ইরান যুদ্ধের ঢেউ আছড়ে পড়ছে অর্থনীতিতে, কতটা প্রস্তুত ঢাকা?

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশেও জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য রাজধানীর একটি পাম্পে লম্বা লাইন।ছবি : প্রথম আলো

যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি, ক্ষেপণাস্ত্র বা কূটনৈতিক উত্তেজনার খবর নয়। যুদ্ধের অর্থ আরও বিস্তৃত—এটি বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এবং অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাতও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

অনেকেই এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখছেন কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কারণ ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, উপসাগরীয় ভূরাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের একটি কৌশলগত কেন্দ্র। ফলে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর অভিঘাত শুধু তেহরান, তেলআবিব বা ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তার প্রতিধ্বনি পৌঁছাতে পারে ঢাকার অর্থনীতিতেও।

ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সেই সংকেত দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরুতে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৬৭ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২.০৫ শতাংশ বেড়েছে । যদিও বাংলাদেশ সরকার মার্চ মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে এবং ফেব্রুয়ারির মতো একই হারে তা বিক্রি হচ্ছে। তবুও বৈশ্বিক বাজারের এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়তে বাধ্য।

একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, বন্ডের আয়ের ওঠানামা এবং জ্বালানি পরিবহনে নিরাপত্তা ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়েছে। ইতিহাস বলছে, সাধারণত তিন ধরনের ধাক্কা যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতিগুলোকে মন্দার দিকে ঠেলে দেয়—আর্থিক সংকট, মহামারি এবং তেলের দামের আকস্মিক উল্লম্ফন। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত অন্তত দ্বিতীয় ঝুঁকিটিকে সামনে এনে দিয়েছে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের একটি সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ—হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। ইরানসংলগ্ন এই কৌশলগত প্রণালিতে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর থেকেই তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে সতর্কতা বেড়েছে, অনেক জাহাজ বিকল্প পথ খুঁজছে এবং পরিবহন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো—বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল শোধনাগার এবং কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি স্থাপনাগুলো—ঘিরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ইরানকে ঘিরে সংঘাত হয়তো দ্রুত শেষও হতে পারে। কিন্তু অনিশ্চয়তাই আজকের বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। আর সেই অনিশ্চয়তার সময়ে যারা আগে প্রস্তুতি নেয়, তারাই তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭০–এর দশকের তেল সংকটের সরাসরি পুনরাবৃত্তি নয়। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা সরাসরি জ্বালানি ঘাটতি তৈরি করেছিল এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। আজকের বিশ্ব অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ।

নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বেড়েছে এবং শেল তেলের উৎপাদনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন নেট জ্বালানি রপ্তানিকারক। তবুও তেলের দাম বাড়লে তার অভিঘাত এখনো শক্তিশালী থাকে। কারণ জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি পরিবহন, খাদ্য উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, বিমান ভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের ডিজেল ও গ্যাসের দাম বাড়ে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরিবহন খরচ বাড়ে, কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং শিল্প খাতেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। সরকার তখন সাধারণত দুটি কঠিন বিকল্পের সামনে পড়ে—ভর্তুকি বাড়াবে, নাকি জ্বালানির দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। ভর্তুকি বাড়ালে রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে যায় এবং সরকারি বাজেটের ওপর চাপ পড়ে। আবার জ্বালানির দাম বাড়ালে তা দ্রুত বাজারদরে প্রভাব ফেলে এবং মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হয়।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিলও বাড়বে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। ডলারের চাহিদা বাড়বে এবং টাকার মান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের গোলা যদি তেহরানে পড়ে, তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি ঢাকায় শোনা যেতে পারে ডলারের বাজারে, বিদ্যুতের খরচে কিংবা বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো রেমিট্যান্স। দেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন। যুদ্ধ যদি আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়ায়, তবে নির্মাণ, সেবা এবং অবকাঠামো খাতে তার প্রভাব পড়তে পারে।

শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এখানে একটি বিপরীত বাস্তবতাও রয়েছে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচুতে থাকলে উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলো বেশি রাজস্ব আয় করতে পারে। ফলে তারা নতুন উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করতে পারে এবং শ্রমের চাহিদাও বাড়তে পারে। তাই রেমিট্যান্সের ওপর যুদ্ধের প্রভাব সরলরৈখিক হবে না; এটি অনেকটাই নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় বড় ঝুঁকি রপ্তানি খাতে। যদি এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্ট্যাগফ্লেশনের দিকে ঠেলে দেয়—অর্থাৎ একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে—তাহলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা ব্যয় কমতে পারে। এর প্রথম আঘাত পড়বে ভোক্তানির্ভর শিল্পে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প, যা মূলত পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে পোশাক শিল্পে অর্ডার কমে যেতে পারে, উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে এবং কর্মসংস্থানেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

এ ছাড়া বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নও বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালপথে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজ বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে। এতে শিপিং খরচ বেড়েছে এবং পণ্য পরিবহনে সময়ও বেশি লাগছে। ইরান যুদ্ধ যদি সমুদ্রপথে নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে, তাহলে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে শুধু জ্বালানি নয়, অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়—দেশটি কতটা প্রস্তুত?

প্রস্তুতি মানে শুধু তাৎক্ষণিক বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। প্রথমত, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। নবায়নযোগ্য শক্তি, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা এবং বিকল্প জ্বালানি আমদানির সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক তেলবাজারের ধাক্কা কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর মতো নীতিগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে।

তৃতীয়ত, রপ্তানি বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ এখনো কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজার এবং একটি প্রধান খাতের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তাই নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং শিল্প খাতের বৈচিত্র্য বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা অপরিহার্য। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় বাজার সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয় আস্থার সংকটে। তাই নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা জরুরি। দেশটি ঐতিহ্যগতভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে—মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা শক্তি এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে। কিন্তু বৈশ্বিক শক্তির মেরুকরণ যত বাড়বে, ছোট ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য সেই ভারসাম্য বজায় রাখা তত কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে অর্থনৈতিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক সংযমও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সবশেষে একটি বাস্তবতা আবারও মনে করিয়ে দেয়—বৈশ্বিক অর্থনীতির যুগে কোনো যুদ্ধই আর দূরের যুদ্ধ নয়। যুদ্ধক্ষেত্র হাজার মাইল দূরে হলেও তার অভিঘাত পৌঁছে যায় জ্বালানির দামে, খাদ্যপণ্যের বাজারে, ডলারের বিনিময় হারে, রপ্তানি অর্ডারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

ইরানকে ঘিরে সংঘাত হয়তো দ্রুত শেষও হতে পারে। কিন্তু অনিশ্চয়তাই আজকের বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। আর সেই অনিশ্চয়তার সময়ে যারা আগে প্রস্তুতি নেয়, তারাই তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের জন্য তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ অপেক্ষা করা নয়—প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; তার ঢেউ এসে লাগে বাজারে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

সানজিদা বারী ডক্টরাল ফেলো, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো

(মতামত লেখকের নিজস্ব)