ঈদ ও কোরবানির ফজিলত ও আমল

ফাইল ছবি

পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মুসলমানদের দুটি প্রধান ঈদের একটি। ‘ঈদ’ মানে আনন্দ, আর ‘আজহা’ অর্থ কোরবানি করা বা কোরবানির পশু জবাই। আরবি ‘আজহা’ শব্দের সঙ্গে ‘উদহিয়া’ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ কোরবানির পশু। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত ‘বকরি ঈদ’ নামটি এসেছে ‘বকর’ (ছাগল) শব্দ থেকে; আবার ‘বাকারাহ’ অর্থ গরু—সেখান থেকেও অনেক সময় ‘বকরা ঈদ’ বলা হয়।

কোরবানি শব্দের অর্থ নৈকট্য লাভ করা, ত্যাগ ও তিতিক্ষা প্রদর্শন করা। অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ত্যাগের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জনই হলো কোরবানি। ইসলামের পরিভাষায়, জিলহজ মাসের ১০ তারিখের সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট জন্তু—গরু, মহিষ, উট, ভেড়া, ছাগল ও দুম্বা—জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়।

স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান যদি কোরবানির এই তিন দিনের মধ্যে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন (অর্থাৎ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা, অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক সম্পদ থাকে) তাহলে তার জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু—সমস্তই জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত।’ (সুরা-৬ আনআম, আয়াত: ১৬২)

পশু কোরবানির পাশাপাশি নিজের মনের পশু তথা নফসে আম্মারাকে কোরবানি করে (আত্মত্যাগের মাধ্যমে) পরিশুদ্ধ করা এবং আল্লাহর কাছে সর্বাত্মকভাবে আত্মসমর্পণ করাই কোরবানির মূল দর্শন ও শিক্ষা। ‘আল্লাহর নিকট ওদের গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না; বরং পৌঁছায় তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা-২২ হজ, আয়াত: ৩৭)

ঈদের দিনে ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, পুরুষদের ফজরের নামাজ জামাতে মসজিদে আদায় করা, সকালে গোসল করা, মিসওয়াক করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা, আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা, ঈদগাহে এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা। আসা-যাওয়ার সময় তাকবির (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ) বলা এবং খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা সুন্নত।

কোরবানির উপযোগী হতে হলে গরু, মহিষ ও উটের বয়স কমপক্ষে তিন বছর হতে হবে। ভেড়া, ছাগল ও দুম্বার বয়স কমপক্ষে এক বছর হতে হবে। তবে দুম্বা ছয় মাস বয়সী হলেও যদি এক বছর বয়সীর মতো বড় হয়ে যায়, তবে তা দিয়েও কোরবানি করা যাবে। ভেড়া, ছাগল ও দুম্বা প্রতিটি দ্বারা একটি কোরবানি হবে। গরু, মহিষ ও উট—প্রতিটি দ্বারা সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত অংশ নিয়ে কোরবানি করা যাবে।

আকিকা হলো একটি বা দুটি ছাগল। গরু, মহিষ বা উটে অংশ হিসেবে যেভাবে কোরবানি দেওয়া যায়, সেভাবেই অংশের ভিত্তিতে আকিকাও করা যায়। কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গেও করা যেতে পারে। নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবাই করা উত্তম। মুসলিম নারী ও পুরুষ—সবাই জবাই করতে পারেন। নিজে জবাই করতে না পারলে অন্য কাউকে দিয়ে জবাই করানো যায়। জবাইয়ের সময় নিজে উপস্থিত থাকা ভালো।

ওয়াজিব ও নফল কোরবানির গোশত খাওয়া ও খাওয়ানো যায়; এটি সবার জন্য বৈধ। উত্তম হলো কোরবানির গোশত সম্ভব হলে তিন ভাগে ভাগ করা—আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া, গরিব ও প্রতিবেশীদের দেওয়া এবং নিজ পরিবারের জন্য রাখা। (তিরমিজি)

যদি একাধিক ব্যক্তি একটি পশুতে অংশ নিয়ে কোরবানি করেন, তবে প্রথমে প্রত্যেকের অংশ আনুপাতিক হারে সমানভাবে নির্ধারণ করা উচিত। কেউ স্বেচ্ছায় কম নিলে বা কাউকে বেশি দিলে তাতে কোনো দোষ নেই। অংশীদারেরা একমত হলে গরিবদের জন্য যতটুকু ইচ্ছা রাখা যেতে পারে। তবে প্রত্যেকের অংশ আলাদাভাবে বণ্টন করা উত্তম ও নিরাপদ।

ওয়াজিব কোরবানি ছাড়া জীবিত বা মৃত যেকোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে নফল কোরবানি আদায় করা যায়। এতে উভয়েই সওয়াবের অধিকারী হন। নারী যদি সামর্থ্যবান হন বা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তাঁর জন্যও কোরবানি ওয়াজিব।

কোরবানির গোশত প্রয়োজন অনুযায়ী যত দিন খুশি সংরক্ষণ করা যায়। বিশেষ কোনো ব্যক্তি চাইলে অল্প পরিমাণে রেখে দিতে পারেন, এতে কোনো দোষ নেই। অনেকে স্বাস্থ্যগত কারণে কোরবানির গোশত খেতে পারেন না বা চিকিৎসকের নিষেধ থাকে; তাঁরা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী স্বল্প পরিমাণে গ্রহণ করতে পারেন।

  • অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

[email protected]