এই জয় আরও মহৎ হয়ে ওঠে যখন আমরা জানি দলটার দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশেরই একজন কোচ গোলাম রব্বানী। যখন জানি দলের খেলোয়াড়েরা কীভাবে দারিদ্র্য, পারিবারিক ও সামাজিক বাধা, অনিশ্চিত জীবনকে পেছনে ঠেলে দেশকে করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন।

যখন বারবার দেখি মাত্র কয়েকটা দিনে হাউসহোল্ড নেম হয়ে ওঠা সাবিনা, মারিয়া মান্দা, সিরাত, সানজিদা, রুপনা, কৃষ্ণাদের দাপুটে ফুটবল, শুনি দেশের জন্য তাদের ভালোবাসা আর আত্মনিবেদনের কথা। যখন জানি এই মেয়েদের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলতে কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মফিজ উদ্দিন এবং তাঁর মতো ব্যক্তিদের অসামান্য অবদানের কথা। যখন এটাও জানি ঋতুপর্ণার রয়েছে ‘আমি চাকমা’ এই আত্মপরিচয়ের মর্যাদাবোধ।

কিন্তু তারপর? অনিবার্যভাবে আমরা তারপর নানা দুর্ভাবনায় আশঙ্কিত হই। নেপাল থেকে বিজয়ী দল দেশে ফেরার সময় ছাদখোলা বাসে ‘উন্নয়নের গার্ডার’ লেগে আহত হয় কি না, নারী ফুটবলারদের কৃতিত্বকে রাজনীতিকরণ করা হয় কি না, সালাউদ্দিনের বাফুফে তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় কি না, আমাদের আশঙ্কার শেষ ছিল না।

এসব আশঙ্কা অনেকাংশে বাস্তবে রূপও নেয় দলটা ঢাকা বিমানবন্দরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। আমরা স্তম্ভিত হই দেশকে মহীয়ান করা মেয়েদের লাগেজ কেটে ডলার আর মালামাল চুরির সংবাদে। ক্ষুব্ধ হই ছাদখোলা বাসেই তাদের একজনের আহত হওয়ার সংবাদে। বাফুফেতে সংবাদ সম্মেলন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা আমাদের চোখ এড়ায় না।   

এসব ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। সবচেয়ে বড় যে দুর্ভাবনা রয়ে গেছে, তা হলো মেয়েদের এই দলটার সাফল্য কি ধরে রাখা যাবে, তারা কি আরও বিকশিত হওয়ার, আরও সাফল্য অর্জনের সুযোগ পাবে? এমনকি তারা কি আদৌ ফুটবল খেলাই অব্যাহত রাখতে পারবে? নাকি আরও কয়েকজনের মতো বিয়ে করিয়ে সংসারের চৌহদ্দিতে আটকে ফেলা হবে তাদের? যদি খেলতে পারে, তাদের উপযুক্ত নার্সিং আর নার্সারিং কি করবে বাফুফে?

নাকি এই মেয়েদের অমিত সম্ভাবনা নিঃশেষ করা হবে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাজনৈতিক আর বাণিজ্যিক স্বার্থে এদের পুঁজি করে।  

২.

আমাদের এসব দুর্ভাবনা অমূলক নয়। আমরা এর আগে অমিত প্রতিভাধর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে দেখেছি। একজন বিশ্বসেরা আর চার-পাঁচজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের সেই দলকে দিগ্ভ্রান্ত করা হয়েছে এসব স্বার্থেই। আদর্শ ক্যাপ্টেন হয়েছেন বিতর্কিত ভোটের এমপি, আইকন হয়েছেন নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগে বিতর্কিত ও সমালোচিত। ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণরা সরে গেছেন নিজেরা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে সম্ভাবনাময়রা হয়েছেন নিঃশেষ!

এর পরিণতি হয়েছে শোচনীয়। ক্রিকেট মাত্র দশটা দেশের খেলা, এর মধ্যে পাঁচটাই দক্ষিণ এশিয়ার। এই পাঁচটির মধ্যে তিনটাই কোনো না কোনোবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, আরেকটাও (আফগানিস্তান) হতে পারে যেকোনো সময়। আর বাংলাদেশ? শেষ প্রতিযোগিতায় ছয় এশিয়ান দেশে হংকংয়ের মতো দলের সঙ্গে সবচেয়ে নিচে। তার আগে তলানিতে থাকা জিম্বাবুয়ের কাছে লজ্জাজনক পরাজয়।

এত ব্যর্থতার পরও ক্রিকেট প্রশাসনে পরিবর্তন হয়নি, বিসিবির কর্তাদের নির্লজ্জ আচরণ থামেনি, ক্রিকেট অবকাঠামোয় দুর্নীতি আর ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়নি, ক্রিকেটের শতকোটি টাকার পাহাড় থাকার পরও এমনকি জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়ের মৃত্যুর আগে উন্নত চিকিৎসা হয়নি। 

ফুটবল প্রশাসনেও রয়েছে একই ধরনের অবস্থা, একই শ্রেণি চরিত্রের প্রশাসন। আমাদের তাই ভয় হয়, এই অমিত সম্ভাবনাময় মেয়েদের দলটারও নাকি অপমৃত্যু ঘটে ভুল অভিভাবকত্বে। ক্রিকেটের দায়িত্বে আছেন একটি বড় ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বেতনভুক্ত কর্মকর্তা। কিন্তু ফুটবলের দায়িত্বে আছেন দেশসেরা একজন সাবেক ফুটবলার, ফুটবল অন্তঃপ্রাণ মানুষ হিসেবে যাঁকে চিনত মানুষ।

দুঃখটা বেশি এখানেই। সেই ফুটবলার সালাউদ্দিন দায়িত্বে থাকার পরও কেন এমন দুর্ভাবনা করতে হয় এ দেশের ক্রীড়ামোদীদের? ফেসবুকের পাতায় পাতায় আর অনলাইনের পাঠকদের মন্তব্য করার জায়গায় কেন এত অশ্রদ্ধা আর অনাস্থা তঁাদের প্রতি?

ফুটবল–কর্তারা কি জানেন না এর উত্তর?       

৩.

অন্য বহু মানুষের মতো আমিও ছিলাম ফুটবলার সালাউদ্দিনের অন্ধভক্ত। তিনি একজন অসামান্য ও আধুনিক ফুটবলার ছিলেন। আমার মনে আছে, মারদেকা বা কোনো একটা কাপে বাংলাদেশ ৩ গোল দিয়ে ২৭ গোল খেয়েছিল। তিনটি গোলই সালাউদ্দিন করেছিলেন।

তিনি প্রথম বিদেশি কোনো লিগে প্রফেশনাল ফুটবলার হিসেবে খেলতে গিয়েছিলেন। তাঁর আরেকটা আকর্ষণ ছিল তাঁর স্মার্টনেস। তাঁর খেলা, পোশাক–আশাক, অঙ্গভঙ্গি সবই ছিল প্রকৃত নায়কের মতো। তাঁর সময়ে এনায়েত, চুন্নু ও মেজর হাফিজের মতো আক্রমণভাগের অসামান্য খেলোয়াড়েরা ছিলেন। কিন্তু তাঁর ভক্তসংখ্যার ধারেকাছে কেউ ছিল না।

তিনি যখন ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্ব নেন, অনেকেই আশান্বিত হয়েছিলেন। বিদেশে সেরা ফুটবলারদের ফুটবল প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার এবং সফল হওয়ার বহু নজির আছে। ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনি, জার্মানির বেকেনবাওয়ারের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। সালাউদ্দিন দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের অনেক স্বপ্নের কথাও শুনিয়েছেন।

কিন্তু তিনি পারেননি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য অর্জন দূরের কথা, তিনি দেশীয় ফুটবলে কোনো জোয়ারও আনতে পারেননি। তাঁর খেলোয়াড়ি আমলে চারটি ডিভিশনের খেলা হতো, তখন সবচেয়ে নিম্ন¤ টায়ারের পাইওনিয়ার লিগে যে পরিমাণ দর্শক হতো, এখন এমনকি প্রথম বিভাগ পর্যায়ে সে রকম দর্শক হয় কি না, সন্দেহ!

তিনি বা ফুটবল–কর্তারা আলোচনায় আসেন মূলত নেতিবাচক খবর হিসেবে। যত ব্যর্থতাই থাক, আমরা তবু জানি ওয়াসার যেমন তাকসিম এ খানের ‘বিকল্প নেই, ক্রিকেটে পাপনের, ফুটবলেও সালাউদ্দিনের বিকল্প নেই।

কিন্তু কেন নেই, তা জানি না। আমরা শুধু জানি, ফুটবলে দুর্নীতি আছে, ম্যাচ ফিক্সিং আছে, কালোটাকার দাপট আছে। কিন্তু থমকে থাকে তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে ফুটবলের উন্নয়ন। কোটি কোটি টাকায় ব্যয় হয় বাফুফের সুরম্য ভবন নির্মাণে। জানি, র‌্যাঙ্কিংয়ে দিন দিন নামছে ছেলেদের দলের অবস্থান।

জানি, চটজলদি সাফল্য অর্জনের জন্য বিদেশি কোচ ধরে এনে কোনো লাভ হয়নি ফুটবলের। জানি, দুঃখ আর অভিমানে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অধিকাংশ মানুষ।

৪.

আজকে মেয়েদের দলের সাফল্যের পর সালাউদ্দিনদের সুযোগ এসেছে কিছুটা পাপ মোচনের। এই মেয়েদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কিছু ভাবতে হবে তাঁকে এবং ফুটবল–কর্তাদের। তাদের স্থায়ী চাকরির সংস্থান, দীর্ঘমেয়াদি ও সার্বিক প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, প্রয়োজনে তাদের কোচ গোলাম রব্বানীকেও বিদেশে উন্নত ট্রেনিংয়ে পাঠানোসহ আরও কী কী করা দরকার, তা তাঁদের না জানার কথা নয়।

তাঁদের এ-ও জানার কথা যে ফুটবলে রয়েছে ক্রীড়া–বিশ্বের সবচেয়ে আগ্রহ, ফুটবলে রয়েছে সবচেয়ে জনপ্রিয়তার সম্ভাবনা, ফুটবলেই এখনো আছে লাখ লাখ মানুষের দুঃখমোড়ানো স্বপ্ন। 

যদি এসব না-ই জানেন, তাহলে কেন তাঁরা বসে আছেন ফুটবলের দায়িত্বে প্রায় এক যুগ ধরে।

  •  আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন