ট্রাম্প কেন নেতানিয়াহুকে বললেন, ‘সবাই আপনাকে ঘৃণা করে’

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুছবি : এএফপি

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গল্প কেবল একজন দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর নেতার গল্প নয়; এটি এক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিবর্তনের গল্প, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে এমন এক ব্যক্তিকে জন্ম দিয়েছে, যিনি শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ছাপিয়ে গিয়েছেন।

ক্ষমতার ভারসাম্য যেখানে থাকার কথা ছিল, সেখানে তৈরি হয়েছে ব্যক্তিনির্ভর এক বাস্তবতা। ফলে আজ ইসরায়েলের ভেতরে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে, কে আসলে নেতানিয়াহুকে থামাতে পারে? তিনি কি আদৌ কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? নাকি রাষ্ট্রই এখন তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের একটি উপকরণে পরিণত হয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এহুদ বারাক, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাম বেন-বারাক—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনে দেয়।

এখানে আসল বিষয় যুদ্ধ জেতা বা হারানো নয়। আসল বিষয় হলো—সব সময় তিনি যেন কেন্দ্রেই থাকেন, সব সিদ্ধান্ত যেন তাঁকে ঘিরেই ঘোরে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চাপকেও তিনি নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করেন।

এহুদ বারাকের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাঁরা ইসরায়েলের নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন এবং যাঁদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের কৌশলগত চিন্তার ভিত তৈরি করেছে। তাঁর মন্তব্যে কোনো দলীয় ক্ষোভ নেই; বরং রয়েছে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্বেগ।

যখন তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশটিকে প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বিপজ্জনক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে, তখন তা নিছক সমালোচনা থাকে না; সেটি তখন রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়ে ওঠে। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের আসল গুরুত্ব অন্য জায়গায়। সেটি হলো, তিনি নেতানিয়াহুর প্রচারিত বিজয়ের বয়ানকে সরাসরি ভেঙে দেন।

হিজবুল্লাহকে ‘চূর্ণবিচূর্ণ’ করা হয়েছে, তাদের ‘দশকের পর দশক পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে’—এ ধরনের দাবি যে কেবল অতিরঞ্জন নয়, বরং বিভ্রান্তিকর, সেটাই তুলে ধরেন বারাক। তাঁর মতে, গ্রাম ধ্বংস করা বা অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া সামরিক সাফল্য নয়, বরং তা প্রতিপক্ষকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ, যুদ্ধের বাস্তবতা কেবল সামরিক ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে নির্ধারিত হয় না; এটি রাজনৈতিক ফলাফলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

যদি যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোনো টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে না পৌঁছায়, তাহলে তা কেবল সহিংসতার পুনরুৎপাদন ঘটায়। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বারাক কার্যত বলছেন, নেতানিয়াহু কৌশলগতভাবে ভুল পথে হাঁটছেন এবং সেই ভুলকে সাফল্য হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর কথোপকথন নিয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরেও বড় একটি সত্য প্রকাশ করে। ট্রাম্প যখন নেতানিয়াহুকে সরাসরি ‘পাগল’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, ‘এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, আর তোমার জন্যই ইসরায়েলকেও ঘৃণা করা হচ্ছে’, তখন তিনি শুধু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন না, তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছেন। তা হলো—একজন নেতার আচরণ পুরো দেশের বৈশ্বিক অবস্থানকে প্রভাবিত করছে।

এই ভাষা সমান মর্যাদার মিত্রদের মধ্যে ব্যবহৃত হয় না; এটি এমন এক অবস্থান, যেখানে একজন নিজেকে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।

এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ। তিনি লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, ইসরায়েল বৈরুতে সেনা পাঠাবে না এবং যেসব বাহিনী এগিয়ে গিয়েছিল, তাদেরও ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তিনি হিজবুল্লাহর সঙ্গে পরোক্ষ সমঝোতার কথাও প্রকাশ করেন।

এই ঘটনাগুলো দেখায়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোথায় কেন্দ্রীভূত। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় নিয়ন্ত্রক নন; বরং একটি বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোর অংশ। সেখানে শেষ কথা বলে ওয়াশিংটন।

রাম বেন-বারাকের মন্তব্য এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি যখন বলেন, ‘আমরা আমাদের নিরাপত্তা নীতি পরিচালনার স্বাধীনতা হারিয়েছি’, তখন সেটিকে কোনো আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া বলা যাবে না। এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের স্বীকারোক্তি। বহুদিন ধরে ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তার সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে যে ধারণা ছিল, তা যে বাস্তবে সীমাবদ্ধ, তার কথায় সেটাই সামনে আসে।

এ অবস্থায় আসল প্রশ্নগুলো খুব কঠিন হয়ে যায়। যুদ্ধ কতদূর যাবে, কখন থামবে, কোথায় হামলা হবে—এসব কে ঠিক করে? বাইরে থেকে মনে হয়, নেতানিয়াহুই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে তা পুরোপুরি সত্য নয়। তিনি যতক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের সীমার ভেতরে থাকেন, ততক্ষণই নিজের মতো চলতে পারেন। যখন সেই সীমা ছুঁয়ে ফেলেন, তখনই শেষ কথা বলে ওয়াশিংটন। অর্থাৎ, চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণটা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকে।

এই নিয়ন্ত্রণ নেতানিয়াহুকে বদলায় না, বরং তাঁকে আরও চালাক করে তোলে। দুর্নীতির মামলা, রাজনৈতিক চাপ ইত্যাদি নিয়ে তিনি দেশের ভেতরে নানা সমস্যায় আছেন। তাই তিনি এমনভাবে চলেন যেন মনে হয়, তাঁকে ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়।

নেতানিয়াহু একধরনের দুই দিকের খেলা খেলেন। একদিকে পরিস্থিতি গরম করেন, শক্তি দেখান। আবার যখন চাপ আসে, তখন পিছিয়ে যান। কিন্তু সেই পিছিয়ে যাওয়াকেও তিনি নিজের কৌশলগত সাফল্য বলে দেখান।

এখানে আসল বিষয় যুদ্ধ জেতা বা হারানো নয়। আসল বিষয় হলো—সব সময় তিনি যেন কেন্দ্রেই থাকেন, সব সিদ্ধান্ত যেন তাঁকে ঘিরেই ঘোরে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চাপকেও তিনি নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করেন।

সমস্যাটা এখানেই বড়। দেশের ভেতরে তাঁকে থামানোর মতো শক্তিশালী কেউ নেই। সেনাবাহিনী চাপ দিতে পারে না, বিরোধীরা দুর্বল, আর সমাজও বিভক্ত। তাই অনেক সতর্কবার্তা এলেও বাস্তবে কিছু বদলায় না।

তাহলে নেতানিয়াহুকে প্রভাবিত করে কে? দেশের ভেতরে প্রায় কেউ নয়। বাইরে শুধু যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তারা তাঁকে সরাতে চায় না, শুধু সীমা টেনে দেয়।

শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্নটা হলো—কেন এমন একটা রাষ্ট্র, যে নিজেকে শক্তিশালী গণতন্ত্র বলে, সে একজন নেতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারল না?

উত্তরটা হলো—অনেক দিন ধরে এই ব্যবস্থাই নেতানিয়াহুর এ ধরনের রাজনীতি ব্যবহার করেছে। পরে সেই মানুষটাই এত বড় হয়ে গেছে যে তাঁকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

কারাম নামা ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক।

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ