বেশির ভাগ পর্যবেক্ষক, বিশ্লেষক, গণমাধ্যমের ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ জিতবে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও দিন শেষে জয়ের আনন্দ নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গেছেন। পরদিন সবার চোখ ছানাবড়া। ওই সময় আওয়ামী লীগ ছিল অনেক সংগঠিত। বিএনপি ছিল অগোছালো, দল হিসেবে সক্ষমতা ছিল অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায়। এই ফলাফল বিএনপিরও অনেকের ধারণার বাইরে ছিল।

ভোটের এ রকম ফলাফল আওয়ামী লীগ আশা করেনি। আবিষ্কার হলো সূক্ষ্ম কারচুপির তত্ত্ব। ভোট ভালো হয়েছে বলে মন্তব্য করায় ড. কামাল হোসেন দলে অচ্ছুত হয়ে গেলেন। আসল কাজটি করে দিয়েছিলেন ভোটাররা। আওয়ামী লীগ তো বটেই, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরাও ভোটারের মন বুঝতে পারেননি। এটা ছিল জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি আর বুদ্ধিজীবিতার উদাহরণ। ভোটাররা সুযোগ পেলে গণেশ উল্টে দেন।

রাজনীতিবিদেরা মানুষকে দেখেন নিছক ভোটার হিসেবে। ভোটের আগে তাঁদের কাছে ধরনা দিতে হয়। হাতজোড় করে ভোট ভিক্ষা করতে হয়। দেশটাকে দুধ আর মধুর সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। কিন্তু যিনি ভোট দেবেন, ভোট তাঁর কাছে এক মূল্যবান অস্ত্র। আগে সুবচন শুনে অনেকবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু প্রতারিত হয়েছেন বারবার।

দুটি কথা বেশ প্রচলিত। প্রথমত, রাজনীতিবিদেরা যা ভাবেন, তা করেন না। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তার মানে, ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে, তার পূর্বাভাস দেওয়া এ মুহূর্তে খুব মুশকিল। কার মনে কী আছে, কে জানে। পুরোনো কৌশল তেমন কাজে দেবে না। নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে। সে জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো করে বলতে হয়, নির্বাচন যথাসময়ে হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ। নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ।

এখন তাঁরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আকলমন্দ। নেতার কথায় কলাগাছকে ভোট দেওয়ার দিন আর নেই। আগে অনেক ভোটার তাঁদের প্রার্থীকে চিনতেন না। এখন চেনেন। তিনি দেখেন, এই লোক নির্বাচনের আগে কী বলেছিলেন, আর পরে কী কী করেছেন।

দলীয় রাজনীতিতে মানুষ দল করবেন, এটা স্বাভাবিক। দলে ভালো লোক, মন্দ লোক দুই-ই আছেন। মানুষ যাঁকে ভালো লোক মনে করেন, দলের কাছে তিনি ততটা ভালো না-ও হতে পারেন। দল দেখে, প্রার্থী জিততে পারবে কি না। একটা সময় ছিল, যখন এলাকার সবচেয়ে সম্মানিত লোকটি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন। সে যুগ আর নেই।

দল এখন তাঁকেই মনোনয়ন দেয়, যাঁর জেতার ক্ষমতা আছে। রাজনীতিবিদেরা এর একটি প্রতিশব্দ বের করেছেন—উইনেবল ক্যান্ডিডেট। জিততে হলে এখন ভোটারের মর্জির ওপর ভরসা করে থাকলে চলে না। দরকার টেঁকের জোর আর মাস্তান।

প্রায় সবখানে দেখা যায়, এলাকার ষন্ডা-গুন্ডাগুলো কোনো না কোনো নেতার চারপাশে ঘুরছে, তাঁর নামে ‘জিন্দাবাদ’ দিচ্ছে। তাদের আর কোনো পেশা নেই। পেশা থাকলে দিনের পর দিন তারা নেতার পেছনে ঘুরঘুর করতে পারত না।

কাজের লোকের এত সময় কোথায়। তাহলে তাদের চলে কী করে? কী খায়, কী পরে? উত্তর খুব সোজা। তাদের দেখভাল করেন নেতা। তারা এলাকায় নেতার প্রশ্রয়ে চাঁদাবাজি করে। নির্বাচনের সময় টাকা পায়, মোটরবাইক পায়। নেতা নির্বাচনে জিতলে এলাকায় নানা কাজের ঠিকাদারি পায়।

মানুষ ভাবে, একটা দল একটা এলাকা থেকে বেছে বেছে শুধু মন্দ লোককে নির্বাচনে প্রার্থী করে কেন। জবাব খুব সহজ। তাঁরা উইনেবল। একবার এক ছোট নেতা তাঁর বড় নেতা সম্পর্কে আমাকে বলেছিলেন—তাঁর সামনে যদি ১০ জন দাঁড়িয়ে থাকেন, তিনি তাঁদের মধ্য থেকে সবচেয়ে খারাপ দুজনকে বেছে নেবেন। কথাটা আমার মনে ধরেছিল। একসময় নির্বাচন ছিল উৎসবের উপলক্ষ।

এখন এটা আতঙ্ক। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসে, মাঠ তত গরম হয়। গরম এমনি এমনি হয় না। রাজনীতিবিদেরা নানা কথাবার্তা বলে মাঠ গরম রাখেন। মাঠ ছেড়ে দেব না, মাঠ দখলে রাখব। এ রকম হম্বিতম্বি, আস্ফালন চলতে থাকে প্রতিদিন। রোজ রোজ এসব কথা বলতে হয়। না বললে নিজেদের দৃশ্যমান রাখা যায় না।

নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। ঠিক সময়ে হলে বাকি আছে কমবেশি ১৫ মাস। আবহাওয়া ইতিমধ্যে গরম হতে শুরু করেছে। মারামারি, লাঠালাঠি চলছে। লাশ পড়া শুরু হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, সবে তো শুরু। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, মারামারি কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে বলা মুশকিল।

মাঠে প্রকৃতপক্ষে দল এখন দুটো, আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে না গিয়ে আওয়ামী লীগকে ওয়াকওভার দিয়েছিল। ২০১৮ সালে বিএনপি ও সমমনাদের দেওয়ানে খাসে ডেকে নিয়ে চিজ কেক খাইয়ে গুড হিউমারে রেখে একটা ভোজবাজি করে আওয়ামী লীগ কিস্তিমাত করেছিল। এবার কী হবে?

বিএনপি বারবার বলছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীন তারা নির্বাচনে যাবে না। সম্প্রতি তাদের ওপর আওয়ামী লীগের আচরণ দেখে মনে হয়, তারা বিএনপির এ কথায় আস্থা রাখতে পারছে না। অর্থাৎ বিএনপি এবার নির্বাচনে যাবে বলেই আওয়ামী লীগ ধরে নিয়েছে।

সে জন্য তাদের মাঠে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। একদিকে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার নামে বিএনপিকে রাস্তা থেকে হটিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের লোকেরা চড়াও হচ্ছে বিএনপির ওপর এবং কখনো কখনো তা পুলিশের সামনেই। বিএনপিও বেশ মরিয়া। তারা পণ করেছে, মাঠে থাকবেই। এটা আওয়ামী লীগের জন্য ভাবনার বিষয়।

ইভিএম নিয়ে বেশ কথা–চালাচালি হচ্ছে। আমার মনে হয়, এটা আসল সমস্যা নয়। বিএনপির জন্য তো নয়ই; যেখানে তারা বলছে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন তারা নির্বাচন করবে না, সেখানে ইভিএমের বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক। বিএনপির আসল চিন্তা, নির্বাচনের সময় কেমন সরকার থাকবে। এটা আওয়ামী লীগের জন্যও খুব ভাবনার বিষয়। বিএনপি মনে করে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন নির্বাচনে গেলে তাদের কপালে দুঃখ আছে। আওয়ামী লীগ মনে করে, তারা ক্ষমতায় না থাকা অবস্থায় নির্বাচন হলে তাদের কপাল পুড়বে।

দুটি কথা বেশ প্রচলিত। প্রথমত, রাজনীতিবিদেরা যা ভাবেন, তা করেন না। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তার মানে, ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে, তার পূর্বাভাস দেওয়া এ মুহূর্তে খুব মুশকিল। কার মনে কী আছে, কে জানে। পুরোনো কৌশল তেমন কাজে দেবে না। নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে। সে জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো করে বলতে হয়, নির্বাচন যথাসময়ে হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ। নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ।

  • মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক