ্রদেশ ধরে রাখতে পারবে?

নরেন্দ্র মোদি, রাহুল গান্ধী ও যোগী আদিত্যনাথফাইল ছবি

কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে মাত্র এক মাস হলো। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যেই আবার নির্বাচনের আমেজে ফিরে এসেছি। পরবর্তী সাধারণ বা লোকসভা নির্বাচন ঘোষণার আগে যে আড়াই বছর সময় আছে, তা হবে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই ও সংঘাতের। এই সময়ে কোনো পক্ষই কাউকে ছাড় দেবে না।

২০২৭ সালে উত্তর প্রদেশে বড় রাজনৈতিক লড়াই হবে। পাশাপাশি পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড, গোয়া ও মণিপুরে নির্বাচন হবে। বছরের শেষভাগে নির্বাচন হবে হিমাচল ও গুজরাটে। ২০২৮ সালে কর্ণাটক, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় ভোট হবে। এগুলোর বেশির ভাগই বড় রাজ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট ছোট রাজ্যগুলো। সব দলের জন্যই এবারের বাজি অনেক বড়, বিশেষ করে বিজেপি ও কংগ্রেসের কাছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও রয়েছে। সেখানে বিজেপি আপাতত সুবিধাজনক অবস্থানেই আছে।

তবে কোন দিকে রাজনীতির হাওয়া বইছে, তা ঠিক করে দেবে উত্তর প্রদেশের নির্বাচন। সেখানে বিজেপিকে টানা তৃতীয়বারের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে হবে। তবে দলটিকে তীব্র প্রতিষ্ঠানবিরোধী জনরোষের মুখে পড়তে হতে পারে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের মতো এখানেও বড় কোনো অঘটন ঘটাতে কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টি (এসপি) তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এসপি ইতিমধ্যেই গরিব নারীদের ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে রাম মন্দিরের তহবিল তছরুপের অভিযোগ এনে বিজেপিকে কোণঠাসা করতে এসপি ও কংগ্রেস দুই দলই মুখিয়ে আছে।

উত্তরপ্রদেশ কেবল লোকসভায় ৮০ জন সংসদ সদস্য পাঠায় বলেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং ২০২৭ সালে এখানে যা ঘটবে, তা ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে পুরো ভারতের মেজাজ কেমন থাকবে, তার একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে।

বিজেপি ভালো করেই জানে যে ২০২৯ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে তাদের উত্তরপ্রদেশে জিততেই হবে। আর এই কারণেই তারা নারী সংরক্ষণ ও আসন পুনর্নির্ধারণের (ডিলিমিটেশন) এজেন্ডা নিয়ে এত আগ্রাসীভাবে মাঠে নেমেছে। তারা লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার চেষ্টা করছে। এই সংখ্যার জোরে তারা বিরোধী জোটের দলগুলোকে ভাঙতে চায়। তামিলনাড়ুতে ক্ষমতা হারানোর পর ডিএমকে হয়তো বিজেপির দিকে কিছুটা ঝুঁকতে পারে। তৃণমূলের ভেতরে বড় ভাঙন ধরেছে। একই অবস্থা শিবসেনারও। কেবল সমাজবাদী পার্টিই এখন পর্যন্ত শক্ত অবস্থানে টিকে আছে। কারণ তারা ২০২৭ সালের নির্বাচনে নিজেদের জয়ের ভালো সম্ভাবনা দেখছে।

বিজেপি নারী সংরক্ষণ ও আসন পুনর্নির্ধারণ—উভয় বিষয়ের ওপরই জোর দিচ্ছে। কারণ ভোটারদের বিন্যাস নিজেদের অনুকূলে আনতে তাদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে সাজাতে হবে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে। তাত্ত্বিকভাবে, তারা লোকসভার বর্তমান ৫৪৩টি আসনের ভেতরেও নারী সংরক্ষণ আইন পাস করতে পারে। বিরোধীরাও এতে সমর্থন দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এই ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ভাগাভাগি করতে গেলে অন্য দলগুলোর চেয়ে বিজেপির নিজস্ব বর্তমান এমপিরাই বেশি আসন হারাবেন।

এই কারণেই তারা সব রাজ্যের আসন সংখ্যা সমানুপাতিক হারে ৫০ শতাংশ বাড়াতেও রাজি। যদিও এটি উত্তর ভারতে তাদের নিজস্ব ঘাঁটির লোকসান ঘটিয়ে করতে হচ্ছে। জনসংখ্যাভিত্তিক আসন পুনর্নির্ধারণে হিন্দি বলয়ের বড় অংশ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৯ সালের জয় নিশ্চিত করতে উত্তর ভারতে একটি স্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ হাতছাড়া করতেও বিজেপি প্রস্তুত। আসন সংখ্যা সমানুপাতিক হারে বাড়ালে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর বিরোধিতাও কমে আসবে। এই আসন পুনর্নির্ধারণ বিল পাস হলে বিজেপি অনেক শক্তিশালী অবস্থানে চলে যাবে।

তবে এখনই সবকিছু নিশ্চিত ধরে নেওয়া বিজেপির জন্য ঠিক হবে না। কারণ কংগ্রেস ২০২৪ বা ২০১৯ সালের চেয়ে এবার অনেক ভালোভাবে তাদের ঘুঁটি চালছে। কংগ্রেসের বর্তমান চাল বা কৌশল যে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছে, তার তিনটি স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে:

প্রথমত, তারা দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ আসন পাওয়ার ওপর মনোযোগ দিচ্ছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকের পরাজয়ের পর আকস্মিকভাবে দলটির হাত ছেড়ে ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে)-এর দিকে ঝুঁকে পড়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তারা অভিনেতা জোসেফ বিজয়ের (থালাপতি) ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে চায়। কর্ণাটকে সিদ্দারামাইয়ার জায়গায় দলের রণকৌশলী ডি কে শিবকুমারকে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, দলের কাছে জয়টাই শেষ কথা। শিবকুমার ইতিমধ্যেই কর্ণাটকের রাজ্যসভা নির্বাচনে বিজেপির কিছু বিধায়ককে ক্রস-ভোটিং করিয়ে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন। দলটি কেরালা ও তেলেঙ্গানায় সিংহভাগ আসন পাওয়ার আশা করছে এবং অন্ধ্রপ্রদেশেও সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করবে।

দ্বিতীয়ত, উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কৌশলটিই কংগ্রেসের মূল চাবিকাঠি। দলটি উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টিকে নিয়ে জানপ্রাণ দিয়ে লড়বে। এবং একই সঙ্গে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড় রাজ্যে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির হাওয়া রুখে দিতে তারা বামপন্থী ও তৃণমূলকে নিয়ে একটি ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা করতে পারে। বিহারে নীতিশ কুমারের বিদায়ের পর আরজেডি-কংগ্রেস জোট ২০২৪ সালের চেয়ে এবার বেশি আসন পাওয়ার আশা করছে। আর মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস এনসিপিকে তাদের পাশে ফেরত চাইবে। তবে শিবসেনা সম্ভবত একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে বিজেপির শিবিরে ফিরে যাবে। পাঞ্জাবের লড়াইটি আপ, কংগ্রেস, বিজেপি এবং আকালি দলের মধ্যে চতুর্মুখী হতে যাচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কংগ্রেসের আসন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে মণিপুরের মতো রাজ্যে, যেখানে জাতিগত সহিংসতা এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

তৃতীয়ত, কংগ্রেসের আরেকটি বড় চাল হবে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা দেওয়ার বড় বড় প্রতিশ্রুতি। এতে দেশের অর্থনীতি বা সরকারি তহবিলের যত বড় ক্ষতিই হোক না কেন, তারা সেটা ভাববে না।

২০২৪ সালের নির্বাচনে যে ভেতরের কোন্দলের কারণে বিজেপি উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছিল, তা তারা এখন মিটিয়ে ফেলেছে। বিজেপি আশা করছে যে, আসন পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) ও নারী সংরক্ষণ বিল পাস করিয়ে তারা ২০২৯ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে। তবে তারা ঠিক সেই ভুলটিই করছে, যা কংগ্রেস ২০১৪ সালে করেছিল: কোনো একজন ব্যক্তিকে অতিরিক্ত নিশানা বা আক্রমণ করা। সে সময় ব্যক্তিটি ছিলেন নরেন্দ্র মোদি, আর এবার বিজেপি নিশানা করছে রাহুল গান্ধীকে—যা উল্টো রাহুলের জন্যই লাভজনক হয়ে উঠছে। রাহুলকে অনবরত আক্রমণ করে বিজেপি পরোক্ষভাবে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, ২০২৯ সালের লড়াইয়ে তিনিই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

কোনো পক্ষই অপর পক্ষকে এক চুলও ছাড় দেবে না। এর অর্থ হলো, এখন থেকে ২০২৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আমরা এক চরমপন্থী রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এর সঙ্গে সম্ভাব্য খরা বা অনাবৃষ্টি বিজেপির দুঃখের ঝুলিকে আরও ভারী করবে। ফলস্বরূপ, বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ থমকে যাবে এবং সংসদে বড় কোনো নতুন আইন পাসের সম্ভাবনাও কমে আসবে।

  • আর জগন্নাথন ভারতের ‘স্বরাজ্য’ ম্যাগাজিনের সাবেক এডিটোরিয়াল ডিরেক্টর ও প্রবীণ সাংবাদিক।

দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ