বাজেট বড় হচ্ছে, মানুষের সুবিধা কতটা বাড়ছে

আমাদের দেশটা আয়তনে ছোট, কিন্তু জনসংখ্যা বিপুল। এই দেশের সম্পদও সীমিত। ফলে এর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর কিছুটা আলোচনা আমরা প্রতিবছর দেখি যখন বাজেট উপস্থাপন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

আগের মতো এবারের বাজেটের শুরুতেও একটা প্রলম্বিত রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সব সুন্দর সুন্দর কথা বলা হয়েছে। সব সরকারের আমলেই আমরা দেখি যে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার পারদটা অনেক উঁচুতে নিয়ে যাওয়া হয়।

কিন্তু যখন আমরা বাজেটের বাস্তবায়ন দেখি, তখন দেখা যায় যে অনেক ক্ষেত্রেই বাজেট বরাদ্দ থাকে নামমাত্র। আমাদের অনেক সমস্যা। সরকারকে অর্থনীতির এবং সমাজজীবনের সব খাতকে উদ্দেশ্য করেই বাজেটটা দিতে হয়। সব খাতেরই কিছু চাহিদা আছে এবং তার মধ্যে সমন্বয় করে একটা বাজেট তৈরি করা খুবই চ্যালেঞ্জিং।

বাজেটে বর্তমানের মূল্যস্ফীতি শতকরা ৯ ভাগ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার নয় যে ঘোষণা দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না। মূল্যস্ফীতি যেসব কারণে হয়, সেগুলো সমাধান না করা হলে, এটা থেকে যাবেই। আমাদের দেশে মুদ্রা সরবরাহের তুলনায় পণ্য সরবরাহ কম। ফলে প্রতিটি জিনিসের দাম লাফিয়ে বাড়ে। আমরা যতই স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্প বলি না কেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের উৎপাদন খুব সীমিত। আমাদের আমদানি করতে হয়। এমনকি কৃষিপণ্য আমাদের আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়।

এরপর আমরা দেখি যে মূল্যস্ফীতি যখন হিসাব করা হয়, তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটা গড় করে হিসাবটা করা হয়। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষের প্রধান ব্যয় হয় খাদ্যে। খাদ্যশস্যের দামের ওঠানামার ওপরেই মূল্যস্ফীতির হিসাবটা করা হয়।

কিন্তু আমরা জানি, আমাদের দেশে খাদ্যবহির্ভূত যেসব খাত আছে, সেখানে মুদ্রাস্ফীতি একেবারেই লাগামছাড়া। এখানে আমরা স্বাস্থ্যের কথা বলতে পারি। একটি বাড়িতে যদি একজন ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে যান, তখন তাঁর চিকিৎসা করাতে গেলে জমিজমা, ঘটিবাটি ইত্যাদি অনেক কিছু বিক্রি করতে হয়। এগুলো মূল্যস্ফীতির হিসাবের মধ্যে আসে না।

আরও পড়ুন

শুধু চালের দামের ওঠানামা দিয়ে মূল্যস্ফীতি বোঝা যায় না। প্রকৃত মূল্যস্ফীতি বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে স্বাস্থ্য খাতে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত খরচ কতটা বাড়ছে, শিক্ষা খাতে বাড়ছে, পরিবহন খাতে বাড়ছে, বাড়ি ভাড়ার কতটা বাড়ছে। আমরা গৃহস্থালি কাজে অনেক সামগ্রী ব্যবহার করি, যেগুলোকে একসময় বিলাসসামগ্রী বলতাম। টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, মোটরবাইক—এগুলোকে এখন আর বিলাসসামগ্রী বলা যায় না। এগুলোর দাম কিন্তু লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। 

যা–ই হোক, মুদ্রাস্ফীতি কমাতে হলে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানুষের হাতে অনেক টাকা চলে এসেছে, টাকার মূল্যমান কমে গেছে। বাজারে কোনো জিনিস অবিক্রীত থাকে না। অর্থাৎ একটি শ্রেণির কাছে অনেক টাকা আছে। সুতরাং, এই বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া দরকার।

আমরা বলছি এটা একটি ঘাটতি বাজেট। আগে রাজস্ব বাজেট, উন্নয়ন বাজেট আলাদা করা হতো। এখন একসঙ্গে করা হয়। বাজেটে যে ঘাটতি থাকে, সেটা পূরণ করি ঋণ নিয়ে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আমরা ঋণ করি, আবার বাইরে থেকেও অনুদান বা ঋণ নিই। কিন্তু দেখা যায়, প্রাক্কলন অনুযায়ী ঋণটা পাওয়া যায় না।

জনগণ অতীতে ত্যাগ স্বীকার করেছে, ত্যাগ স্বীকার করতে এখনো তারা প্রস্তুত আছে। কিন্তু দেশের অভিভাবকেরা যদি ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্ত না স্থাপন করেন, তবে মানুষ কেন ত্যাগ স্বীকার করবে? বাস্তবতা হলো একজন করদাতা হিসেবে আমি কর ফাঁকি দিতে চাইব যখন দেখব করের টাকা অপচয় হচ্ছে। তাই অপচয়মূলক অর্থনীতি থেকে যদি বেরিয়ে আসতে না পারি, মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার স্পৃহা বাড়বে না। আর করের স্পৃহা না বাড়লে রাজস্ব আহরণও বাড়বে না।

আবার রাজস্ব আহরণের যে হিসাবটা করা হয়, সেটাও আশানুরূপ হয় না। ফলে প্রতিবছর আমাদের সংশোধিত বাজেট দিতে হয়। সংশোধিত বাজেটে যে কাটছাঁট করা হয়, সেটার কোপটা পড়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপরে। সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের প্রকল্প বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় কম গুরুত্বের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতে হয়তো খরচটা কমে, কিন্তু বরাদ্দ অর্থের বেশির ভাগটাই অপচয় হয়। ফলে বাজেট প্রণয়নের সময়ই কতটুকু বাস্তবায়ন করা যাবে, সেটা দেখা প্রয়োজন।

আমরা প্রতিবছর রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্য নিই, তা থেকে অনেক পেছনে পড়ে থাকি। এর পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আমাদের কর আহরণের ভিত্তি বা ট্যাক্স বেজ খুব সীমাবদ্ধ। জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ভয়ে সরকার এখানে হাত দিতে চায় না। ফলে জনতুষ্টির বাজেট দিতে গিয়ে অনেক কিছু এড়িয়ে যাই। দ্বিতীয়ত, আমাদের রাজস্ব আহরণের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি, সেটা একেবারেই সেকেলে। প্রতিবছরই আমরা বলি, এটি অটোমেশন এবং ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এর বাস্তবায়ন হয় না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবছর অনেক আলোচনা হয়। আমরা প্রায়ই শুনি যে রাজস্ব কর্মকর্তাদের অঢেল সম্পদ আছে, কোটি কোটি টাকা আছে। সব মিলিয়ে রাজস্ব আয় বাড়াতে গেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে একটি সার্জিক্যাল অপারেশন প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া প্রকল্পগুলোর বিষয়ে আমাদের গভীর দৃষ্টি দেওয়া দরকার। দেখা যায়, অনেক অপ্রয়োজনীয় খাতে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়া হয়। যেমন যেখানে রাস্তার প্রয়োজন নেই, সেখানে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ধানখেতের ওপর কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। রডের পরিবর্তে বাঁশ
ব্যবহার করা হয়েছে। এ রকম প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় পর্যায়ের কর্মচারী, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদ ও ঠিকাদার—এই তিন অপশক্তির নেক্সাস তার ফলেই এসব প্রকল্প আসে। প্রতিটি সরকারের আমলেই আমরা দেখি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করেন সরকারি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। মনে হয়, স্থানীয় পর্যায়ে দলের লোকদের ঠিকাদারি দেওয়াটাই এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ। এই ধারা থেকে বের না হতে পারলে প্রকল্পের সুফল জনগণ পাবে না।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের উন্নয়ন বরাদ্দের পরিচালন ব্যয় কমানো হবে। পরিচালন ব্যয়টা কী? আসলে পরিচালন ব্যয়ের নামে আমরা অনেক শ্বেতহস্তী পুষি। যেমন সড়কবাতির ব্যবস্থাপনা দেখতে একজন ফ্রান্স ভ্রমণ করবেন, যা পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ। এ রকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। এই পরিচালন ব্যয়টা সত্যি সত্যি অনেক কমানো যায়। এর জন্য যে ধরনের দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সেটা একটা নির্বাচনমুখী দলের পক্ষে আমাদের মতো দেশে নেওয়াটা খুবই কঠিন।

বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে, সেখানে ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে সামাজিক অবকাঠামোতে ব্যয় বেশি রাখা হয়েছে। এটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিক ব্যয় করা হলে চুইয়ে পড়া তত্ত্ব অনুযায়ী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে অনেক সুবিধা পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এখানে অনেক অপচয় হয়। এই অপচয় বন্ধ না হলে উদ্দেশ্য সফল হবে না। আমাদের পর্যায়ক্রমে অপচয়মূলক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আমাদের বাজেট টাকার অঙ্কে বাড়ছে, খরচ বাড়ছে, কিন্তু এর কতটুকু সুবিধা মানুষ পাচ্ছে, সেটার মূল্যায়ন করা খুবই দরকার। সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকেরা জনগণের করের টাকায় গাড়িতে চলাচল করেন, তাঁরা গণপরিবহন ব্যবহার করেন না। এ জন্য গণপরিবহনের উন্নয়ন হয় না। যদি মন্ত্রীরা গণপরিবহন ব্যবহার করতেন, তবে পাঁচ বছরের মধ্যে এর চেহারা পাল্টে যেত। স্বাস্থ্য খাতের চেহারাটাও পাল্টে যেত। মন্ত্রী–আমলাদের সন্তানেরা যদি বিদেশে পড়াশোনা না করতেন, তবে আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থারও উন্নয়ন হতো।

জনগণ অতীতে ত্যাগ স্বীকার করেছে, ত্যাগ স্বীকার করতে এখনো তারা প্রস্তুত আছে। কিন্তু দেশের অভিভাবকেরা যদি ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্ত না স্থাপন করেন, তবে মানুষ কেন ত্যাগ স্বীকার করবে? বাস্তবতা হলো একজন করদাতা হিসেবে আমি কর ফাঁকি দিতে চাইব যখন দেখব করের টাকা অপচয় হচ্ছে। তাই অপচয়মূলক অর্থনীতি থেকে যদি বেরিয়ে আসতে না পারি, মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার স্পৃহা বাড়বে না। আর করের স্পৃহা না বাড়লে রাজস্ব আহরণও বাড়বে না।

  • মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব