এবারের নির্বাচন কেন ‘ছেলিবিটি’ শূন্য

সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন শিল্পী কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন, মনির খান, আমিনুল হক। ফাইল ছবিছবি: সংগৃহীত

একটা মজার ঘটনা দিয়ে শুরু করি। আওয়ামী আমলের কোনো এক নির্বাচনে গানের জগতের তারকা মমতাজ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের উত্তরাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় নারীদের ‘বিটিছেলি’ বলেন গ্রামের লোকজন। প্রার্থীদের প্রচারণায় একজন বারবার বলছিলেন, ‘এবার অনেক সেলিব্রিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।’ গ্রামের মানুষ একে অন্যকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘আমরা তো এতকাল ‘বিটিছেলি’ বলেছি, এখন থেকে তাহলে কি ‘ছেলিবিটি’ বলা লাগবে?’

নির্বাচনে তারকাদের অংশগ্রহণ কমবেশি সব দেশেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একজন টিভি তারকা বটে। এ ছাড়া রোনাল্ড রিগ্যান, আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, জেসে ভেনচুরা, অ্যাল ফ্রাংকিন ছাড়াও শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের আরও বেশ কজন তারকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন এবং অনেকে হতে পারেননি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা ভলোদিমির জেলেনস্কি তো মহাবিক্রমে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে মনে হয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারকারা বেশ বড় অংশ দখল করে আছেন। পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছেন ৯ জন মুভি তারকা। কেন্দ্রে ১১ জন।

আরও পড়ুন

আমাদের ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারকাদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। ঢাকার একটি আসনে কেবল মেঘনা আলম নামের একজন মডেল ‘ছেলিবিটি’ প্রার্থী হয়েছিলেন। তেমন উল্লেখযোগ্য ভোট পাননি।

অনেকে বলবেন আওয়ামী আমলে সাংস্কৃতিক অঙ্গন রমরমা ছিল। আসাদুজ্জামান নূর, তারানা হালিম, ফারুক, কবরী, ফেরদৌসের মতো ডাকসাইটে তারকারা সদস্যসহ মন্ত্রিত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তারকা খেলোয়াড়রাও কম যাননি। তাঁদের বেশির ভাগই কেউ জেলে, কেউ লাপাত্তা, কেউ মৃত। সাধারণত তারকাদের খ্যাতি কাজে লাগিয়ে মনোনয়ন দেওয়া দলগুলো নির্বাচনে জিততে চায়। মুভি বা খেলোয়াড় তারকারা সাধারণ মানুষের কাছে খুব পরিচিত ও জনপ্রিয়। তাই দল মনে করে তাঁদের জনপ্রিয়তা ভোটে রূপান্তর হতে পারে। তারকারা নির্বাচন করলে মিডিয়ায় বেশি খবর হয়। এতে দলের প্রচারণা স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়। অনেক তরুণ ভোটার রাজনীতিতে আগ্রহী না হলেও প্রিয় তারকার জন্য ভোট দিতে আগ্রহী হন।

তারকারা যে সব সময় খুব সফল রাজনীতিক হন না, এমন উদাহরণও কম নয়। যেমন ভারতের অমিতাভ বচ্চন, মুনমুন সেন, জয়া প্রদা, গোবিন্দ, রাজেশ খান্না, মিঠুন চক্রবর্তী প্রমুখ। হলিউডের অ্যাল ফ্রাংকিন, ফ্রেড গ্রান্ডি, বেন জোনস—এঁরাও অসফল তারকা রাজনীতিক।

কিন্তু এবারের ২০২৬ জাতীয় নির্বাচনে কোনো দল কেন তারকাদের মনোনয়ন দিল না? ভালো তারকাদের সবাই কি আওয়ামী ঘরানার? নাকি আমাদের শিল্পাঙ্গনের লোকজন পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের মুভি তারকাদের মতো রাজনৈতিক ক্ষমতাকে শিল্পের ওপরে স্থান দিতে নারাজ? অনেকে হয়তো বলবেন প্রখ্যাত অভিনয় ও কণ্ঠশিল্পীরা তো বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। আর যাঁরা দেশে ছিলেন হয় তাঁরা অন্তরীণ নাহয় অন্তর্লীন।

ইসলামি দলগুলোর তো তারকার বালাই নেই। নেই যে একেবারে তা–ও বলা যাবে না। সামাজিক মাধ্যমের রিল, টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুকে ওয়াজ-তারকারা কয়েক বছর দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে তাদের সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীও সেভাবে টিকে থাকতে পারেনি। বঞ্চিত শিল্পীরা আবার উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে পরবর্তী নির্বাচন চলে আসবে।

তবে তারকারা যে সব সময় খুব সফল রাজনীতিক হন না, এমন উদাহরণও কম নয়। যেমন ভারতের অমিতাভ বচ্চন, মুনমুন সেন, জয়া প্রদা, গোবিন্দ, রাজেশ খান্না, মিঠুন চক্রবর্তী প্রমুখ। হলিউডের অ্যাল ফ্রাংকিন, ফ্রেড গ্রান্ডি, বেন জোনস—এঁরাও অসফল তারকা রাজনীতিক।

আরও পড়ুন

আজকাল রাজনীতিতে আগ্রহী অনেকেই সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের তারকাদের বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন। চলচ্চিত্রের বড় পর্দা প্রেক্ষাগৃহ-বাণিজ্য মন্দার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কাছে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে, হাতের তালুতে রাখা ছোট পর্দার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। ছায়াছবির মানুষদের প্রতি জনগণের আগ্রহ চিরকালীন। কেবল জনপ্রিয়তার খাতিরে রাজনৈতিক প্রজ্ঞাহীন তারকাদের মনোনয়ন না দেওয়ার সংস্কৃতি, এটা একটা শুভ লক্ষণ। ছোট পর্দার সামাজিক মাধ্যমে প্রজ্ঞাবান ও সৎ রাজনীতির তুখোড় বাগ্মীদের পরবর্তী নির্বাচনে বেছে নিতে মানুষ বেশ সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠছেন বলে মনে হয়।

  • উম্মে মুসলিমা সাহিত্যিক

    ই–মেইল[email protected]

মতামত লেখকের নিজস্ব