নতুন সরকারের দায়িত্ব নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের ইশতেহার অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রদান–সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভা কমিটি এ কাজটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সে সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দারিদ্র্য দূরীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা করে ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাটি এসেছে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ফোরামে এটি বলা হয়েছে।
গবেষণাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অনেকের মতো একজন উন্নয়ন গবেষক হিসেবে আমিও আগ্রহী। গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ও কৌশল প্রণয়নে, সর্বোপরি বাংলাদেশের উন্নয়ন গবেষণায় গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে থাকতে পারে। তাই গবেষণাপত্রটি প্রকাশের অনুরোধ জানাচ্ছি।
ফ্যামিলি কার্ডের ব্যাপারে সরকারকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে। আমি ধারণা করছি, বিএনপি ফ্যামিলি কার্ডের লাভ-লোকসান (কস্ট-বেনিফিট) বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ, যারা আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাইরে, বিশেষ করে গৃহে অবস্থান করা নারীরা, যাঁরা পারিবারিক অর্থনীতি ও তাদের পরিবারের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা দিয়ে তাঁদের অনানুষ্ঠানিক শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এই আর্থিক সুবিধা দেশের মোট দেশজ উৎপাদন নির্ণয়ে অনানুষ্ঠানিক গৃহশ্রমকে আংশিকভাবে হলেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
বিএনপি সরকার এটিও নিশ্চয়ই ভেবেছে যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করবে এবং এটি থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করে সেটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পুনরায় বিতরণের একটি পন্থা হিসেবে কাজ করবে, যেটি মোটাদাগে সামাজিক ন্যায়বিচারকে ত্বরান্বিত করবে।
এখানে কয়েকটি জিজ্ঞাসা গুরুত্বপূর্ণ: ক) ফ্যামিলি কার্ডের লাভ-লোকসান বিশ্লেষণে আর কী কী বিকল্পকে বিবেচনা করা হয়েছিল? খ) কী কী কারণে ফ্যামিলি কার্ড অন্য বিকল্পগুলোর তুলনায় ভালো ও কার্যকর? গ) ফ্যামিলি কার্ড পৃথিবীর আর কোন কোন রাষ্ট্রে আছে, যেখানে আর্থসামাজিক ও পারিবারিক গঠন ও ক্ষমতার গতিশীলতা বাংলাদেশের মতো এবং ফ্যামিলি কার্ড সেখানে কীভাবে কাজ করছে? ঘ) ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নে কী কী ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেই ঝুঁকিগুলো কমাতে এবং দূরীকরণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
ফ্যামিলি কার্ড পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে। প্রথমে হতদরিদ্র ও পর্যায়ক্রমে মধ্যবিত্ত পরিবারকেও এর মধ্যে আনার চিন্তা করা হচ্ছে। সরকারের উচিত এই প্রকল্প নকশা নির্মাণে উন্নয়ন গবেষণা ও কার্যক্রম–সংশ্লিষ্ট সব অংশীজন ও সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা। স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে পরামর্শ সভার মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আলোচনা করে সেটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা উচিত। গতানুগতিক পরীক্ষামূলক প্রকল্পের বাইরে গিয়ে অতীত সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলমান কল্যাণ কার্ড প্রকল্পগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ফ্যামিলি কার্ডের নকশা চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা উচিত।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে ধাপে ধাপে। যেখানে একবারে পূর্ণাঙ্গ ফ্যামিলি কার্ডটির নকশা ও বাস্তবায়ন না করে একটি প্রাথমিক কার্ডের ধারণা নিয়ে সুবিধাভোগীদের ফ্যামিলি কার্ডটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়াকে বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে পুরো কার্ডটি ব্যবহারোপযোগী করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাটি একটি নমনীয় ধাপে ধাপে (ফেজভিত্তিক) পদ্ধতির কৌশলের ধারণা স্টিভ ব্ল্যাঙ্কের ২০১৩ সালের হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারে। স্টিভ একটি অভিযোজনযোগ্য ও পরীক্ষানির্ভর লিন স্টার্টআপ মডেলের পক্ষে যুক্তি দেন, যেখানে প্রথমে একটি ন্যূনতম কার্যকর পণ্য (মিনিমাম ভায়াবল প্রোডাক্ট ) তৈরি করা হয়, এরপর গ্রাহকের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে ধীরে ধীরে পণ্যের ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, পুনরাবৃত্তিমূলকভাবে পণ্য প্রকাশ করা হয় এবং যাচাইকৃত শিক্ষণ অর্জন করা হয়।
সরকারকে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা নিয়ে নমনীয় হতে হবে। এমনও হতে পারে ফ্যামিলি কার্ডের মৌলিক ধারণাটি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বাস্তবিক নয়। হতে পারে অঞ্চলেভেদে বা ব্যবহারকারীর সামাজিক পরিচিতি ও অবস্থানের কারণে কার্ডের ধারণাটি অপ্রাসঙ্গিক; হয়তো একটি সাধারণ (কমন) কার্ড না করে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কার্ড বেশি কার্যকর হতে পারে।
এমনও হতে পারে ফ্যামিলি কার্ডের পরিবর্তে ফ্যামিলি ডিজিটাল অর্থ স্থানান্তর, যেমন মোবাইল মানি, বেশি কার্যকর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। আমার কাছে মনে হয়েছে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও এখন সরকারের প্রতিজ্ঞা হলো অনানুষ্ঠানিক গৃহকর্মের সঙ্গে নিযুক্ত অবৈতনিক ব্যক্তি, বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রদান করা, যাতে তাঁরা ভোক্তাবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারেন, যেটি তাঁদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে।
এই উদ্দেশ্য সাধনে ফ্যামিলি কার্ড হলো একটি পন্থা, যেটি কোনো কারণে কাজ না করলে সরকার যাতে যেটি বেশি কার্যকর ও অর্থ সাশ্রয়ী পন্থা, সেটি অবলম্বন করে। ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাটি কাজ না করলে শুধু নির্বাচনী অঙ্গীকার আর রাজনৈতিক কারণে যাতে এটি গ্রহণ না করা হয়, সেটির দিকে সরকারকে নমনীয় থাকতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে সরকারি অর্থ সাশ্রয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে; সুতরাং বিনা খরচ বা স্বল্প খরচে পরিবারগুলোতে অর্থ স্থানান্তর করতে পারলে সরকার তার মনোভাবের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে, যেটি উপরান্তে সরকারের ওপর জনগণের আস্থাকে দৃঢ় করবে।
পরিশেষে, এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা কোনোভাবে প্রভাবিত হয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না করে। প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ যাতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এবং একটি সংসদীয় কমিটির কাছে নিয়মিত বিরতিতে উপস্থাপনের সুযোগ থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
মোতাসিম বিল্লাহ, উন্নয়ন গবেষক
ইমেইল: [email protected]
(মতামত লেখকের নিজস্ব)