ইরানের অবস্থা এবার কি ভিন্ন

ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রতি সংহতি জানাতে লন্ডনে প্রবাসী ইরানিদের প্রতিবাদছবি: রয়টার্স

ইরানে কী ঘটছে, তা খোলা চোখে দেখার কোনো সহজ উপায় নেই। সবাই যে যাঁর চশমা পরে বাস্তবতা ব্যাখ্যা করছেন। একদল বলছে, ইসলামি বিপ্লবকে কাবু করা সহজ নয়। আমেরিকা বা ইসরায়েল যতই চেষ্টা করুক, এই শাসনব্যবস্থা টিকে যাবে। অন্য দল মনে করছে, ইরানের বিপ্লবী সরকার ভেতরে-ভেতরে এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে শক্ত একটি ধাক্কা দিলেই ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী ধসে পড়বে। 

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লব ৪৭ বছরে পা দেবে। এই প্রায় অর্ধশতকে অন্তত আধডজন বড় ধরনের বিদ্রোহ ও গণবিক্ষোভ দেখেছে দেশটি। প্রতিবারই বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, এবার বুঝি বিপ্লব শেষ। তিন বছর আগে সরকারি হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তখনো অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার আর রক্ষা নেই। কিন্তু সরকার সেবারও পরিস্থিতি সামলে নেয়। তবে এবারের পরিস্থিতি সত্যিই ভিন্ন। 

এর বড় কারণ, ইরানের মানুষ মরতে শিখে গেছে। অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে বেঁচে থাকার পথ প্রায় রুদ্ধ। কেবল সেনা নামিয়ে বা কামান দেগে মানুষকে আর ঠান্ডা করা যাবে না। আজকের ইরান ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়েও আন্দোলন দমন করা যায়নি। ইরানে এখন যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি, তার প্রধান চালিকা শক্তি দেশের নবীন প্রজন্ম, নারী ও পুরুষ উভয়েই। অনেকটা বর্ষাবিপ্লবের বাংলাদেশের মতোই। 

এবারের পরিস্থিতি আলাদা, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইরানি-আমেরিকান অধ্যাপক ওয়ালি নাসের। তাঁর মতে, ইসলামি বিপ্লব কেবল দেশের ভেতর থেকেই নয়, দেশের বাইরেও হুমকির মুখে। বাইরের হুমকি বলতে তিনি ইসরায়েল ও আমেরিকার কথাই বোঝাচ্ছেন। এই দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরেই সুযোগ খুঁজছে, কীভাবে ইরানের ইসলামি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো যায়।

আমেরিকা ইরানের ওপর পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাতে অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধর্মীয় শাসনকাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি। ইসরায়েল ও আমেরিকা মিলে ৩০ হাজার পাউন্ডের বোমা ব্যবহার করেও সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সরকারকে কাবু করতে পারেনি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। কারণ, নাসেরের ভাষায়, এবার ধর্মীয় শাসনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। 

আরও পড়ুন

একই কথা বলেছেন আরেক ইরানি বুদ্ধিজীবী, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্বাস মিলানি। তাঁর মতে, এবার সরকার একদিকে বৈধতা হারিয়েছে, অন্যদিকে দেশের মানুষ স্পষ্টভাবে পরিবর্তন চাইছে। এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লব ছিল প্রকৃত অর্থেই একটি গণবিপ্লব। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাতে অংশ নিয়েছিল।

এমনকি শাহের অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশও বিপ্লবের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের। কারণ, শাহ আমলে অর্থনৈতিক সুবিধার সিংহভাগই ভোগ করত ইরানের অভিজাত শ্রেণি, আর প্রতিবাদকারীদের কপালে জুটত জেল ও নিপীড়ন। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, বিপ্লবের প্রায় অর্ধশতক পরেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। 

শাহ আমলে সবচেয়ে আতঙ্কের নাম ছিল গোপন পুলিশ সাভাক। ক্ষমতায় এসে খোমেনি সরকার সেটির বদলে গড়ে তোলে সাভামা। নাম বদলালেও কাজ রয়ে যায় একই। প্রতিবাদ দমনে আছে বিপ্লবী গার্ড ও নৈতিক পুলিশ, যাদের ইরানি নামে ঘাস্ত-ই-ইরশাদ বলা হয়। মুখ খুললেই জেল। এর শিকার শুধু বিরোধী রাজনীতিক বা অ্যাকটিভিস্টরা নন। শান্তিতে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদী ২০২৩ সাল থেকে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের অভিযোগে কারাগারে। আরেক নোবেলজয়ী শিরিন এবাদি ২০০৯ সাল থেকে নির্বাসনে। 

ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ জানিয়েছে, সে দেশের সরকার সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম ব্যবহার করে রেজা পাহলভিকে ভবিষ্যৎ শাসক বানাতে টাকা ঢালছে। ইসলামি বিপ্লববিরোধী চলতি বিপ্লবকে কক্ষচ্যুত করার জন্য এই তথ্যই যথেষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত করুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি, তিনি সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পক্ষে যেকোনো মুহূর্তে ‘কিনেটিক অ্যাটাক’ বা সরাসরি সামরিক হামলা চালাতে পারেন বলে জানানো হয়েছে। 

নৈতিক পুলিশি নিপীড়নের সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ মাসা আমিনি। উত্তর-পশ্চিমের কুর্দি শহর সাকেজ থেকে তেহরানে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। হিজাব ঠিক না থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিন দিন পর পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। এর প্রতিবাদে গড়ে ওঠে ‘নারী, জীবন ও মুক্তি’ আন্দোলন। একই ধরনের অভিযোগে ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাবা কোর্দ আফসারি। নারী অধিকার আন্দোলনের চাপে তিনি ২০২৩ সালে মুক্তি পান। 

এই তালিকা বাড়ানো যায়, তাতে কথার পুনরাবৃত্তি হবে। ইসলামি বিপ্লব হয়েছিল ইরানের মানুষকে মর্যাদা ও সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে। তার বদলে দেশটি পেয়েছে একদলীয় শাসন, অনির্বাচিত ধর্মীয় নেতাদের প্রায় চার যুগের কর্তৃত্ব এবং অবিরাম নিপীড়ন। এই কারণেই আজ সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। একদিকে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। ১৯৭৯ সালে এক ডলারের মূল্য ছিল ৭০ রিয়াল। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল (না, আপনি ভুল পড়েননি, পরিমাণটা দেড় মিলিয়ন বা ১৫ লাখ)। মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৪৮ শতাংশ। মানুষের আয় বাড়েনি, ব্যয় বেড়েছে। সরকার পরিবারপ্রতি সামান্য ভর্তুকি ঘোষণা করলেও তা দিয়ে বড়জোর কয়েকটি রুটি কেনা যায়। ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভ তাই অনিবার্য। 

আরও পড়ুন

চলতি বিক্ষোভের মূল শক্তি দেশের তরুণ প্রজন্ম। দেশের ৬০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে, বেকারত্ব ও বন্ধ্যা অর্থনীতিতে তাঁরা ক্লান্ত, ক্রুদ্ধ। ভিডিওতে নাম না–জানা এক মায়ের ছবি দেখেছি, তাঁর ছেলে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নিহত হয়েছেন। সবাই সেই ছেলেকে শহীদ অভিহিত করে তাঁকে সান্ত্বনা দিলে, সেই মা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আমার ছেলেকে শহীদ বলবেন না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, সে বাঁচতে চেয়েছিল।’ 

সোশ্যাল মিডিয়া ও ইরানি ডায়াসপোরার তথ্য অনুসারে, এই পর্যন্ত কম করে হলেও হাজার দু-এক মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। অনুমান করি, সেখানেও ১ জন মরে তো ১০ জন দাঁড়িয়ে যায়। ভীত ইরানি ধর্মীয় শাসকেরা ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছেন (এমন কাণ্ড বাংলাদেশেও হয়েছিল)। তরুণেরা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চোরাপথ ব্যবহার করে স্টারলিংকের ইন্টারনেট টার্মিনাল চালু করেছেন। সরকারের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁরা বলছেন, ‘তোমরা এখনো ১৯৭৯ সালের ভাষায় কথা বলো, আমরা কথা বলি ২০২৫-২৬ সালের ভাষায়।’ 

এত দূর এসেও যে নিপীড়নমূলক ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে নবপ্রজন্ম সফল হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এখনো শক্তভাবে সে দেশের সরকারের পক্ষে। নিষ্পেষণ আরও বৃদ্ধি পেলে বিদ্রোহ ভেঙে পড়তে পারে। আমরা জানি, বিপ্লবের নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিতে সুযোগ খুঁজছেন ক্ষমতাচ্যুত রাজা রেজা শাহর ছেলে রেজা পাহলভি। তাঁর পেছনে ছাতা ধরে আছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ জানিয়েছে, সে দেশের সরকার সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম ব্যবহার করে রেজা পাহলভিকে ভবিষ্যৎ শাসক বানাতে টাকা ঢালছে। ইসলামি বিপ্লববিরোধী চলতি বিপ্লবকে কক্ষচ্যুত করার জন্য এই তথ্যই যথেষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত করুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি, তিনি সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পক্ষে যেকোনো মুহূর্তে ‘কিনেটিক অ্যাটাক’ বা সরাসরি সামরিক হামলা চালাতে পারেন বলে জানানো হয়েছে। 

তেমন কিছু ঘটলে ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী খুব সহজেই এই বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পাবে। আর ইতিহাস বলে, সে যুক্তি ইরানে বহুবার কাজে দিয়েছে। 

হাসান ফেরদৌস লেখক ও প্রাবন্ধিক

* মতামত লেখকের নিজস্ব