সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে স্কেল, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কী

সরকারি চাকরিতে সর্বশেষ পে কমিশন হয়েছিল ২০১৫ সালে।ছবি: পেক্সেলস, গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বাংলাদেশে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল কার্যকর হবে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

নিঃসন্দেহে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় একটি যৌক্তিক উদ্যোগ। এটি বাস্তবায়িত হলে তাঁদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য যখন নতুন পে স্কেল, ভাতা ও নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রাষ্ট্র এতটা সচেতন, তখন দেশের বিশাল বেসরকারি চাকরিজীবী জনগোষ্ঠীর জন্য কী করা হচ্ছে?

সরকার কি পারে না তাঁদের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে, যার মাধ্যমে এই খাতে কর্মরত মানুষেরা আশার আলো দেখতে পাবেন?

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশই সৃষ্টি হয় বেসরকারি খাতে। অর্থাৎ ৫ থেকে ৬ কোটি মানুষ বেসরকারি চাকরি, কৃষি, শিল্প, সেবা খাত এবং আত্মকর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত।

অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অবদান অনস্বীকার্য। দেশের রপ্তানি আয়, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, গণমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে প্রায় সব খাতেই বেসরকারি কর্মীদের শ্রম ও মেধা দেশের অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি। অথচ সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। তাঁদের জন্য কোনো সমন্বিত নীতিমালা নেই। তাঁরা যেন অভিভাবকহীন একটি জনগোষ্ঠী। অনেক বিষয় বিবেচনা করলে মনে হয়, সরকার তাঁদের সঙ্গে যেন বিমাতাসুলভ আচরণ করছে।

একদিকে যেমন সরকারি চাকরিজীবীরা নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি, টাইম স্কেল, উৎসব ভাতা, চিকিৎসাসুবিধা, পেনশন ও চাকরির নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন, অন্যদিকে অধিকাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত ছুটি, অনিশ্চিত চাকরি এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল বেতন নিয়ে কাজ করেন। কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত ও কার্যকর নীতিমালার অভাবও দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।

কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের চাকরির নিরাপত্তা, ন্যূনতম বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক করা, বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধসহ বিভিন্ন বিষয় নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ‘বেসরকারি সার্ভিস রুলস’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নিজেদের সুবিধামতো নীতিমালা তৈরি করছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কর্মীরা প্রয়োজনীয় সুরক্ষা পাচ্ছেন না। কোনো কারণ ছাড়াই কর্মক্ষেত্র থেকে ছাঁটাই করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কর্মশক্তি যদি বেসরকারি খাত হয়, তাহলে তাদের জন্যও একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো থাকা সময়ের দাবি। অন্যথায় একটি অংশের জীবনমান উন্নত হলেও বৃহত্তর কর্মজীবী জনগোষ্ঠী বঞ্চিতই থেকে যাবে।

এদিকে সম্প্রতি প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বজনীন পেনশন–ব্যবস্থার আওতায় বেসরকারি কর্মীদের জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো অনেক প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এগুলো কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা খুবই কঠিন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে হয়তো আমরা সবাই জানি। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি অনেক সময় মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদি বাজার নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন সমানতালে না হয়, তাহলে এর প্রভাব সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ে। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবীরা, যাঁদের বেতন একই হারে বৃদ্ধি পায় না, তাঁরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন।

আরও পড়ুন

এখানে বিষয়টি সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বা বিরোধের নয়। সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তাঁদের ন্যায্য বেতন পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে রাষ্ট্রের উন্নয়ন, কর আদায়, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে বেসরকারি খাতের কোটি কোটি মানুষের অবদান রয়েছে। তাঁদের স্বার্থ ও কল্যাণও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। দাবি রাখে তাদের জন্য এমন একটি নীতিমালার, যা তাদের কর্মসংস্থান-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত করতে ভূমিকা রাখবে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বিষয়টি তুলে ধরার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও উঠে এসেছে বিষয়টি।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের মতে, একজন প্রধানমন্ত্রী বা সরকার কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের নয়, পুরো দেশের মানুষের প্রতিনিধি। সরকারি কর্মচারীদের জন্য পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য ন্যূনতম কর্মসংস্থানের মানদণ্ড, চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতনকাঠামো, পেনশন–সুবিধা ও শ্রমিকবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে, বেসরকারি খাতে কর্মরত কয়েক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার মান উন্নয়নের কাজ না করে সামগ্রিক দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কর্মশক্তি যদি বেসরকারি খাত হয়, তাহলে তাদের জন্যও একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো থাকা সময়ের দাবি। অন্যথায় একটি অংশের জীবনমান উন্নত হলেও বৃহত্তর কর্মজীবী জনগোষ্ঠী বঞ্চিতই থেকে যাবে।

সরকার যদি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, তাহলে শুধু ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী নয়, বরং দেশের কয়েক কোটি বেসরকারি কর্মীর স্বার্থকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, রাষ্ট্র সবার, আর উন্নয়নের সুফলও সবার জন্য হওয়া উচিত।

  • হুমায়ুন আহমেদ করপোরেট কমিউনিকেশনস খাতে মিডিয়া রিলেশনস নিয়ে কাজ করছেন
    মতামত লেখকের নিজস্ব