উম্মে ওয়ারার কলাম
দায়মুক্তি অধ্যাদেশের পরিণতি কী হতে পারে
দায়মুক্তি অধ্যাদেশের পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে লিখেছেন উম্মে ওয়ারা
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে (১২ মার্চ) অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়। এগুলো যাচাই–বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। ২ এপ্রিল এই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ সংসদে হুবহু বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয় বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে।
৯৮টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের সুরক্ষা সম্পর্কিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’। এই অধ্যাদেশটির বিল পাস করা হলে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হবে। এ ছাড়া নতুন কোনো মামলা বা অভিযোগও করা যাবে না গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে। মূলত জুলাই–আগস্ট মাসে আন্দোলনকারীদের দ্বারা কোনো ফৌজদারি অপরাধ ঘটে থাকলেও তারা আইনি সুরক্ষা পাবে এই আইনের মাধ্যমে।
দায়মুক্তির জন্য আইন প্রণয়ন ও অধ্যাদেশ জারির ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রণীত এ ধরনের আইন ও অধ্যাদেশ সত্যিই কি দীর্ঘ মেয়াদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইতিহাসে কতটা কার্যকারিতা পেয়েছে বা হারিয়েছে দায়মুক্তির আইনগুলো?
২.
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম দায়মুক্তি দেওয়া হয়, ১৯৭৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জারি করা ‘দ্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল লিবারেশন স্ট্রাগল (ইনডেমনিটি) অর্ডার’–এর মাধ্যমে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের আইনি সুরক্ষা দেওয়া।
আদেশটিতে বলা হয়, জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের স্বার্থে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং স্থিতিশীলতা রক্ষা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে করা কোনো কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পরেও প্রায় দেড় মাসের বর্ধিত দায়মুক্তির সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন কাজের জন্য তখন দায়মুক্তি পেয়ে যায় সংশ্লিষ্ট অনেকেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে মতিঝিলে শেখ ফজলুল হক মনি উর্দু দৈনিক পাসবান-এর অফিস ও প্রেস দখল করে দায়মুক্তি পেয়ে যান, যেখান থেকে তিনি পরবর্তী সময়ে বাংলার বাণী পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। (মহিউদ্দিন আহমদ, প্রথম আলো, ১৮ অক্টোবর, ২০২৪)।
ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয়বারের মতো দায়মুক্তি দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গঠিত আধা সামরিক রক্ষীবাহিনীকে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী অধ্যাদেশ ১৯৭২’ জারির মাধ্যমে। অ্যান্টনি মাসকারেনহাস তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড (১৯৮৬)–এ উল্লেখ করেন, ১৯৭৩ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ডের মোট সংখ্যা দুই হাজার অতিক্রম করেছিল (পৃষ্ঠা ৩৭)।
রক্ষীবাহিনীর কার্যকলাপের সমালোচনা যখন তুঙ্গে ওঠে এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে, তখন ১৯৭৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রক্ষীবাহিনী অধ্যাদেশে একটি সংশোধনী জারির মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীকে বিনা ওয়ারেন্টে যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার এখতিয়ার দেওয়া হয় এবং রক্ষীবাহিনীর সব কার্যকলাপ আইনসংগত বলে ঘোষণা করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদের আমলে রক্ষীবাহিনী বিলোপ করে সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাহিনীটি বিলোপ করার জন্য ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সামরিক বাহিনীতে আত্তীকরণ) অধ্যাদেশ-১৯৭৫ জারি করা হয়।
এর কিছুদিন আগেই ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫–এর মাধ্যমে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। এখানে বলা হয়, তৎকালীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবর্তন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে সামরিক আইন ঘোষণার জন্য বা প্রস্তুতি বা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা গৃহীত কোনো পদক্ষেপ আইনি দায়মুক্তির আওতায় পড়বে। চার বছর পর ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে এই অধ্যাদেশটিকে সংসদে আইনে পরিণত করা হয়।
এর আগে একই বছরের (১৯৭৯) ৯ এপ্রিল সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী পাস হয়, যেখানে ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ থেকে ৯ এপ্রিল, ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক আইনের অধীনে চার বছরের সব অধ্যাদেশ ও ঘোষণাকে বৈধ ও অনুমোদিত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে, বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্ক লিমিটেড মামলায় (২০১০) সংবিধানের এই ৫ম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়।
এ ছাড়া ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে সংসদে ১৯৭৫ সালের দায়মুক্তির আইনটি বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যায় অংশগ্রহণের দায়ে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলে ২০০৯ সালের নভেম্বরে সর্বোচ্চ আদালত থেকে ১১ জনের ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়।
চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশে দায়মুক্তির ঘটনা ঘটে ২০০৩ সালে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তিতে পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্টের’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যৌথ বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়া হয় ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩’ পাস করার মাধ্যমে। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে সে সময়ে ৪০ জনের বেশি মানুষের হেফাজতে মারা যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে।
দায়মুক্তির এই আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১২ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন বিশিষ্ট আইনজীবী জেড আই খান পান্না৷ আইন প্রণয়নের ১২ বছর পর ২০১৫ সালে হাইকোর্ট যৌথ অভিযানের দায়মুক্তির আইনটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘জাতীয় সংসদকে সতর্ক থাকতে হবে যেন এ ধরনের সংবিধানের চেতনাপরিপন্থী আইন আর প্রণীত না হয়। ইচ্ছাধীন হত্যাকে দায়মুক্তি দিতে সংসদ কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না।’
রায়ে আরও বলা হয়, ‘মামলার নথিপত্র ও পেপার ক্লিপিং থেকে এটা স্পষ্ট যে যৌথ বাহিনীর দায়মুক্তি আইন যে সময়ের জন্য করা হয়েছে, ওই সময় দেশে এমন কোনো ভয়াবহ আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়নি বা দেশে ব্যাপক কোনো নৈরাজ্যও সৃষ্টি হয়নি। তাই যৌথ বাহিনীর দায়মুক্তি আইন ২০০৩-এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রাণহানির কার্যকে যে দায়মুক্তি প্রদান করা হয়েছে, সেই দায়মুক্তি সংবিধানের ৩১, ৩২, ৪৬, ৪৭ (৩) এবং ৪৭ (ক)-এর বিধান মোতাবেক অসামঞ্জস্যপূর্ণ। দায়মুক্তি আইনটি সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে প্রণয়ন হয়নি। সুতরাং আইনটি বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো।’ (ডয়চে ভেলে বাংলা, ৩ জানুয়ারি ২০১৭)।
এর ফলে যৌথ বাহিনীর ওই অভিযানের সময় যাঁরা হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের পক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে পঞ্চমবারের মতো দায়মুক্তির আইন প্রণয়ন করা হয় আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় যাত্রার শুরুতেই। ২০১০ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন (২০১০) পাস করে সরকার, যা মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দরপত্র বা কোনো ধরনের আইনি যাচাই-বাছাই ছাড়াই কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। এই আইনের অন্যতম বিতর্কিত দিক ছিল দায়মুক্তি। এই আইনের অধীনে গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না মর্মে ধারা ৯ যোগ করা হয়। শুধু তা–ই নয়, এরপর চার দফায় এই আইনের মেয়াদ বাড়ানোও হয়।
সর্বশেষ ২০২১ সালে পাঁচ বছরের জন্য আইনটির মেয়াদ বাড়ানো হয় সংশোধনীর মাধ্যমে। এর ফলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আইনটি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ২০১০–এর এই আইনটির ৯ ধারায় বিদ্যমান দায়মুক্তির বিধান অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। একই মাসে এই বিশেষ আইন বাতিল ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লিখিত ৪৬ অনুচ্ছেদের আলোকে দায়মুক্তি আইনের স্পষ্ট বৈধতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সরকারের আমলে জারি করা দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ও আইন পরবর্তী সময়ে আদালতের মাধ্যমে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। অর্থাৎ যেকোনো দায়মুক্তি আইনের বৈধতা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থেকেই যায়। শুধু তা–ই নয়, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দায়মুক্তির অধ্যাদেশ ও আইন বাতিলের নজিরই বেশি দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে। তাই ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জ এড়ানোর জন্য জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তির অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করার আগে সংশ্লিষ্ট কিছু ধারা পরিবর্তন বা পরিমার্জনের প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়।
৩.
‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ ২০২৬’–এর প্রথম বাক্যেই দায়মুক্তির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু আন্দোলনটি জুলাইয়ের শেষ ১৫ দিন থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী হয়েছিল। এই সময়সীমার আগে ও পরে সংঘটিত ফৌজদারি অপরাধের দায়মুক্তি নিয়ে আইনটি ভবিষ্যতে আইনি জটিলতায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা থেকেই যায়। এ ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে কেউ ১৯৭৩ সালের দায়মুক্তি আদেশের উদাহরণ দিতে পারেন, কিন্তু এভাবে সুবিধামতো বা অতীতের উদাহরণ টেনে বর্ধিত সময়ের দায়মুক্তি নিয়ে আইনি জটিলতা কমানো যাবে বলে মনে হয় না।
এ ছাড়া অধ্যাদেশটির ধারা ২ (ক) তে বলা হয়েছে, ‘গণ-অভ্যুত্থানকারী’ অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি; এটা একটি সমস্যাযুক্ত সংজ্ঞা বলেই মনে হয়। কেননা, এই সংজ্ঞাটির পরিসীমা এতটাই ব্যাপক যে যেকোনো ব্যক্তি নিজেকে আন্দোলনকারী হিসেবে ওই সময়ে সংঘটিত কৃত অপরাধের দায়মুক্তি চাইতে পারে। কেননা ‘গণ-অভ্যুত্থানকারী’ হিসেবে এই সুবিধা পাওয়ার মানদণ্ড এই সংজ্ঞায় উল্লেখ নেই।
আরেকটি বিষয় হলো, অধ্যাদেশটিতে বলা হয়েছে, ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ অর্থ রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। [ধারা ২ (ঘ)] ফৌজদারি কার্যবিধি বা সিআরপিসিতে সংশোধনী না এনেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ভার দেওয়াতে পুরো প্রক্রিয়াই ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা যায়।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, অতীতের দায়মুক্তিগুলো দেওয়া হয়েছিল ভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ১৯৭৪ সালে রক্ষীবাহিনীর, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবকে হত্যাকারীদের বা ২০০৩ সালের যৌথ বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা দিতে। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের কিংবা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষার প্রয়োজন কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায়। কিন্তু বর্ধিত দায়মুক্তির আড়ালে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দায়মুক্তি পাবে কি না, সেটিও ভেবে দেখা প্রয়োজন।
যেমন জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে কিছুদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতিতে ছাত্র-জনতা যে সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন, সেটিকে যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই, তেমনি সে সময়ে পুলিশ হত্যাসহ আরও অনেক ফৌজদারি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকেও উপেক্ষা করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
গত ৩০ মার্চ সংসদ অধিবেশনে জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী পুলিশ হত্যার বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘যুদ্ধের ময়দানে ফয়সালা হয়ে গেছে।’ ইতিহাসের নানা বাঁকে ঘটে যাওয়া অমীমাংসিত অধ্যায় কি আসলেই এভাবে ফয়সালা হয়ে যায়? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারায় সময়ই হয়তো এর উত্তরও বলে দেবে।
উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
