চীনের হাতে যে ‘অস্ত্র’ তুলে দিয়ে এখন ভুগছে যুক্তরাষ্ট্র

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিংফাইল ছবি

১৯৯২ সালে চীনের নেতা দেং শিয়াওপিং একটি বড় খনিজ এলাকা দেখতে ইননার মঙ্গোলিয়ার বাওতু শহরে গিয়ে বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আছে তেল আর চীনের আছে রেয়ার আর্থ। তখন খুব কম মানুষই এই কথার গুরুত্ব বুঝেছিলেন।

কিন্তু চীনের শাসকগোষ্ঠী এবং কমিউনিস্ট পার্টি বিষয়টি গভীরভাবে নিয়েছিল। দেংয়ের এই ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত মিলেই আজ চীনকে একটি বড় কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।

রেয়ার আর্থ বলতে আসলে পর্যায় সারণির মাঝখানে থাকা ১৭টি বিশেষ ধাতুকে বোঝানো হয়। এগুলো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ভেতরের শক্ত ভিত্তি এগুলোই। মুঠোফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের টারবাইন, সামরিক ড্রোন, উন্নত যুদ্ধবিমান ও রাডার ব্যবস্থা সবই এই ধাতুর ওপর নির্ভরশীল।

রেয়ার আর্থ শব্দের বাংলা দাঁড়ায় বিরল ধাতু। কিন্তু নাম রেয়ার হলেও রেয়ার আর্থ খুব বিরল নয়। তবু রেয়ার বলা হয়, কারণ, এগুলো সাধারণত আলাদা ও বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় না। লাভজনকভাবে উত্তোলনের মতো ঘনত্বেও এগুলো প্রকৃতিতে খুব কম থাকে।

আরও পড়ুন

এই ধাতুগুলো অন্য খনিজের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে থাকে। ফলে এগুলো আলাদা করা কঠিন, ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এই জটিলতাই এগুলোকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

চীন অবশ্য প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেয়নি যে তারা এই খাতে আধিপত্য করবে। আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো পরিবেশদূষণ ও ঝুঁকির কারণে এই কঠিন কাজগুলো এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। সেই জায়গায় চীনই দায়িত্ব নিয়েছে। আশির দশক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেয়ার আর্থ উৎপাদক। পরে পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ম কঠোর হওয়ায় এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে উৎপাদন চীনে সরিয়ে নেয়।

আজ রেয়ার আর্থ আর সাধারণ পণ্য নয়। এগুলো এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। নতুন করে এর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা মানে শুধু নতুন খনি খোঁজা নয়। এর জন্য পুরো একটি শিল্পব্যবস্থা দরকার। খনি, পরিশোধন, কারখানা এবং প্রযুক্তি ব্যবহার সব মিলিয়ে। চীন এই জায়গায় পৌঁছাতে চার দশকের বেশি সময় নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র যখন সরে দাঁড়ায়, তখন চীন সেই সুযোগ কাজে লাগায়। পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নিয়ে তারা এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ায়। ধীরে ধীরে তারা এই ধাতু উত্তোলন ও পরিশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় দক্ষ হয়ে ওঠে। আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেয়ার আর্থ মজুত রয়েছে চীনের হাতে। একই সঙ্গে বিশ্বে যত রেয়ার আর্থ উত্তোলন হয়, তার বড় অংশ পরিশোধনের বেশির ভাগ এবং প্রায় পুরো প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা চীনের নিয়ন্ত্রণে।

শুরুতে লাভ না হলেও চীন সরকার দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পকে সহায়তা দিয়েছে। এর ফলে তারা একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ও শক্তিশালী শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টির গুরুত্ব নতুন করে বুঝতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর খুব বেশি শুল্ক বসালে চীন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কিছু রেয়ার আর্থ ও বিশেষ চুম্বকের রপ্তানি সীমিত করে।

আরও পড়ুন

এই ধাতুগুলো যুক্তরাষ্ট্রে চীনের মোট রপ্তানির খুব সামান্য অংশ হলেও এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে। তাই এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। এখন রেয়ার আর্থ চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী দর-কষাকষির অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রযুক্তি বা চিপ নিয়ে চাপ দেয়, চীন তখন রেয়ার আর্থকে চাপ সৃষ্টির উপায় হিসেবে ব্যবহার করে।

এই নির্ভরতা শুধু অস্ত্র বা সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কম্পিউটার, রোবট, চিকিৎসার যন্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তিতেও যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নির্ভরশীল। প্রয়োজনে এটি সবকিছু থামিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে।

আজ রেয়ার আর্থ আর সাধারণ পণ্য নয়। এগুলো এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। নতুন করে এর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা মানে শুধু নতুন খনি খোঁজা নয়। এর জন্য পুরো একটি শিল্পব্যবস্থা দরকার। খনি, পরিশোধন, কারখানা এবং প্রযুক্তি ব্যবহার সব মিলিয়ে। চীন এই জায়গায় পৌঁছাতে চার দশকের বেশি সময় নিয়েছে।

চীনের সাফল্যের পেছনে দেংয়ের বাস্তববাদী চিন্তাই মূল শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেল ছিল সবচেয়ে বড় সম্পদ। চীনের জন্য সেই জায়গাটি নিচ্ছে রেয়ার আর্থ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের এই যুগে তেলের জায়গা নিচ্ছে রেয়ার আর্থ। যে দেশ এই ধাতুর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই দেশই ভবিষ্যতের উদ্ভাবনে সবচেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাবে।

  • রাভি কান্ত অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং প্রযুক্তিবিষয়ক লেখক।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত