বছর বছর ঈদ আসে। ঈদ ধর্মীয় উৎসব। তবে ধর্মীয় তাৎপর্য ছাপিয়েও ঈদ উৎসবের প্রভাব জনজীবনের অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। সে কারণেই ঈদে ইবাদত হয়, নামাজ হয়, কোলাকুলিও হয়।
বাস্তবে ঈদ হয়ে উঠেছে এক সামাজিক ও ঘটনাবহুল উৎসব। ঈদের ছোঁয়া বাজার, বাস, ট্রেন থেকে শুরু করে পরিবার-বন্ধুবান্ধব, এমনকি বিচিত্র ধর্মের মানুষের এই দেশের কোথায় না লাগে! তবে ঈদের মতো সবচেয়ে আনন্দের উৎসবটিকে পেতে হলে পার হতে হয় আস্ত একটা ধৈর্যের মাস। ঈদ উচ্ছলতা আর বাঁধনহীন আনন্দের প্রতীক। তাই তো কোনো কিছুতে চরম আনন্দ বোঝাতে ‘ঈদ মোবারক’ বা ‘আজ ঈদ। মদিনার ঘরে ঘরে আনন্দ’ কথাগুলো উচ্চারিত হয়।
তবে ঈদের আগে পরীক্ষা কেবল রোজারই নয়, সারা দেশের মানুষ এই একটা মাসে যে কত পরীক্ষা দেয়! প্রথম পরীক্ষা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের উচ্চ মূল্যকে গ্রহণ করা। যে মূল্য হাঁকা হবে, তাতেই কিনতে হবে; কোনো ছাড়াছাড়ি নেই। সংযমের মাস সবার জন্যই, তাই তো বিক্রেতারাও হয়তো এতটুকু সংযম করেন যে মানুষ যেন সাহ্রি-ইফতার না করে মরেই না যায়! অন্ততপক্ষে যেন নিবু নিবু টিমটিম করে বেঁচে থাকে!
আর মানুষগুলোও কেন যেন সোনার দামের লেবু, বেগুন আর কাঁচা মরিচের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ওসব না হলে তাদের চলবেও না। ওদিকে চড়া দামে শৌখিন ইফতারি বিক্রি রাস্তাগুলোকে ঘিঞ্জি বানিয়ে ফেলে। হাজারো অত্যাধুনিক আইটেমের পসরা দাম যা-ই হাঁকুক, খেতে যে হবেই! ক্রেতা-বিক্রেতা আর ইফতারের তাড়া–লাগানো মানুষের ভিড়ে তাই রাস্তা পার হয়ে বাইরে থেকে ঘরে ফেরা ইফতারের আগের মুহূর্তের প্রাত্যহিক চ্যালেঞ্জ।
শৈশব-কৈশোরে কাটানো ঈদের মধুর স্মৃতিই তাকে ঈদ উপলক্ষে হাজার বাধা অতিক্রম করে জন্মস্থানে বা প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয়, যে তাগিদ উপেক্ষা করা কঠিন। পৃথিবীতে নিশ্চয় যুদ্ধের বিপরীতে একদিন শান্তি আসবে, যেখানে ঈদের আনন্দ সার্থক হবে।
একসময় ঈদের জামা ছিল যক্ষের ধন। ঈদের আগপর্যন্ত বদ্ধ ঘরে লুকিয়ে ভাঁজ খুলে দেখে তৃপ্তি পাওয়া যেত কেবল। ঈদের আগে অন্য কেউ দেখলে তা পুরোনো হয়ে যেত। ঈদের জামাকে ঘিরে তখনকার যে উত্তেজনা, তা ছিল বাকি বছর নতুন জামা তেমন না পাওয়ার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু কালক্রমে দেশে যখন দস্তুরমতো পোশাকশিল্প গড়ে উঠল, পথঘাট বুটিক আর দরজির দোকানে সয়লাব হয়ে গেল, এমনকি অনলাইনে সারা দিন কাপড়ের লাইভ কেনাবেচার রীতি জীবনে যুক্ত হলো, তখন কি আর ঈদের জামার বাড়তি কোনো মাহাত্ম্য থাকে?
বাড়িতে মায়ের হাতের যত্নের এমব্রয়ডারিও হয়ে যায় বাহুল্য। বাণিজ্যিকভাবে দেদার হয় বলে এখন আর কেউ সুন্দর নকশা দেখলে জানতে চায় না, কে করেছে সেলাই? ওদিকে ঈদের জামাকে গোপন রাখার চ্যালেঞ্জ বা আবেগ না থাকলেও, কেনাকাটা কিন্তু কমেনি। ঈদ সামনে রেখে নতুন কাপড় কেনার আর উপহার দেওয়ার সামাজিক রীতি পুরো রোজার মাস বিপণিবিতানকে সরগরম করে রাখে, রোজার সংযমের মধ্যেই ঈদের আনন্দ ঢুকে পড়ে অনায়াসে। কাপড়সহ বহু রকমের পণ্যের ব্যবসায়ীর জন্য বছরব্যাপী চলার মুনাফা তৈরির সময় ওই রোজার মাসটাই।
ঈদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বড় শহরে কাজের জায়গা থেকে নিজ শহর বা গ্রামে পৌঁছানো। ঈদের ছুটি শুরুর তারিখ জেনে পরিবারের জন্য বাস বা ট্রেনের টিকিট পাওয়া এক বিরাট প্রতিযোগিতায় জেতার মতো। অনলাইনে ট্রেনের টিকিট চেষ্টা করতে না করতেই শেষ, স্টেশনে লম্বা লাইন, বাসস্ট্যান্ডে ধরনা দেওয়া আর মহাসড়কে ১২-১৩ ঘণ্টার যানজট—কোনো কিছুই ঈদে আপন মানুষদের কাছে ফেরার তৃষ্ণাকে দমাতে পারে না। তবে সড়কে অতিরিক্ত গাড়ি, আর বাড়ি ফেরার নেশায় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপসহ বেপরোয়া গতি প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়। অনেক দুর্ভাগা মানুষ আর কখনোই প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে না।
ঈদের সূচনা হয় চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে প্রযুক্তি যতই নতুন দুয়ার খুলে দিক না কেন, চাঁদ দেখা হয় সেই ‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতেই। চাঁদ দেখা কমিটি যখন নিজ চোখে চাঁদ দেখে, তখনই হয় ঈদের ঘোষণা। ওদিকে সূর্য ওঠার দিক থেকে পেছনের দেশে ঈদ হয়ে গেলেও কিছু যায় আসে না। যাহোক, সরকারি ঘোষণার সঙ্গে তাই ঈদ উদ্যাপনের ধর্মের মতোই সম্পর্ক রয়েছে। খুবই নগণ্যসংখ্যক মানুষ অবশ্য অনেক সময় সরকারি ঘোষণার আগের দিনেই ঈদ উদ্যাপন করে—চিন্তা উদ্রেকের বিষয় বটে।
নিজ শহরের বড় মাঠে বা মসজিদে অন্য সবার সঙ্গে ঈদের জামাতের রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। কিন্তু নামাজ শেষে কোলাকুলি, বিশেষত অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও, ইবাদতের মতো ধর্মীয় রীতি নয়। তবু এ যেন খুবই আপন এক পর্ব, সিয়াম সাধনা শেষে ঈদের আনন্দ প্রত্যেকের সঙ্গে ভাগাভাগি করা। নামাজিদের আলিঙ্গনে ঈদ যথার্থই এক সামাজিক উৎসব হয়ে ওঠে তখন। নামাজিরা তখন একে অন্যের বাড়িতে মিষ্টিমুখ করতেও যান। মিষ্টি বলতে মূলত সেমাই। কিন্তু সেমাই-ই কেন? একে ‘সেমাই ঈদ’ বলেও ডাকা হয়। এমন নয় যে সেমাই না খেলে ধর্মীয় আচার বাকি থাকবে, তবে এ রকম অভ্যাসের মধ্য দিয়েই হয়তো ধর্ম সমাজের উপাদান হয়, আবার সামাজিক রীতিকেও মানুষ পালন করে ধর্মের মতো।
ঈদ যতই ধর্মীয় উৎসব হোক, নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক আড্ডা অনুষ্ঠানে এর চেয়ে বড় উপলক্ষ আর হয় না। ঈদের সাজসজ্জা বা খাবার মূলত নির্ধারিত হয় এলাকাভিত্তিক রীতি অনুযায়ী। এই যেমন বাংলাদেশে সেমাই, আবার মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় নানা রকমের ভাত,Ñনারকেলের দুধে রান্না ভাত, বাঁশের ভেতরে রান্না ভাত ইত্যাদি। ওই অঞ্চলগুলোতে ঈদ উৎসবে বাড়ি সাজানো হয় কলাগাছ আর প্রদীপ দিয়ে।
পৃথিবীতে যতই হানাহানি লেগে থাকুক, বছর ঘুরে চাঁদের ঘূর্ণনে রোজা বা ঈদ ঠিকই সময়মতো হাজির হয়, কারও তাকে বরণ করার পরিস্থিতি থাকুক বা না থাকুক। তাই তো গাজায় মসজিদের ধ্বংসস্তূপের কোনো এক হেলে যাওয়া পাটাতনের ওপরে বসে সামান্য পানি-খাদ্যে একদল লোকের ইফতারের দৃশ্য আমাদের সামনে আসে। ওদিকে রোজার সাধনার মধ্যে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে মুহুর্মুহু বোমা ও মিসাইল পড়ে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর সংকল্পের প্রতিজ্ঞা কোনো কিছুই পাল্টাপাল্টি হামলার নেশা থেকে মানুষকে বিরত করতে পারে না।
অস্তিত্বের লড়াই কখনো ধর্মীয় সংকল্পের চেয়েও বড়; আবার ধর্মই এমন এক সামাজিক উপাদান, যার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির কারণেও মানুষ যুদ্ধের আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে জীবন বা সামাজিকতার তাগিদ এত বড় যে যুদ্ধে মিসাইলের পর মিসাইলে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ওই অঞ্চলের মানুষও নিশ্চয় রোজার ধ্যানে আছেন, ঈদের আনন্দও তাঁদের ছুঁয়ে যাবে।
একইভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতায় জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য বা অপ্রতুলতাও মানুষের ঈদে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়া ঠেকাতে পারবে না। কারণ, রোজা একা পালন করতে পারলেও ঈদ কিছুতেই একা উদ্যাপন করার নয়। একাকী বা পরিবারহীন মানুষের জন্য ঈদের উৎসব এক শাস্তির মতো, যেহেতু ঈদ যতটা ধর্মীয়, তার চেয়েও বেশি সামাজিক। তবে মানুষ যে অবস্থাতেই থাকুক, জীবনের বহু ঈদের স্মৃতি তাকে নাড়া দেয় বা পরিচালনা করে।
শৈশব-কৈশোরে কাটানো ঈদের মধুর স্মৃতিই তাকে ঈদ উপলক্ষে হাজার বাধা অতিক্রম করে জন্মস্থানে বা প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয়, যে তাগিদ উপেক্ষা করা কঠিন। পৃথিবীতে নিশ্চয় যুদ্ধের বিপরীতে একদিন শান্তি আসবে, যেখানে ঈদের আনন্দ সার্থক হবে।
আফসানা বেগম কথাসাহিত্যিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
