রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই, কী ভবিষ্যৎ মমতার

নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত সমাবেশে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১ জুলাই ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গছবি: ভাস্কর মুখার্জি

কথায় বলে, রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই। আজ যা অসম্ভব মনে হচ্ছে, নিবু নিবু; একদিন তা আবার দাবানল হতে পারে। যে দল বা নেতার হাল দেখে মনে হচ্ছে জনজীবনে দেওয়ার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই; একদিন দেখা যেতে পারে ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে তিনি আবার ডানা ঝাপটাচ্ছেন।

চলতি বছরের ১৮ মার্চ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, মহারাষ্ট্রের এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়াসহ ৫৯ জন রাজ্যসভা সদস্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই আপ্তবাক্য মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই।’

তৃণমূল কংগ্রেসকে দুরমুশ করে এই বছরের মে মাসে যারা প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, সেই বিজেপির রাজ্য–নেতৃত্ব অবশ্য সদর্পে ঘোষণা করেছেন, মমতাকে তাঁরা শেষ করে ছাড়বেন। সেই লক্ষ্যে তাঁরা এগোচ্ছেনও। নিজ হাতে যে দল মমতা তৈরি করেছেন, জোড়া ফুল প্রতীককে পরিচিতি দিয়েছেন; সেই নাম ও নিশানা আপাতত হাতছাড়া। এখন তাঁর সর্বস্বান্ত হাল।

আরও পড়ুন

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্তে মমতা ও তাঁর দলত্যাগী বিক্ষুব্ধ নেতারা কেউ আপাতত ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকের অধিকারী নন। আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যে যে দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হতে চলেছে, অধিকারী পরিবারের খাসতালুক নন্দীগ্রাম ও মুসলমান–অধ্যুষিত রেজিনগর; সেখানে কোনো পক্ষই ওই নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।

মমতা বনাম মমতাত্যাগী তৃণমূলিদের সম্ভাব্য নির্বাচনী টক্কর ঘিরে উত্তেজনার যে ফানুস উড়ছিল, গুরুমারা বিদ্যা প্রয়োগে তাতে সুচ ফুটিয়েছেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামে মমতার প্রার্থী বসে গেছেন। রেজিনগরের প্রার্থী টলমল করতে করতে টিকে আছেন ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রীয় চাপ সহ্য করতে না পেরে প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানকার মূল শক্তি আমজনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবির, যিনি এই আসন ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচন। ফলে ৭০ শতাংশ মুসলমান এলাকায় বিজেপি জেতে কি না, সেটাই আপাতত মূল আকর্ষণ।

এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের চোখে মমতা এখন ‘সর্বহারা’। কিছুকাল আগেও যিনি রাহুল গান্ধীকে বিরোধী জোটের নেতা মানতে চাননি, পদে পদে অসম্মান করেছেন, জোটের মধ্যে জোট তৈরি করে পরোক্ষভাবে বিজেপিকে সাহায্য করেছেন; নখদন্তহীন বৃদ্ধ সিংহের মতো সেই মমতা আজ কংগ্রেসের শরণাপন্ন! সর্বভারতীয় স্তরে তো বটেই, রাজ্য-রাজনীতিতেও তিনি বিজেপিবিরোধী শক্তিদের জোটবদ্ধ হওয়ার হাঁক দিচ্ছেন! মানভঞ্জনের চেষ্টা করছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। এই অবস্থান পাঁচ মাস আগে নিলে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এভাবে ছড়ি ঘোরাতে পারত না। এই দায় বাকি জীবন তাঁকেই বহন করতে হবে।

মমতা আন্তরিক হলে এই ভোট ভাগাভাগি রুখতে পারতেন। বিজেপির উল্কা-উত্থান ঠেকাতে পারতেন। রাজনীতিতে কখন কুশলী হতে হয়, এক পা পিছিয়ে দুই পা এগোতে হয়, বিজেপিকে দেখে তা শিখতে পারতেন। সেই শিক্ষা তিনি নেননি। অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতা পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

পরিসংখ্যান সব ক্ষেত্রে সত্য চিত্র হয়তো ফুটিয়ে তোলে না। কিন্তু তা উপেক্ষাও করা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় এক কোটি ভোটারের নাম কেটে তৈরি তালিকা, ২৭ লাখ ভোটারকে ট্রাইব্যুনালে ঠেলে ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সাড়ে ৭০০ সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাকে ক্ষমতাহীন করা, গোটা রাজ্যের ভার কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যুগলবন্দীও পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ৪১ শতাংশের নিচে নামাতে পারেনি! বেছে বেছে মুসলমানদের ভোট কাটার অভিযোগ আজ নির্বাচন কমিশনের গায়ে খামের ওপর ডাকটিকিটের মতো সেঁটে রয়েছে।

দেশের সাবেক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি ইসির এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘১০০ শতাংশ স্ক্যাম’ বা প্রতারণা বলে জাহির করেছেন। এত কিছু করেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট আদায় করতে পারেনি! পাটিগণিতের হিসাব দেখাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে বিজেপি মাত্র ৩২ লাখ ১১ হাজার ৪২৭ ভোট বেশি পেয়েছে! তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, সেটাও তারা করতে পেরেছে গণনার দিন প্রতিপক্ষ এজেন্টদের বের করে দিয়ে। নাহলে তাদের নাকি ঠাঁইনাড়া করা যেত না।

আরও পড়ুন

পরাজিতরা চিরকালই অজুহাত খোঁজে। মমতা ও তাঁর দলের নেতাদের এই অভিযোগও অজুহাত হিসেবে খারিজ করা যায়। কিন্তু পরিসংখ্যান? নির্বাচন কমিশনের হিসাব দেখাচ্ছে, বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছে ৪৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট। দুই বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে তারা পেয়েছিল ৩৯ শতাংশ। এর মানে, মমতা-বিদ্বেষ ও ইসির কল্যাণে তারা ৭ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে। তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৪১ দশমিক ১৬ শতাংশ, কংগ্রেস ২ দশমিক ৯৯, সিপিএম ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট। রাজ্যের এই তিন বিজেপিবিরোধী শক্তির অর্জন ৪৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর সঙ্গে এআইএসএফের ১ দশমিক ৫৪ এবং অন্য তিনটি বাম দলের প্রাপ্ত ভোট জুড়লে হিসাবটা ৫০ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়ায়।

মমতা আন্তরিক হলে এই ভোট ভাগাভাগি রুখতে পারতেন। বিজেপির উল্কা-উত্থান ঠেকাতে পারতেন। রাজনীতিতে কখন কুশলী হতে হয়, এক পা পিছিয়ে দুই পা এগোতে হয়, বিজেপিকে দেখে তা শিখতে পারতেন। সেই শিক্ষা তিনি নেননি। অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতা পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

অমোঘ প্রশ্ন, এখন তিনি কী করবেন। তিনি কি এভাবেই নিঃসীম নীলিমায় ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবেন? অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে পড়বেন উত্তর প্রদেশের দলিত নেত্রী মায়াবতীর মতো? নাকি ছাইয়ের গাদা থেকে গাত্রোত্থান করবেন ইন্দিরা গান্ধীর মতো?

পুত্র সঞ্জয়ের কারণে বিড়ম্বিত ও নিন্দিত হয়েছিলেন ইন্দিরা, ভাতিজা অভিষেকের জন্য মমতা। দলের কান্ডারিরা ইন্দিরাকে কোণঠাসা করেছিলেন; মমতাকে ত্যাগ করেছেন তাঁরা, যাঁদের তিনি গড়েপিটে বড় করেছেন। এই মিলের পাশে অমিলও আছে। ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ (বোবা পুতুল) ইন্দিরা যখন কংগ্রেসি বাস্তুঘুঘুদের মোকাবিলা করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫০। সেটা ছিল তাঁর গড়ে ওঠার সময়। পাঁচ বছরের মধ্যেই একাত্তরে তিনি ‘এশিয়ার সূর্য’। মমতা নিঃশেষ হলেন তাঁর রাজনৈতিক গোধূলিবেলায়। ৭১ বছর বয়সে। ইন্দিরাকে গদিছাড়া করেছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, ৭৫ বছর বয়সে। মমতার মধ্যে এখনো কি তেমনই শক্তি অবশিষ্ট? নাকি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসই তাঁর বার্ধক্যের বারানসি, যেখানে জন্মে, যে আদর্শ ধারণ করে পৃথক পরিচিতি তিনি গড়ে তুলেছেন?

মমতা নিজেও সম্ভবত এই ধন্দের মীমাংসা করে উঠতে পারছেন না। হয়তো এখনো বিশ্বাস করেন, স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে ঠিক তীরে ফিরবেন। তাই এখনো পরাজয় মানেননি। অভিষেককেও আড়াল করে চলেছেন। তাঁকে নিয়ে কংগ্রেসেও রয়েছে বিস্তর দোলাচল।

প্রয়াত রাজীব ও তাঁর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী ছাড়া কংগ্রেসের আর কাউকে কখনো মমতা মন থেকে নেতা মানেননি। জোটসঙ্গী হিসেবে বিজেপি বা কংগ্রেস কাউকে কখনো স্বস্তি দেননি। জোটের মধ্যে জোট ও ঘোঁট করে নিজেকে জাহিরের চেষ্টা করেছেন। তাই বিশ্বস্ত হতে পারেননি।

কংগ্রেসে অনেকের ধারণা, মমতাকে দলে নেওয়ার অর্থ তাঁর যাবতীয় অপকর্মের ভাগীদার হওয়া। এর চেয়ে রাজ্যে প্রকৃত বিজেপিবিরোধী শক্তি হিসেবে মাথা তোলার চেষ্টা চালানো দরকার।

রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই ঠিকই, বিজেপিবিরোধী জোটের সঙ্গী হওয়া ছাড়া মমতার বিকল্পও কিন্তু সীমিত।

  • সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

    মতামত লেখকের নিজস্ব