মহাকাশে নয়, তারকাদের মাটিতে দেখতে চায় মানুষ 

জেফ বেজোস ও লরেন সানচেজের বিয়ের বিশাল খরচ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠেছবি: রয়টার্স

২০২৫ সালের এপ্রিলে যখন কেটি পেরি ও আরও পাঁচ নারীকে জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন রকেটে মহাকাশে পাঠানো হলো, তখন আয়োজকদের ধারণা ছিল, এটি হবে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিষয়টি উদ্‌যাপিত হবে। সংবাদমাধ্যমেও তখন খবরটি ব্যাপক কাভারেজ পেয়েছিল।

এই অভিযানে ছিলেন বেজোসের তৎকালীন বাগ্‌দত্তা লরেন সানচেজ ও সিবিএস উপস্থাপক গেইল কিং। তাঁরা মোটামুটি ১১ মিনিট মহাকাশে ছিলেন। সেই সময় কেটি পেরি গেয়েছিলেন লুই আর্মস্ট্রংয়ের বিখ্যাত গান ‘হোয়াট আ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড’। পৃথিবীতে ফিরে কেটি পেরি মাটিতে চুমু খান এবং ক্যামেরার সামনে একটি ডেইজি ফুল দেখান, যা ছিল তাঁর কন্যা ডেইজির প্রতি তাঁর ভালোবাসার প্রকাশ। 

কিন্তু এই মহাকাশযাত্রা নারীবাদের বিজয় হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বদলে এক বড় ধরনের জনসংযোগ বিপর্যয়ে পরিণত হয়। মানুষ এটিকে দেখেছে বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন বিলাসিতা হিসেবে। অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে অতি ধনীদের জন্য এমন ব্যয়বহুল আনন্দভ্রমণ অনেকের চোখে ছিল চরম বেহায়াপনা। সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় বিদ্রূপ, মিম আর তীব্র সমালোচনা।

আরও পড়ুন

পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয়ে ওঠে যে পরে কেটি পেরি স্বীকার করেন, এই ঘটনায় তিনি নিজেকে ‘ক্ষতবিক্ষত’ অনুভব করেছেন। তবে তিনি এটাও বলেন, তিনি বিষয়টি সহনশীলতার সঙ্গে নিয়েছেন এবং সমালোচকদের প্রতিও ভালোবাসা পাঠিয়েছেন। তাঁর মতে, ইন্টারনেট অনেক সময় আহত ও অস্থির মানুষের আবর্জনা ফেলার জায়গায় পরিণত হয়।

এই প্রতিক্রিয়া আসলে কোনো একক ঘটনা নয়। এটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। কার্ডাশিয়ান পরিবারের কোর্টনি কার্ডাশিয়ানের একটি ভাইরাল উক্তি বিষয়টিকে ভালোভাবে ধরেছে, ‘কিম, মানুষ তো মরছে।’

আজকের পৃথিবী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং পরিবেশ বিপর্যয়ে জর্জরিত। এই বাস্তবতায় মানুষ আর শুধু আত্মপ্রচারের জন্য সেলিব্রিটি দেখতে চায় না। বরং তারা জানতে চায় এই বিশাল প্ল্যাটফর্মধারীরা সমাজের জন্য কী করছে।

এই মনোভাবের আরেকটি উদাহরণ জেফ বেজোসের ভেনিসে হওয়া বিয়ে। বিয়েতে আনুমানিক খরচ ছিল ৩ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, অপরাহ উইনফ্রে, ইভাঙ্কা ট্রাম্প, কার্ডাশিয়ানরা—সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। একসময় এসব ছবি মানুষের ঈর্ষা বা স্বপ্ন জাগাত। এখন সেগুলো ক্ষোভ উসকে দেয় এবং ‘ধনীদের ধরো’ ধরনের বয়ানকে শক্তিশালী করে।

একসময় সেলিব্রিটিদের জীবন ছিল সাধারণ মানুষের জীবন থেকে দূরে; সেটি ছিল একধরনের পালিয়ে বাঁচার জায়গা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই দূরত্ব ভেঙে দিয়েছে। এখন তারকারাও একই ফিডে, একই সংকটে, একই আলোচনায়। ফলে তাঁদের উদাসীনতা এখন আর নিরীহ মনে হয় না; বরং তা অবজ্ঞা বলে মনে হয়।

একসময় সেলিব্রিটিদের জীবন ছিল সাধারণ মানুষের জীবন থেকে দূরে; সেটি ছিল একধরনের পালিয়ে বাঁচার জায়গা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই দূরত্ব ভেঙে দিয়েছে। এখন তারকারাও একই ফিডে, একই সংকটে, একই আলোচনায়। ফলে তাঁদের উদাসীনতা এখন আর নিরীহ মনে হয় না; বরং তা অবজ্ঞা বলে মনে হয়। এর স্পষ্ট উদাহরণ অভিনেত্রী সিডনি সুইনির ঘটনা। আমেরিকান ইগল জিনসের একটি বিজ্ঞাপনে তিনি অভিনয় করেন। সেখানে তাঁর ‘গ্রেট জিনস’—এই শব্দখেলাকে অনেকেই ‘গ্রেট জিনস’ বা বংশগত উৎকর্ষের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। সমালোচকেরা বলেন, এটি ইউজেনিক্স ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে উসকে দেয়।

এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিষয়টিতে মন্তব্য করেছেন। তিনি এটিকে ‘সবচেয়ে হট বিজ্ঞাপন’ বলেছেন। পরে জানা যায়, সুইনি ট্রাম্পের নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর নীরবতাকে অনেকেই দায়মুক্তি হিসেবে দেখেন।

আরও পড়ুন

এই ঘটনা চলচ্চিত্রজগতের বড় পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত করে। একসময় শুধু বড় তারকার নাম থাকলেই দর্শক হলে যেত। এখন সেই ধারণা ভেঙে পড়ছে। মার্গট রবি, ডোয়াইন জনসন, জুলিয়া রবার্টস, কিয়ানু রিভস, ড্যানিয়েল ডে-লুইস—এদের অভিনীত ছবিগুলোও এ মৌসুমে ভালো ব্যবসা করতে পারেনি।

এমনকি টেইলর সুইফটও এই পরিবর্তনের বাইরে নন। আবেগঘন গানের জন্য পরিচিত এই শিল্পী তাঁর নতুন অ্যালবাম ‘দ্য লাইফ অব আ শো গার্ল’-এ মূলত শোবিজ আর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে গান করেছেন। এতে মানুষের সাড়া ছিল তুলনামূলকভাবে শীতল। অনেকেই বলেন, তিনি বৃহত্তর সামাজিক উদ্বেগ থেকে বিচ্ছিন্ন।

এই সমালোচনা আরও বেড়ে যায়, যখন ট্রাম্প প্রশাসন তাঁর গান সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহার করলেও তিনি প্রকাশ্যে কোনো আপত্তি জানাননি। অন্যদিকে সাব্রিনা কার্পেন্টার ও অলিভিয়া রদ্রিগো এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।

গত বছর ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্য না করায় টেইলর সুইফটসহ কিছু সেলিব্রিটিকে ব্লক করার আন্দোলনও হয়েছিল সামাজিক মাধ্যমে। সম্ভবত এই চাপই গত এক বছরে অনেক শিল্পীকে গাজার মৃত্যু ও মানবিক বিপর্যয় নিয়ে কথা বলতে সাহসী করেছে। তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের ঝুঁকিও আছে। চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করার পর মার্কিন টিভি উপস্থাপক জিমি কিমেলকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এটি দেখিয়েছে, ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানগুলো সমালোচনাকারী তারকাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করে না।

আরেক বিপদ হলো লোকদেখানো সক্রিয়তা। চার্লি এক্সসিএক্স তাঁর সাবস্ট্যাকে লিখেছেন, খ্যাতি আর নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তিনি বোঝেন না। জেনিফার লরেন্সও বলেছেন, পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান শিল্পীদের দায়িত্ব হতে পারে না।

তবু বাস্তবতা হলো, মানুষ যখন রাজনীতিবিদ, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা সেলিব্রিটিদের দিকেই তাকায়। এই শূন্যতা থেকেই এই প্রত্যাশা তৈরি হয়। মানুষ আর তারকাদের মহাকাশে দেখতে চায় না। তারা জানতে চায়, মাটিতে দাঁড়িয়ে তারা আসলে কিসের পক্ষে, কার পক্ষে।

নাদিয়া খোমামি দ্য গার্ডিয়ান–এর শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিবেদক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ