সত্যিকারের মুক্তির জন্য ইউক্রেনকে যা করতে হবে

রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের বিরাট একটা অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছেছবি: রয়টার্স

দশক তিনেক আগের কথা। আমার রুশ পূর্বপুরুষেরা যেখানে সমাহিত আছেন, ইউক্রেনের সেই গির্জাটির উঠানে আমি এক বৃদ্ধার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ছিলাম। বৃদ্ধা তাঁর হাতের লাঠির ওপর ভর করে বসে ছিলেন। তাঁর মাথায় ছিল কালো ওড়না।

আমাদের পেছনের রুশ গির্জাটি আমার প্রপিতামহ তাঁর নিজের জায়গার ওপর নির্মাণ করেছিলেন। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। আমি যে বৃদ্ধার পাশে বসে ছিলাম, তিনি ছিলেন ওই গ্রামের শেষ ব্যক্তি, যিনি আমাদের পরিবারের কথা স্মরণ করতে পারছিলেন। তিনি আমাকে যখনকার কথা বলছিলেন, তখন তিনি ছিলেন ছয় বা সাত বছরের মেয়ে।

বৃদ্ধা বলছিলেন, তিনি তাঁর অ্যাপ্রোনের কোঁচড়ে করে একবার জাম্বুরা নিয়ে বড় বাড়ির রান্নাঘরে গিয়েছিলেন। আমার দাদির বোন তাঁকে এক চামচ গরম ব্ল্যাকবেরির আচার দিয়েছিলেন। তখন খুব কোলাহলমুখর ছিল বাড়িটা।

তারপর একদিন বলশেভিক বিপ্লব এল। আমাদের পরিবার পালাল। গির্জা বন্ধ হলো। সোভিয়েতের লোকজন এসে তাদের শস্য ও ফসল বাজেয়াপ্ত করল। যাঁরা এখানে অবস্থাপন্ন ছিলেন, তাঁদের তারা ধরে নিয়ে গেল। আর সবাইকে অনাহারের মধ্যে ফেলল। স্তালিনের লোকেরা ইউক্রেনের সেসব মানুষকে ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ঘাস খেতে বাধ্য করল, যাঁরা ইউরোপের সবচেয়ে উর্বর মাটিতে চাষ করে বিস্তর ফসল ফলিয়ে গোটা দেশকে সমৃদ্ধ করে রেখেছিলেন।

এরপর এল যুদ্ধ। নাৎসিরা গ্রামের ঘরগুলো জ্বালিয়ে–পুড়িয়ে দিল এবং স্থানীয় ইহুদিদের হত্যা করল। বৃদ্ধা এসব গল্প আমাকে বলছিলেন। গল্পের শেষ দিকে এসে তিনি তাঁর দুর্বল দেহটি আমার দিকে এলিয়ে দিয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সেই বৃদ্ধার কান্নার শব্দ আমার মন থেকে কখনোই মুছে যায়নি। যখনই সেই শব্দ আমার স্মৃতিতে ফিরে আসে, তখনই আমি বুঝি ইউক্রেনের আজকের সংগ্রাম কিসের জন্য। 

এখন পূর্ব ইউক্রেনের পোক্রোভস্কের সেনারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছে; খারকিভে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িগুলো থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বেসামরিক লোকদের উদ্ধার করছে; কৃষ্ণসাগরে রুশ জাহাজে ইউক্রেনের সেনারা ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

একটি নতুন ইতিহাস তৈরির চেষ্টায় তারা এই সবকিছু করছে। তারা যে ইতিহাস সৃষ্টির চেষ্টা করছে, সেটি এমন ইতিহাস নয়, যা সেই বৃদ্ধাকে করুণভাবে কাঁদিয়ে তুলেছিল। আর কোনো বৃদ্ধাকে যাতে আর কোনো দিন সেভাবে কাঁদতে না হয়, সে জন্যই তারা এক বিজয়ের ইতিহাস গড়তে চাইছে। 

ইউক্রেনের মানুষের জন্য এই যুদ্ধ কেবল বর্তমানের যুদ্ধ নয়, এটি তাদের ইতিহাসের অত্যাচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ সংগ্রামের অংশ। এটিই আমরা ঠিকমতো বুঝতে পারছি না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণ ইউক্রেনের সংগ্রাম থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।

এখন পর্যন্ত এখানে যে–সংখ্যক হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য মনে হয়। এটা কি সত্যিই সম্ভব যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ রুশ এবং প্রায় সমানসংখ্যক ইউক্রেনীয় হতাহত হয়েছে? অনেকের কাছে এই মৃত্যুগুলো যেন অন্য কোনো গ্রহে ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। 

ইউক্রেনের বিজয়ের ওপর আমাদের নিরাপত্তা নির্ভর করছে বলে আমাদের রাজনীতিবিদেরা দাবি করলেও ইউক্রেনের বিজয়ের সম্ভাবনাকে বিমূর্ত, দুর্বল ও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। যদি ইউক্রেনীয়রা সত্যিই আমাদের জন্য লড়াই করছে বলে ধরে নিই, তাহলে আমরা এটিও ধরে নেব যে তাঁরা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই চালাচ্ছে। ইউক্রেন এখন তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য লড়াই করছে, যাতে তারা নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং অতীতের সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে। 

ইউরোপের অন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তাদের উপনিবেশগুলো ছেড়ে দিলেও রাশিয়া এখনো তার সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব বজায় রেখেছে। এটি ইউক্রেনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বের জনগণ এবং রাজনীতিবিদেরা এই লড়াইয়ের গুরুত্ব ঠিকমতো অনুধাবন করছে না। যুদ্ধের বিধ্বংসী ফলাফল এবং এর ফলে ঘটমান বিপুল প্রাণহানি তাদের কাছে অবাস্তব মনে হচ্ছে। অথচ ইউক্রেনের এই যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই।

সাম্রাজ্যবাদ এবং তার প্রভাব এখনো আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হয়। অতীতে সাম্রাজ্যবাদের যে বিষ তৈরি হয়েছিল, তা এখনো আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে বিষাক্ত করছে। অনেক দেশ, বিশেষত যেসব দেশ একসময় উপনিবেশ ছিল, তাদের জন্য সাম্রাজ্যবাদী গৌরবের নস্টালজিয়া বা হারানো মহিমার প্রতি আকর্ষণ আজও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতি ডেকে আনছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও কোনো উপনিবেশ ছিল না, তবে তাদের বৈশ্বিক আধিপত্য ছিল অত্যন্ত বেশি। সেই আধিপত্য হারানোকে মর্যাদার স্খলন হিসেবে তুলে ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থিতার প্রচারণায় এই পুরোনো অনুভূতিগুলোকে উসকে দেওয়া হয়েছে।

তাঁর নির্বাচনী স্লোগানে বলা হয়েছে, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘আমেরিকাকে আবার মহান করো’। এই স্লোগান আসলে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার শীর্ষ অবস্থান এবং মহিমার জন্য জনগণের নস্টালজিয়াকে কাজে লাগানোর একটি কৌশল। ট্রাম্পের প্রচারণা অতীতের গৌরবকে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে মূলত জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।

যদি আপনি দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র আনতে চান, তাহলে আপনাকে সাম্রাজ্যবাদের ক্ষতিকর নস্টালজিয়া থেকে মুক্ত হতে হবে। যতক্ষণ না তা করবেন, আপনার গণতান্ত্রিক রাজনীতি অলীক স্বপ্নে ভেসে যাবে।

স্পেনের ঐতিহাসিকেরা আমাকে বলেছেন, কিউবা ও ফিলিপাইন হাতছাড়া হওয়ার মধ্য দিয়ে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের শেষ পরাজয় ঘটেছিল এবং সেই হারানোর অনুভূতিই স্পেনকে পরে ফ্রাঙ্কোর কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে স্পেনে গণতন্ত্র আসতে দুই প্রজন্ম দেরি হয়। 

এই মারাত্মক রোগটার বিরুদ্ধে ইউক্রেন লড়াই করছে। যখন ইউক্রেনের নাগরিকেরা বলে, তারা ইউরোপে যোগ দিতে চায়, তার আসল অর্থ দাঁড়ায়, তারা তাদের মনমানসিকতা ও আত্মা থেকে সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করতে চায়। তার অর্থ দাঁড়ায়, তারা স্বাধীন মানুষ হিসেবে বাঁচতে চায় এবং এমন এক অতীত থেকে মুক্ত হতে চায়, যা মনে করে সেই বৃদ্ধা ব্যথায় অঝোরে কেঁদেছিলেন। 

সব ধরনের সাম্রাজ্যবাদী নস্টালজিয়ারই মূলোৎপাটন করা উচিত; এমনকি মিষ্টি অতীতের নস্টালজিয়াও। এসব সাম্রাজ্যবাদী আমলের মিষ্টি স্মৃতিরোমন্থনও ক্ষতিকর। এ কারণে একটি স্বাধীন ইউক্রেনকে পুরোনো রাশিয়ার স্মৃতির সঙ্গে মীমাংসা করতে হবে। 

মিখাইল ইগনাতিয়েফ ইতিহাসের অধ্যাপক এবং ভিয়েনায় অবস্থিত সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেক্টর


স্বত্ব: প্রজেক্টসিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ