বিশ্বরাজনীতি এখন যেন একধরনের ‘ধ্বংসকারী শক্তি’র রাজনীতির যুগে ঢুকে পড়েছে। এমন সব নেতা উঠে এসেছেন, যাঁরা সংস্কারের বদলে ব্যাপক ভাঙচুরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন। সমস্যা হলো এই মনোভাব কেবল কয়েকজন চরমপন্থী নেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আজকের এই ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক এজেন্ডার পেছনে আছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ব্যাপক হতাশা এবং নীতিনির্ধারকদের প্রকৃত পরিবর্তন আনার সক্ষমতার ওপর আস্থার গভীর সংকট।
২০২৬ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের জন্য করা এক জরিপে দেখা গেছে, জি-৭ দেশগুলোর খুব অল্পসংখ্যক মানুষই মনে করেন, তাঁদের বর্তমান সরকারের নীতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে ভালো করবে। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করেন, বর্তমান নীতির ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অবস্থা আরও খারাপ হবে।
এখনকার পরিস্থিতিতে যে নেতারা নিয়মকানুন ভেঙে জোর করে সবকিছু বদলাতে চান, তাঁদের আর শুধু মেনে নেওয়া হচ্ছে না, অনেক সময় মানুষ উল্টো তাঁদের বাহবা দিচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বাঁধাধরা নিয়ম ভেঙে দেওয়ার কথা যাঁরা বলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে সাজাতে গিয়ে সেই ভিত্তিগুলোকেই নড়বড়ে করে দিয়েছেন, যেগুলোর ওপর প্রায় ৮০ বছর ধরে আমেরিকার বিশ্বনীতি দাঁড়িয়ে ছিল।
এই ভিত্তি ছিল মূলত তিনটি। এক. জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা আর নিয়মকানুন মেনে চলা। দুই. বিশ্ব অর্থনীতিকে খোলা রাখা—দেশে দেশে বাণিজ্য ও পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানো। তিন. গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতাকে জোর দেওয়া।
ট্রাম্পের নীতিতে এই তিন ক্ষেত্রেই আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে দেখা গেছে।
এর ফল হিসেবে, যে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ভাঙতে চেয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো নেতারা, সেই তালিকায় এখন যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই—যে দেশটি এত দিন এ ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্ত রক্ষক ছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী ‘প্যাক্স আমেরিকানা’র কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা এখন ভেতর থেকেই ক্ষয়প্রাপ্ত ও ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র খুব শক্তিশালী দেশ—এ কারণে তার পররাষ্ট্রনীতির বদল গোটা বিশ্বে প্রভাব ফেলবে, এটা ঠিক। কিন্তু তাই বলে বাকি দেশগুলো একেবারে অসহায় নয়। যারা আবার পুরোনো ধাঁচের বড় শক্তির রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না, তাদের এখনই একসঙ্গে এগোতে হবে।
ট্রাম্পের কিছু সমর্থকের কাছে তাঁর এই ধ্বংসাত্মক রাজনীতি নতুন করে কিছু ভালো গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ জোসেফ শুম্পেটার যাকে বলেছিলেন ‘সৃজনশীল ধ্বংস’—তার সঙ্গে মিল রেখে তাঁরা মনে করেন, প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য ধাপে ধাপে সংশোধন নয়, বরং মৌলিক ভাঙন দরকার।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যবাহী জোটগুলোর ওপর ‘ট্রাম্প ধাক্কা’ প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ভেঙে দিতে পারে এবং নীতিনির্ধারকদের এমন সব সমস্যার মোকাবিলায় বাধ্য করতে পারে, যেগুলো দীর্ঘদিন অচলাবস্থায় আটকে ছিল।
ন্যাটোতে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রগতি এবং ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতিকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যেন ট্রাম্পীয় ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ ইতিমধ্যেই ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। নীতি আর আদর্শের ভিত্তিতে দেশগুলোর যে সহযোগিতা থাকার কথা, তার জায়গা এখন দখল করছে সুযোগসন্ধানী চুক্তি, যেগুলো অনেক সময়ই ক্ষমতাবানদের নিজের লাভের জন্য করা।
নীতিনির্ধারকেরা সাধারণ মানুষের স্বার্থের বদলে নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে চলার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, আর তার জায়গায় শক্তিশালী দেশগুলোর ইচ্ছাই বড় হয়ে উঠছে।
এ কারণেই মিউনিখ নিরাপত্তা সূচক ২০২৬-এর জরিপে প্রায় সব দেশেই মানুষ এই ‘সবকিছু ভেঙে ফেলার’ রাজনীতিকে নেতিবাচক চোখে দেখছে। এমনকি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতেও—যারা শুরুতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে কিছুটা আশাবাদী ছিল—এই মনোভাব বদলে গেছে।
জরিপে দেখা গেছে, চীন ও ভারত ছাড়া সব দেশেই বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন না যে ট্রাম্পের নীতিগুলো তাঁদের দেশ বা পুরো বিশ্বের জন্য ভালো। চীন ও
ভারতেও সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও অনেক মানুষ এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র খুব শক্তিশালী দেশ—এ কারণে তার পররাষ্ট্রনীতির বদল গোটা বিশ্বে প্রভাব ফেলবে, এটা ঠিক। কিন্তু তাই বলে বাকি দেশগুলো একেবারে অসহায় নয়। যারা আবার পুরোনো ধাঁচের বড় শক্তির রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না, তাদের এখনই একসঙ্গে এগোতে হবে।
টোবিয়াস বুন্ডে বার্লিনের হার্টি স্কুলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ের অধ্যাপক এবং সোফি আইজেনত্রাউট মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত