যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যেটিকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে তুলে ধরেছেন, তার মূল কথা হলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি।
এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আরও শক্তভাবে চাপে ফেলতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবে ফল হচ্ছে উল্টো।
অন্য দেশগুলোকে ইরান থেকে দূরে সরিয়ে আনার বদলে ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত আমেরিকাকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসানকে আরও দ্রুত এগিয়ে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কথিত মিত্ররা কেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ব্যয়বহুল ও ভুল পথে নেওয়া যুদ্ধে যোগ দিতে চাইছে না, তা বোঝা কঠিন নয়।
এই যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকারকে উৎখাত করতে পারেনি।
এমনকি বিকল্প পরিকল্পনাও তৈরি করতে পারেনি। ফলে মিত্ররা কেন এই যুদ্ধে জড়াবে? তার ওপর ট্রাম্প প্রশাসন নিয়মিত বন্ধু ও অংশীদারদের অপমান করে।
গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার মতো ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয়। আবার বিভিন্ন দেশের ওপর শাস্তিমূলক শুল্কও আরোপ করে।
অন্যদের নিজের সঙ্গে নিতে সাধারণত দুটি পথ আছে। একটি হলো বোঝানো, অন্যটি হলো ভয় দেখিয়ে বাধ্য করা।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এখন কোনোটিই কাজ করছে না। আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য কার্নেগি এনডাওমেন্টের অ্যারন ডেভিড মিলার যথার্থই বলেছেন, এখানে ‘ডি-ডে’ আসলে ‘হতাশার দিন’।
কাউকে বোঝাতে হলে বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার। অন্য দেশগুলোর বিশ্বাস করতে হবে যে সরকারের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের মতো সক্ষমতাও তার আছে।
কিন্তু ট্রাম্প মিথ্যা বলার জন্য এমন একটি দুর্নাম তৈরি করেছেন যে তাঁর কথায় এখন কেউ সহজে বিশ্বাস করে না।
২০২৫ সালের জুনে তিনি দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ও পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে।
মার্চে তিনি বলেছিলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতাও ‘আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস’ করা হয়েছে।
অথচ যে যুদ্ধ চার সপ্তাহ বা তার কিছু বেশি সময় চলার কথা ছিল, তা এখন সপ্তম মাসে পড়েছে।
ইরানিরা তো বটেই, কানাডীয়রাও জানে, ট্রাম্প যে চুক্তিতে সই করবেন, তার স্থায়িত্ব টিস্যু কাগজের মতোই দুর্বল হতে পারে।
বেসেন্টকে ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড ও মুদ্রাবাজার সামাল দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় তিনিও সেই বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছেন।
তাঁর আসল উদ্দেশ্য সম্ভবত ছিল নিজের বসকে বোঝানো যে তিনি ‘কিছু একটা করছেন’। কিন্তু এমন একজন প্রেসিডেন্টকে কেন কেউ সাহায্য করবে, যিনি পরদিনই তাঁর বিরুদ্ধে চলে যেতে পারেন? ট্রাম্প এর আগে তাঁর হয়ে কাজ করা প্রায় সবার সঙ্গেই এমন আচরণ করেছেন।
তাই বোঝানোর পথ যখন বন্ধ, ট্রাম্পের হাতে থাকে তাঁর পছন্দের পথটিই—ভয় দেখানো, শক্তিপ্রদর্শন ও দম্ভ। কিন্তু এখানেই বড় সমস্যা।
ট্রাম্প ও বেসেন্ট হয়তো বুঝতে পারছেন না যে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের মতো সহজে অন্য দেশকে নিজের ইচ্ছেমতো চালাতে পারে না।
ট্রাম্প আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত চরিত্র এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে যাওয়া অবস্থানও বুঝতে পারছেন না। তিনি অতীতে আটকে আছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে বিশ্ব মোট দেশজ উৎপাদনে আমেরিকার অংশ অর্ধেক হয়ে গেছে। ২০২৫ সালে তা প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশের নিচে নেমেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র হারিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত চিপের অধিকাংশ তৈরি হয় তাইওয়ানে।
আবার চুম্বক ও বিরল মৃত্তিকা উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের আধিপত্য রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ট্রাম্পও বুঝতে পারেন যে আমেরিকার হাতে আর সব তুরুপের তাস নেই।
ইরানের তেল বিক্রির আয় কমাতে তিনি ক্রেতাদের ওপর চাপ দিতে চান।
আমেরিকার শক্তি ট্রাম্পের সময়ে দ্রুত কমে যাচ্ছে বুঝতে পেরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মনে করছেন, এবার যথেষ্ট হয়েছে। তিনি এমন একজন ‘পাগল রাজা’র কাছে নিজের দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করতে রাজি নন, যিনি ইরানের বিরুদ্ধেও জয়ী হতে পারছেন না।
কিন্তু ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৯০ শতাংশই কেনে চীন। বিরল মৃত্তিকার ক্ষেত্রেও চীনের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে।
ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়াও এই পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেই তুলে ধরছে।
আমেরিকার শক্তি ট্রাম্পের সময়ে দ্রুত কমে যাচ্ছে বুঝতে পেরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মনে করছেন, এবার যথেষ্ট হয়েছে। তিনি এমন একজন ‘পাগল রাজা’র কাছে নিজের দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করতে রাজি নন, যিনি ইরানের বিরুদ্ধেও জয়ী হতে পারছেন না।
বিশ্বের অন্য দেশগুলোও সম্ভবত একই শিক্ষা নিচ্ছে। কাউকেই এমন দাদাগিরি সহ্য করতে হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করা বা তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকারও প্রয়োজন নেই। দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতি এখন বিভিন্ন দেশের সামনে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখী করার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
বেসেন্ট ও ট্রাম্প যত দ্রুত বুঝবেন যে তাঁদের হাতে আগের মতো শক্তিশালী তাস নেই, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য ততই ভালো হবে।
চীন ও অন্য দেশগুলো ট্রাম্পের নতুন দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করলে যা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, তারা ভেঙে পড়বে না।
যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তাতেও তারা বিপর্যস্ত হবে না। বেসেন্ট যে অর্থনৈতিক বিশ্বযুদ্ধের কথা বলেছেন, তা শেষ পর্যন্ত অচলাবস্থায় গিয়ে ঠেকতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, এটিও হতে পারে তার মতোই। এতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে বড় মূল্য দিতে হবে।
আর অন্য দেশগুলোর ওপর আরোপ করা অর্থনৈতিক চাপ আমেরিকার ভাবমূর্তি ও ‘সফট পাওয়ার’ বা প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
একসময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ। দেশটি গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং বহু দেশের কাছে আকর্ষণীয় অন্যান্য মূল্যবোধের প্রতীক ছিল।
এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠেছে কী করা উচিত নয়, তার একটি উদাহরণ। চরম বৈষম্য, গণতন্ত্রের অবক্ষয়, দুর্নীতি ও সামাজিক বিভাজনের একটি সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটি।
বিশ্বের অন্য দেশগুলোর উচিত নিজেদের দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে সহযোগিতা ও আইনের শাসনের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা। অন্তত আপাতত আমেরিকার নেতৃত্বের বাইরে থাকা একটি বিশ্ব হয়তো সবার জন্য আরও স্থিতিশীল, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ হতে পারে।
জোসেফ ই স্টিগলিৎস অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন অর্থনীতিবিদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।